বাংলাদেশের ফুটবলে প্রবাসী ও বিদেশে বেড়ে ওঠা বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়দের আগমন নতুন কিছু নয়। তবে রোনান ও ডেকলান সুলিভানের গল্পটা যেন একটু আলাদা। যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়ায় বেড়ে ওঠা আইরিশ নামের দুই যমজ ভাই, যারা বাংলাদেশে আগে কখনো আসেননি, তারাই একদিন বাংলাদেশের জার্সিতে মাঠে নেমে জিতেছেন অনূর্ধ্ব-২০ সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ। সেই সাফল্যের পর এবার তাদের চোখ আরও বড় কিছুর দিকে।
গল্পের সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্তটি এসেছিল মালদ্বীপে অনুষ্ঠিত সেই ফাইনালে। নির্ধারিত সময়ের ম্যাচ গোলশূন্য থাকার পর টাইব্রেকারে গড়ায় লড়াই। বাংলাদেশের হয়ে পঞ্চম ও শেষ পেনাল্টি নিতে এগিয়ে যান রোনান সুলিভান।
রোনান জীবনে মাত্র দুবার পানেনকা পেনাল্টি নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। দুটিই হয়েছিল পৃথিবীর অন্য প্রান্তে অনুশীলনে, যার একটিতে বল গিয়ে লাগে ক্রসবারে। কিন্তু সেই অভিজ্ঞতা সত্ত্বেও ফাইনালের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে শেষ পেনাল্টিতে আবারও পানেনকা বেছে নিতে দ্বিধা করেননি তিনি।
ভাইয়ের সেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ডেকলান পরে বলেছিলেন, ‘ওকে বলতেই হতো না। আমি জানতাম, ও সেটাই করবে। পুরো সময়ই জানতাম, জেতানোর শেষ পেনাল্টি পেলে ও এটা করবে। এটাই তো ওর স্বভাব।’
তারপর যা ঘটেছিল, তা যেন সিনেমার দৃশ্য। রোনানের চিপ করা বলটি ধীরে ধীরে জালে জড়ায়। মালদ্বীপের গ্যালারিতে থাকা হাজারো দর্শক উল্লাসে ফেটে পড়েন। বাংলাদেশ পেয়ে যায় অনূর্ধ্ব-২০ সাফের শিরোপা। রোনান নিজেও পরে বলেছিলেন, ‘তুমি যদি আমাকে আগে বলতে, ম্যাচটা এভাবে শেষ হবে, আমি বিশ্বাসই করতাম না।’
অথচ মাত্র দুই বছর আগেও বাংলাদেশের ফুটবলের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ছিল কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কয়েকটি বার্তায়। ‘সেভ বাংলাদেশ ফুটবল’ নামের একটি সমর্থক পেজ থেকে পাওয়া বার্তাই শেষ পর্যন্ত দুই ভাইকে বাংলাদেশের অনূর্ধ্ব-২০ দলে ট্রায়ালের সুযোগ এনে দেয়।
তখনও বাংলাদেশে আসার কোনো পাসপোর্ট পর্যন্ত ছিল না তাদের। এরপর শুরু হয় কাগজপত্রের জটিলতা। তাদের মায়ের বাংলাদেশি পাসপোর্ট না থাকায় বাংলাদেশি পাসপোর্ট পাওয়ার প্রক্রিয়াও সহজ ছিল না। শেষ পর্যন্ত মার্চে নিউইয়র্ক থেকে দিল্লি, সেখান থেকে ঢাকায় পাড়ি জমান দুই ভাই। সেটিই ছিল তাদের জীবনের দীর্ঘতম ভ্রমণ।
ঢাকায় অবশ্য তাদের জন্য কোনো রাজকীয় অভ্যর্থনা অপেক্ষা করছিল না। ৩০ জনের বেশি খেলোয়াড় নিয়ে চলছিল ক্যাম্প। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আরও তিনজন খেলোয়াড়ও সেখানে ছিলেন। মাঠে ভাষাগত সমস্যাও ছিল।
রোনান বলেন, ‘বিদেশি হলে শুরুতে বল পাওয়াটা একটু কঠিন। ভাষা জানো না, আর হয়তো ছেলেরা শুরুতে খুব একটা খুশিও ছিল না যে আমরা সেখানে আছি। কিন্তু কয়েকবার বল পাওয়ার পর তুমি কী করতে পারো সেটা দেখাতে পারলে বিষয়টা সহজ হয়ে যায়।’
কয়েক দিনের অনুশীলনেই অবশ্য নিজেদের জায়গা করে নেওয়ার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠেন দুই ভাই। মাঠের বাইরেও ধীরে ধীরে দলের সঙ্গে মিশে যান তারা। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশি জার্সিতে তাদের সেই যাত্রার পরিণতি হয় শিরোপা জয়ে।
বাংলাদেশের হয়ে তাদের খেলার যোগ্যতা এসেছিল মায়ের দিকের পারিবারিক শিকড় থেকে। শুধু রোনান ও ডেকলান নন, তাদের ভাই কুইন ও ক্যাভান সুলিভানও ফুটবলার। চার ভাইয়েরই যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি ও বাংলাদেশের হয়ে খেলার যোগ্যতা ছিল। কুইন ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় দলের হয়ে খেলে সেই পথ বন্ধ করেছেন, আর ম্যানচেস্টার সিটিতে যাওয়ার পথে থাকা ক্যাভান যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম সম্ভাবনাময় তরুণ।
তবে রোনান ও ডেকলানের জন্য বাংলাদেশের পথটি ছিল অনেক বেশি বাস্তবসম্মত এবং শেষ পর্যন্ত সেটিই তাদের নতুন পরিচয় এনে দিয়েছে।
তাদের সাফল্যের গল্প শুধু দুই ভাইয়ের মধ্যেই আটকে নেই। বাংলাদেশ জাতীয় দলের নতুন কোচ থমাস ডুলি এখন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ফুটবলারদের খুঁজছেন। তার বিশ্বাস, দেশের বাইরে থাকা প্রতিভাদের সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে জাতীয় দলের মান উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব।
ডুলি মনে করেন, বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের আন্তর্জাতিক পর্যায়ের ফুটবলারদের কাছ থেকে শেখার সুযোগ তৈরি করা জরুরি। লেস্টার সিটির মিডফিল্ডার হামজা চৌধুরীকেও তিনি এর উদাহরণ হিসেবে দেখছেন।
তার ভাষায়, ‘সবাই খুশি হয়েছিল হামজা আসায়। খেলোয়াড়েরাও বোঝে, আন্তর্জাতিক পর্যায়ের খেলোয়াড়রা তাদের সাহায্য করতে পারে। তারা তাদের কাজের ধরন, মানসিকতা ও পরিশ্রম দেখে শিখতে পারে।’
বিদেশে খেলোয়াড় খোঁজার ক্ষেত্রে অবশ্য সতর্ক থাকার কথাও বলেছেন ডুলি। তার কাছে শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভালো কোনো ফ্রি-কিকের ভিডিও দেখালেই কাউকে জাতীয় দলে নেওয়ার কারণ তৈরি হয় না। স্থানীয় প্রতিভাদের উন্নয়নের পাশাপাশি সত্যিকারের পার্থক্য গড়ে দিতে পারবেন, এমন খেলোয়াড়দেরই বেছে নিতে চান তিনি।
ডুলির বিশ্বাস, সঠিক কোচিং, শারীরিক সক্ষমতা এবং খেলার সময় ভুল কমানোর দিকে মনোযোগ দিতে পারলে বাংলাদেশ বর্তমান অবস্থান থেকে অনেকটাই ওপরে উঠতে পারে। এমনকি ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে ১৫০-এর ঘরে ওঠাকেও তিনি বাস্তবসম্মত লক্ষ্য মনে করছেন।
তবে রোনান ও ডেকলান সুলিভানদের গল্প কিংবা বাংলাদেশের ফুটবলে প্রবাসী প্রতিভাদের নতুন করে যুক্ত হওয়ার পেছনে স্বপ্নটা আরও বড়। শুধু র্যাঙ্কিংয়ে কয়েক ধাপ ওপরে ওঠা নয়, বাংলাদেশকে এমন এক দল হিসেবে গড়ে তোলা, যারা বিশ্বমঞ্চে নিজেদের জায়গা করে নিতে পারে।
