দরিদ্র পরিবার থেকে ‘লোক সংগীতের রানি’, বিদায় ডলি পার্টন

আমেরিকান লোক সংগীতের কিংবদন্তি ডলি পার্টন মারা গেছেন। মঙ্গলবার ৮০ বছর বয়সে তার মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে পরিবার।

রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়।

মাত্র ছয় বছর বয়সেই নিজের প্রথম গান লিখেছিলেন ডলি। এটি ছিল ভুট্টার শিষ দিয়ে তৈরি পুতুলকে নিয়ে লেখা। এরপর আর থামেননি ডলি। প্রায় ছয় দশকের দীর্ঘ ক্যারিয়ারে গায়িকা, গীতিকার ও অভিনেত্রী হিসেবে তিনি বিশ্বজুড়ে খ্যাতি অর্জন করেন। নিজের দক্ষতার কারণে তিনি হয়ে উঠেছিলেন মার্কিন সংগীতের অন্যতম জনপ্রিয় তারকা।

Dolly Parton

ডলি পার্টন ১১টি গ্র্যামি পুরস্কার জিতেছেন। এর মধ্যে রয়েছে আজীবন সম্মাননা পুরস্কারও। কোট অব মেনি কালার্স, জোলিন ও আই উইল অলওয়েজ লাভ ইউয়ের মতো জনপ্রিয় গান তাকে সর্বকালের অন্যতম সফল শিল্পীতে পরিণত করে। তার অ্যালবাম বিক্রি হয়েছে ১০ কোটিরও বেশি।

তার গান দেশের সীমানা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক শ্রোতাদের কাছেও লোক সংগীতকে পরিচিত করে।

ডলির ক্যারিয়ার কেবল গানেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। টেলিভিশনে নিজস্ব অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেছেন, অভিনয় করেছেন সিনেমায়। ১৯৮০ সালে ‘৯ টু ৫’ সিনেমার মাধ্যমে বড় পর্দায় তার অভিষেক হয়। সিনেমাটির টাইটেল গানের জন্য অস্কারে সেরা মৌলিক গানের মনোনয়নও পান।

দ্য বেস্ট লিটল হোরহাউস ইন টেক্সাস, স্টিল ম্যাগনোলিয়াস, রাইনস্টোন ও স্ট্রেইট টকের মতো সিনেমাতেও অভিনয় করেছেন ডলি।

নিজের জন্মভূমি টেনেসিতে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘ডলিউড’ নামে একটি থিম পার্ক, যা পরে জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হয়।
শৈশব ছিল দারিদ্র্যে ভরা

১৯৪৬ সালের ১৯ জানুয়ারি টেনেসির পিটম্যান সেন্টারে জন্ম ডলি রেবেকা পার্টনের। কাছের লোকাস্ট রিজ এলাকায় একটি ছোট এককক্ষের কেবিনে ১২ ভাইবোনের সঙ্গে তার বেড়ে ওঠা। তার বাবা রবার্ট লি পার্টন ছিলেন তামাকচাষি।

Dolly Parton

দারিদ্র্যের মধ্যেই কেটেছে তার শৈশব। আর সেই অভিজ্ঞতাই পরে তার অনেক গানে উঠে এসেছে।

ডলির মা অ্যাভি লি নিয়মিত গান গাইতেন। ইংল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড ও ওয়েলসের গল্পভিত্তিক গানগুলো মেয়ের ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল।

আট বছর বয়সে প্রথম নিজের গিটার পান ডলি। ১১ বছর বয়সেই স্থানীয় একটি রেডিও স্টেশনে গান গাইতে শুরু করেন। মাত্র ১৩ বছর বয়সে ন্যাশভিলের বিখ্যাত ‘গ্র্যান্ড ওলে অপ্রি’ মঞ্চে গান করার সুযোগ পান।

স্কুলের পড়া শেষ করে সংগীতের ক্যারিয়ার গড়তে ন্যাশভিলে চলে যান তিনি। সেখানে লোক সংগীতশিল্পী পোর্টার ওয়াগনের সঙ্গে তার দীর্ঘ সংগীতজুটি গড়ে ওঠে। দুজনের ১৪টি গান সেরা দশে জায়গা করে নেয়।

পরে একক ক্যারিয়ারে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে ওয়াগনকে বিদায় জানিয়ে লেখেন ‘আই উইল অলওয়েজ লাভ ইউ’। বহু বছর পর হুইটনি হিউস্টনের গাওয়া গানটির সংস্করণও বিশ্বজুড়ে বিপুল জনপ্রিয়তা পায়।

Dolly Parton -- for family reacts story

ন্যাশভিলে আসার প্রথম দিনেই ডলি পরিচিত হন কার্ল ডিনের সঙ্গে। দুজনের বিয়ে হয় ১৯৬৬ সালে। দীর্ঘ দাম্পত্যজীবনে কার্ল ডিন সবসময় প্রচারের আড়ালে থেকেছেন। ডলির সঙ্গে সফরেও যেতেন না তিনি।

তার জীবন থেকেই অনুপ্রেরণা পেয়েছিল ডলির অন্যতম জনপ্রিয় গান ‘জোলিন’। এক লালচুলো ব্যাংককর্মী কার্ল ডিনের প্রতি আগ্রহ দেখিয়েছিলেন। সেই ঘটনাই গানের গল্পে রূপ নেয়।

ডলি পার্টনের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল গান লেখা। জীবদ্দশায় তিনি প্রায় তিন হাজার গান লিখেছেন বলে ধারণা করা হয়, যদিও নিজে রেকর্ড করেছেন প্রায় ৪৫০টি।

তার লেখা গান গেয়েছেন বিভিন্ন ঘরানার শিল্পীরা। ‘জোলিন’ গানটি বিয়ন্সে ও দ্য হোয়াইট স্ট্রাইপসের মতো শিল্পীরাও গেয়েছেন। তার গান ‘আই উইল অলওয়েজ লাভ ইউ’ হুইটনি হিউস্টনের কণ্ঠে নতুন করে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পায়।

ডলির ২৫টি গান বিলবোর্ডের লোক সংগীত চার্টে এক নম্বরে উঠেছিল। ২০০৭ সালে তিনি সংরাইটার্স হল অব ফেমের সর্বোচ্চ সম্মান জনি মার্সার অ্যাওয়ার্ড পান। ২০২২ সালে জায়গা করে নেন রক অ্যান্ড রোল হল অব ফেমেও।

Dolly Parton, 1965

দারিদ্র্যের মধ্যে বেড়ে ওঠা ডলি সবসময় সাধারণ মানুষের সঙ্গে নিজের সম্পর্ককে গুরুত্ব দিয়েছেন। বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগেও অর্থ ও সময় দিয়েছেন।

করোনাভাইরাস মহামারির সময় ২০২০ সালে ভ্যান্ডারবিল্ট ইউনিভার্সিটির ভ্যাকসিন গবেষণায় ১০ লাখ ডলার দান করেন তিনি। পরে এই গবেষণা মডার্নার কোভিড-১৯ টিকা তৈরির কাজেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

শিশুদের বই পড়ায় আগ্রহী করে তুলতে যুক্তরাষ্ট্রসহ কানাডা, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া ও আয়ারল্যান্ডে সাক্ষরতা কর্মসূচিও পরিচালনা করেছেন ডলি। নিজের জন্মস্থান টেনেসির কাউন্টির স্কুলশিক্ষার্থীদের বৃত্তিও দিয়েছেন।

তার সম্মানে কাউন্টির আদালত ভবনের সামনে ডলির পূর্ণাঙ্গ ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়। তবে ২০২১ সালে ন্যাশভিলে নিজের আরেকটি ভাস্কর্য স্থাপনের প্রস্তাব তিনি প্রত্যাখ্যান করেন।

রাজনৈতিক বিভাজনে জর্জরিত যুক্তরাষ্ট্রে ডলির জনপ্রিয়তার বড় কারণ ছিল তার নিরপেক্ষ অবস্থান, শিকড়ের সঙ্গে সম্পর্ক এবং পরিশ্রমী মানসিকতা। রক্ষণশীল ও উদারপন্থী দুই ধরনের মানুষের কাছেই তিনি ছিলেন প্রিয়।

Dolly Parton, late 1960s

জীবনের শেষ পর্যন্ত গান লেখাকেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেছেন ডলি। তার ভাষায়, গান লেখার সময়ই তিনি সৃষ্টিকর্তাকে সবচেয়ে কাছাকাছি অনুভব করতে পারতেন।

তিনি বলেছিলেন, দিনের শেষে তিনি চান মানুষ তাকে একজন ভালো গীতিকার হিসেবে মনে রাখুক, ‘গানই আমার উত্তরাধিকার।’

৮০ বছরের জীবনে ডলি পার্টন কেবল লোক সংগীতের একজন তারকা ছিলেন না। নিজের গান, ব্যক্তিত্ব ও মানুষের জন্য কাজের মাধ্যমে তিনি হয়ে উঠেছিলেন বিশ্বসংস্কৃতির এক স্বতন্ত্র আইকন।

Related Articles

Latest Posts