কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের ব্যবহার বাড়িয়ে ব্যাপকভাবে কর্মীসংখ্যা কমানোর পরিকল্পনা করেছিল ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের মালিক প্রতিষ্ঠান মেটা। কোনো কোনো দলের কর্মীসংখ্যা ৬০ শতাংশ পর্যন্ত কমানোর কথাও ভাবা হয়েছিল।
তবে কর্মীদের তীব্র প্রতিক্রিয়া, এআই থেকে প্রত্যাশিত ফল না পাওয়া এবং বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগের কারণে শেষ পর্যন্ত পরিকল্পনাটি অনেকটাই গুটিয়ে আনা হয়েছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘প্রজেক্ট ওটি’ নামে এই পরিকল্পনার লক্ষ্য ছিল মেটাকে একটি ‘এআই নেটিভ’ প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা। এজন্য হাজারো কর্মীর দৈনন্দিন কাজ এআই দিয়ে করানোর পাশাপাশি ছোট ও দক্ষ মানবকর্মী দলের মাধ্যমে ভার্চুয়াল কর্মীদের পরিচালনার পরিকল্পনা করা হয়েছিল।
রয়টার্স জানায়, পরিকল্পনাটি দুই ধাপে বাস্তবায়নের কথা ছিল। প্রথম ধাপে মে মাসে এবং দ্বিতীয় ধাপে নভেম্বরে কর্মী ছাঁটাই ও পুনর্গঠন করার পরিকল্পনা করা হয়। খালি পদ বন্ধ করা এবং দুর্বল কর্মদক্ষতার কর্মীদের বাদ দেওয়ার বিষয়ও ছিল এতে।
তবে ১৯ মে রাতে, প্রথম ধাপের ছাঁটাইয়ের মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে মেটার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মার্ক জাকারবার্গ নভেম্বরে দ্বিতীয় ধাপের পুনর্গঠন বাতিল করেন। পরদিন মেটা ১০ শতাংশ কর্মী ছাঁটাই করে।
মেটা পরে প্রজেক্ট ওটির অস্তিত্ব স্বীকার করে। প্রতিষ্ঠানটি জানায়, এটি ছিল ব্যয় কমানো, দলের কাঠামো পুনর্গঠন এবং কর্মীদের এআই মডেলের প্রশিক্ষণ ম্যানুয়াল তৈরির মতো নতুন গুরুত্বপূর্ণ কাজে সরিয়ে নেওয়ার একটি পরিকল্পনা।
তবে মেটার দাবি, পুরো কোম্পানির ৬০ শতাংশ কর্মী ছাঁটাইয়ের কোনো পরিকল্পনা ছিল না। কিছু নির্দিষ্ট দলের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৬০ শতাংশ কর্মী কমানোর সম্ভাবনা বিবেচনা করা হয়েছিল। সেখানে ছাঁটাইয়ের পাশাপাশি কর্মীদের অন্য বিভাগে সরিয়ে নেওয়ার কথাও ছিল।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২২ সালের শেষ দিকে ওপেনএআইয়ের চ্যাটজিপিটি বাজারে আসার পর সিলিকন ভ্যালির প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এআই দিয়ে কর্মক্ষেত্র বদলে দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করে।
মেটার কর্মকর্তারাও এমন একটি কর্মপরিবেশ তৈরির পরিকল্পনা করেন, যেখানে শুধু বিদ্যমান কাজে এআই যুক্ত করা হবে না, বরং পুরো কাজের ধরনই এআইকে কেন্দ্র করে নতুন করে সাজানো হবে।
রয়টার্সের হাতে আসা মেটার এক অভ্যন্তরীণ নথিতে বলা হয়, এআইনির্ভর সরঞ্জাম ও এজেন্ট তাদের কাজের সঙ্গে যুক্ত হবে, বিভিন্ন প্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয়ও করা হবে এবং নতুন পণ্য তৈরিতে এআইকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
এর অংশ হিসেবে মেটার বিভিন্ন দলে ছোট ছোট ‘টেক পড’ তৈরি করা হয়। এসব দলে সাধারণত দুই থেকে তিনজন প্রকৌশলী ও একজন নকশাবিদ থাকতেন। প্রচলিত ছয় মাসের পরিকল্পনার বদলে চার সপ্তাহের মধ্যে নতুন পণ্যের নমুনা তৈরির লক্ষ্য নেওয়া হয়।
পরে মেটার একটি অভ্যন্তরীণ ‘এআই নেটিভ প্লেবুকে’ এই কাজের সঙ্গে যুক্ত নকশাবিদ ও প্রকৌশলীদের আলাদা ভূমিকা বাদ দিয়ে সবাইকে ‘বিল্ডার’ (প্রস্তুতকারক) হিসেবে দেখার কথা বলা হয়। মধ্যম সারির ব্যবস্থাপনার স্তরও কমানোর পরিকল্পনা ছিল।
তবে এআইকে কেন্দ্র করে এই পরিবর্তন কর্মীদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ তৈরি করে।
রয়টার্স জানায়, মার্চে মেটার বড় ধরনের কর্মী ছাঁটাইয়ের পরিকল্পনার খবর প্রকাশের পর কর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। এর আগে ২০২২ সালের শেষ থেকে ২০২৩ সালের শুরুর দিকে মেটা প্রায় ২৫ শতাংশ কর্মী ছাঁটাই করেছিল।
চলতি বছর এপ্রিলে জানা যায়, ২০ মে প্রথম ধাপে প্রায় ১০ শতাংশ কর্মী ছাঁটাই করা হবে। একই সময়ে কিছু প্রকৌশলীকে নতুন ‘অ্যাপ্লাইড এআই ইঞ্জিনিয়ারিং’ বিভাগে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে মেটার এআই মডেলের কোড লেখার দক্ষতা বাড়ানোর জন্য প্রশিক্ষণ ম্যানুয়াল তৈরির কাজ দেওয়া হয়।
অনেক কর্মী অভ্যন্তরীণ যোগাযোগমাধ্যমে এই কাজকে একঘেয়ে ও বিরক্তিকর বলে মন্তব্য করেন।
এদিকে মেটা যুক্তরাষ্ট্রের কর্মীদের কম্পিউটারে এমন সফটওয়্যার বসানোর উদ্যোগ নেয়, যা কিবোর্ডে চাপ দেওয়া ও মাউস ব্যবহারের তথ্য সংগ্রহ করে এআই এজেন্টকে মানুষের মতো কম্পিউটার ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দিতে পারবে।
এতে অনেক কর্মী আশঙ্কা করেন, তারা হয়তো নিজেরাই নিজেদের চাকরি প্রতিস্থাপনের জন্য এআইকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। মেটার অভ্যন্তরীণ যোগাযোগমাধ্যমে ছাঁটাই নিয়ে ক্ষোভ ও ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্যও বাড়তে থাকে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, মেটার কর্মীদের মনোবলের সূচক ছয় মাসে ৭৪ শতাংশ ইতিবাচক থেকে ৫৫ শতাংশে নেমে আসে। একই সময়ে শ্রমিক সংগঠন গঠনের উদ্যোগও জোরালো হয়।
কর্মীদের ক্ষোভের পাশাপাশি এআই প্রযুক্তি নিয়েও মেটার ভেতরে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে।
রয়টার্সের দেখা অভ্যন্তরীণ তথ্য অনুযায়ী, এআই ব্যবহার করে কর্মীরা আগের তুলনায় অনেক বেশি কোড তৈরি করছিলেন। কিন্তু এতে প্রকৃত উৎপাদনশীলতা কতটা বেড়েছে, তা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়।
মেটার অভ্যন্তরীণ সফটওয়্যার ও অবকাঠামোয় কোড পরিবর্তনের পরিমাণ এক বছরে ২২০ শতাংশ বেড়েছিল। কিন্তু ব্যবহারকারীদের জন্য নতুন বা উন্নত সুবিধা তৈরি করা পরিবর্তনের হার বেড়েছিল মাত্র ৩৬ শতাংশ।
এআই এজেন্ট ব্যবহারের কারণে প্রযুক্তিগত ও নিরাপত্তাজনিত সমস্যাও বেড়েছিল বলে অভ্যন্তরীণ নথিতে উল্লেখ করা হয়। বড় ধরনের সেবা বিঘ্ন ও সম্ভাব্য তথ্য ফাঁসের ঘটনা আগের বছরের তুলনায় ৪০ শতাংশ বেড়ে যায়। এসব সমস্যা সামাল দিতে কর্মীদের ব্যয় করা সময়ও ৭০ শতাংশ বেড়েছিল।
জুনের শুরুতে এর একটি প্রকাশ্য উদাহরণও দেখা যায়। মেটার নতুন এআইনির্ভর গ্রাহক সহায়তা ব্যবস্থা ব্যবহার করে হ্যাকাররা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করতে সক্ষম হয়। এর মধ্যে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার হোয়াইট হাউসের নিষ্ক্রিয় অ্যাকাউন্টও ছিল।
পরিস্থিতি সামলাতে ২০ মে ছাঁটাইয়ের কয়েক ঘণ্টা আগে জাকারবার্গ দ্বিতীয় ধাপের পুনর্গঠন বাতিল করেন। তবে প্রথম ধাপে ১০ শতাংশ কর্মী ছাঁটাই করা হয়।
এরপর কর্মীদের উদ্দেশে দেওয়া এক বার্তায় জাকারবার্গ বলেন, ওই বছর আর কোনো কোম্পানিব্যাপী ছাঁটাই হবে বলে তিনি আশা করছেন না। কর্মীদের আরও স্থিতিশীলতা দেওয়ার কথাও জানান তিনি।
রয়টার্স জানায়, এরপর মেটা কর্মীদের মনোবল ফেরাতে কয়েকটি পদক্ষেপ নেয়। কিবোর্ড ও মাউস ব্যবহারের তথ্য সংগ্রহের কর্মসূচি স্থগিত করা হয়। এআই প্রকৌশল বিভাগে স্থানান্তরিত কিছু কর্মীকে পুরোনো দলে ফিরে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়।
জুনে জাকারবার্গ কর্মীদের জানান, এআই দিয়ে কর্মীদের কাজের ধরন বদলাতে গিয়ে মেটা কিছু ভুল করেছে। একইসঙ্গে তিনি সাংগঠনিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে কর্মীদের যতটা সম্ভব স্থিতিশীলতা দেওয়ার কথা বলেন।
তবে মেটায় কর্মী কমানোর সম্ভাবনা পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, জাকারবার্গ কর্মীদের সঙ্গে কথা বলার সময় ‘কোম্পানিব্যাপী’ এবং ‘এ বছর’—এই দুটি শব্দ ব্যবহার করেছেন। ফলে কিছু কর্মীর ধারণা, ভবিষ্যতে নির্দিষ্ট দলভিত্তিক ছাঁটাই বা কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে চাকরি হারানোর ঘটনা ঘটতে পারে।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে এআই অবকাঠামোয় মেটার বিপুল ব্যয়। চলতি বছর এআই চিপ ও অন্যান্য অবকাঠামোয় অন্তত ১৩০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। ফলে এআইয়ে বিপুল বিনিয়োগের চাপের মধ্যে ব্যয় কমানোর প্রয়োজনীয়তাও রয়ে গেছে।
তারপরও জাকারবার্গ এআইনির্ভর ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী। তার মতে, ভবিষ্যতে কাজের সুযোগ বরং বাড়তে পারে। তবে কিছু কোম্পানি ছোট হয়ে যেতে পারে। কম কর্মী নিয়ে আরও বেশি কোম্পানি তৈরি হতে পারে বলেও তিনি মনে করেন।
