বাধ্যতামূলক অবসর-বদলি নিয়ে দুশ্চিন্তায় পুলিশ

বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো, আগের কাজের জন্য শাস্তি পাওয়া এবং বদলি ও পদোন্নতি নিয়ে অনিশ্চয়তায় আছেন পুলিশের অনেক কর্মকর্তা। তাদের অনেকে বলছেন, এমন সিদ্ধান্ত নিতে তারা এখন দ্বিধায় পড়ছেন, যার কারণে ভবিষ্যতে তাদের রাজনৈতিক বিতর্কে জড়ানোর আশঙ্কা থাকতে পারে।

পরিদর্শক থেকে উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) পদমর্যাদার কয়েক ডজন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সরকারের সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে পুলিশের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের মধ্যে এই উদ্বেগ বেশি।

তারা বলছেন, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার বা বেআইনি কাজের সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তাদের রক্ষা করার প্রশ্ন নেই। তবে তাদের ভয়, কোনো কর্মকর্তার পেশাগত সিদ্ধান্ত, আগের পদায়ন বা রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার ধারণাকে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কারণ হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে। অথচ ওই কর্মকর্তার ব্যক্তিগত দায় যথাযথভাবে প্রমাণিত নাও হতে পারে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক পরিদর্শক বলেন, দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কোনো রাজনৈতিক ঘটনায় জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকলে আমাদের এখন দশ বার ভাবতে হয়। সরকার বদলে গেলে কী হবে? আমাদেরও কি জোর করে অবসরে পাঠানো হবে বা পরে শাস্তি দেওয়া হবে? তখন কি কেউ আমাদের পাশে দাঁড়াবে?

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর পুলিশ এমনিতেই বড় ধরনের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতিতে পুলিশকে আরও সক্রিয় হওয়ার চাপ দিচ্ছে।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশ গুলি চালিয়েছিল। জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনের হিসাবে, ওই আন্দোলনে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হন।

আন্দোলনের সময় ও পরে হামলায় ৪৪ জন পুলিশ সদস্য নিহত হন। এ সময় শত শত থানায় ও পুলিশের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট হয়।

গতকাল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, চিহ্নিত চাঁদাবাজ, অপরাধী ও মাদক ব্যবসায়ীদের গ্রেপ্তারে ব্যর্থ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালের তুলনায় এ বছর কয়েক ধরনের অপরাধ কমেছে। তবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আগে, অর্থাৎ ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাইয়ের তুলনায় এখনো বেশ কিছু বড় ধরনের অপরাধ বেশি হচ্ছে।

ছিনতাই ও ডাকাতি, হত্যা, নারী ও শিশু নির্যাতন, অপহরণ এবং চুরির ঘটনা ২০২৪ সালের একই সময়ের তুলনায় এখনো বেশি।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালানোর ঘটনায় করা মামলায় এখন পর্যন্ত পুলিশের ১ হাজার ৪৯০ জন সদস্যের নাম এসেছে।

এ ছাড়া ১৪১ কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। ১৪২ জনকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করা হয়েছে অথবা অন্যত্র সংযুক্ত করা হয়েছে। পলায়নের অভিযোগে ৯৩ জনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি করেছে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর ঘটনা।

বর্তমান সরকারের প্রথম পাঁচ মাসেই অন্তত ৬৭ কর্মকর্তাকে অবসরে পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে ৩ মে ১৭ জন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা, ৫ জুলাই ৩৩ জন এবং ২৩ জুলাই আরও ১৭ জনকে অবসরে পাঠানো হয়।

কয়েকজন উপপরিদর্শক ও সহকারী উপপরিদর্শক বলেন, এসব সিদ্ধান্তে আগের সরকারের সময়ে পুলিশে যোগ দেওয়া বা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করা কর্মকর্তাদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

তাদের বক্তব্য, দুর্নীতি বা ক্ষমতার অপব্যবহারের জন্য দায়ী কর্মকর্তাদের শাস্তি হওয়া উচিত। তবে কোনো সরকার আমলে চাকরি করা বা গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করাই যেন কারও ভবিষ্যৎ নির্ধারণের কারণ না হয়।

ফৌজদারি মামলা বা প্রশাসনিক ব্যবস্থার মুখে থাকা কয়েকজন কর্মকর্তার অভিযোগ, তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করার আগে প্রকৃত ভূমিকা সব সময় ঠিকভাবে যাচাই করা হয়নি।

তাদের কেউ কেউ দাবি করেছেন, কোনো কোনো ঘটনায় অভিযুক্ত কর্মকর্তা ঘটনাস্থলেই ছিলেন না। কেউ দায়িত্বে ছিলেন না, আবার কেউ তখন অন্য ইউনিটে কর্মরত ছিলেন। এরপরও তাদের মামলায় আসামি করা হয়েছে।

কর্মকর্তাদের দাবি, পুলিশের অভ্যন্তরীণ বিরোধ ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণেও কারও কারও নাম মামলায় এসেছে।

তবে অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক খন্দকার রফিকুল ইসলাম এ অভিযোগ নাকচ করেছেন। তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, গণমাধ্যম বা অন্য কোনো মাধ্যমে পাওয়া তথ্য যথাযথভাবে যাচাই না করে কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয় না।

ঘন ঘন বদলি ও দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনাও পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্যে অস্থিরতা তৈরি করছে।

জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা বলছেন, একজন জেলার পুলিশ সুপারকে স্থানীয় অপরাধের ধরন বুঝতে, তথ্যের নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে এবং বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে সমন্বয় তৈরি করতে সময় লাগে।

কয়েক মাসের মধ্যেই কোনো কর্মকর্তাকে বদলি করা হলে এসব কাজ ব্যাহত হয়। এমনকি নতুন দায়িত্বে যোগ দেওয়ার আগেই বদলি করা হলেও একই সমস্যা তৈরি হয়।

কর্মকর্তারা ফেনীর পুলিশ সুপারকে নিয়োগের পরপরই সরিয়ে দেওয়া এবং পঞ্চগড়ের পুলিশ সুপারকে দায়িত্ব নেওয়ার আগেই বদলি করার উদাহরণ দিয়েছেন।

মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান ও পুলিশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক উমর ফারুক বলেন, বারবার বদলি হলে কর্মকর্তাদের নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে সমস্যা হয়। বিশেষ করে গ্রাম ও মহানগরের মতো ভিন্ন ধরনের এলাকায় বদলি হলে এই সমস্যা আরও বেশি হয়।

তবে সাবেক মহাপরিদর্শক আশরাফুল হুদা মনে করেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর পুলিশের কাঠামোতে পরিবর্তন আনার প্রক্রিয়ায় বদলি হওয়া স্বাভাবিক। ১৭ বছর ধরে গড়ে ওঠা একটি ব্যবস্থা বদলাতে গেলে কিছু সমস্যা হবেই।

তবে কর্মকর্তাদের আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, ধীরে ধীরে পরিস্থিতি স্থির হয়ে আসবে। একই সঙ্গে নির্দোষ কর্মকর্তারা যেন এসব ব্যবস্থার শিকার না হন, সে বিষয়ে কর্তৃপক্ষকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন তিনি।

পদোন্নতি নিয়ে পুরোনো অসন্তোষও পুলিশের মধ্যে হতাশা বাড়াচ্ছে।

২০২৩ সালের নভেম্বরে আওয়ামী লীগ সরকার ১৪০ জন পুলিশ সুপারকে অতিরিক্ত ডিআইজি পদে পদোন্নতি দেয়। নিয়মিত পদ খালি না থাকায় তাদের অতিরিক্ত পদে এই পদোন্নতি দেওয়া হয়েছিল।

পদোন্নতি পেলেও তাদের বেশির ভাগ আগের পদেই দায়িত্ব পালন করতে থাকেন। এখন পর্যন্ত মাত্র ২৯ জনকে নিয়মিত পদে নেওয়া হয়েছে। ফলে ১০০ জনের বেশি কর্মকর্তা এখনো নিয়মিত পদায়নের অপেক্ষায় আছেন।

একজন অতিরিক্ত ডিআইজি বলেন, সরকার পরিবর্তনের পর এই দীর্ঘদিনের সমস্যা সমাধান হবে বলে তারা আশা করেছিলেন।

তিনি বলেন, নিয়মিত পদে পদায়নের বদলে আমাদের অতিরিক্ত পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছিল। আড়াই বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও আমাদের অনেকেই এখনো নিয়মিত পদে দায়িত্ব পাওয়ার অপেক্ষায় আছেন।

পুলিশ সদর দপ্তরের কর্মকর্তারাও বলছেন, অতীতে কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক পরিচয় বা রাজনৈতিক অবস্থান সম্পর্কে ধারণা তাদের পদোন্নতি ও পদায়নে প্রভাব ফেলেছে।

তাদের মতে, এসব পুরোনো অভিযোগ এখন রাজনৈতিক বিবেচনায় নয়, পেশাগত যোগ্যতার ভিত্তিতে পর্যালোচনা করা দরকার।

বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন গত ৯ আগস্ট এক বিবৃতিতে জানায়, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর পুলিশের যে মনোবল ভেঙে পড়েছিল, তা ধীরে ধীরে ফিরছে।

তবে সংগঠনটি সতর্ক করে বলেছে, রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময় পুলিশের পেশাগত সক্ষমতা ও অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা দুর্বল হয়ে পড়লে জননিরাপত্তা ও রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

অধ্যাপক উমর ফারুক বলেন, পুলিশের মূল সমস্যা হলো একটি স্বাধীন ও পেশাদার কাঠামো গড়ে তুলতে না পারা। পুলিশ কমিশন যদি স্বাধীনভাবে কাজ করতে না পারে এবং পুলিশে রাজনৈতিক প্রভাব চলতে থাকে, তাহলে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে পুলিশকে ব্যবহার করার প্রবণতা থেকেই যাবে।

তার মতে, নির্দিষ্ট অপরাধে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। তবে নির্বিচারে জোর করে অবসরে পাঠানোর সিদ্ধান্ত ঠিক নয়। এতে পুলিশের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

সাবেক আইজিপি আশরাফুল হুদাও পুলিশে বড় ধরনের সংস্কার এবং কর্মকর্তাদের কল্যাণ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।

একজন ডিআইজি বলেন, পুলিশের ভেতরে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এখন সবচেয়ে জরুরি। নইলে মানুষের প্রত্যাশা অনুযায়ী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে না।

Related Articles

Latest Posts