গণঅভ্যুত্থানের পর দেশে ‘অশুভ শক্তি ও উগ্রপন্থীরা’ চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সন্ত্রাস, সংঘর্ষ, খুনোখুনি ও মব সংস্কৃতির নতুন প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে বলে মন্তব্য করেছেন গণফোরামের প্রতিষ্ঠাতা ও দলটির ইমেরিটাস সভাপতি ড. কামাল হোসেন।
তিনি বলেন, ধর্মীয় উন্মাদনায় এই শক্তি বাঙালি সংস্কৃতি ও জীবনমানের ওপর আঘাত হানছে এবং মুক্তিযুদ্ধের মীমাংসিত বিষয়গুলোকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। সরকার এই শক্তিকে দমন করতে ব্যর্থ হলে দেশে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে।
শনিবার বিকেলে গণফোরামের ৩৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে রাজধানীর রমনায় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে দেওয়া লিখিত বক্তব্যে এসব কথা বলেন কামাল হোসেন। অনুষ্ঠানে তাকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। তার পক্ষে বক্তব্য পাঠ করেন গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক মো. মিজানুর রহমান।
কামাল হোসেনের বক্তব্যে বলা হয়, ‘লক্ষ করা যাচ্ছে, গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে একটি অশুভ শক্তি ও উগ্রপন্থীরা বিগত আমলের মতোই সর্বত্র চাঁদাবাজি, দখলবাজি, আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সন্ত্রাস, সংঘর্ষ, খুনোখুনি ও মব সংস্কৃতির এক নতুন প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে।’
তিনি বলেন, ‘ধর্মীয় উন্মাদনায় তারা বাঙালি সংস্কৃতি ও জীবনমানের ওপর আঘাত হানছে। মুক্তিযুদ্ধের মীমাংসিত বিষয়গুলোকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।’
মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সব সংগঠনকে ঐক্যবদ্ধভাবে এই শক্তির বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকার আহ্বান জানিয়ে কামাল হোসেন বলেন, ‘ভবিষ্যতে সরকার এই অশুভ শক্তিকে দমন করতে ব্যর্থ হলে দেশে ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হবে। এক্ষেত্রে এখনই সকলকে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।’
বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে স্বৈরাচার ও কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান ঘটলেও বৈষম্যহীন, মানবিক ও গণতান্ত্রিক কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সুযোগ কাজে লাগানো না গেলে দেশে নৈরাজ্য সৃষ্টি হতে পারে। এজন্য রাজনৈতিক ও আর্থসামাজিক স্থিতিশীলতার পাশাপাশি সুদৃঢ় জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজন।’
কামাল হোসেনের দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের কথা তুলে ধরে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেন, ‘তার রাজনীতির মূল ভিত্তি ছিল নীতি ও আদর্শ। কামাল হোসেনের বিশেষ কমিটমেন্ট ছিল, দেশ একটি গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে চলবে। কিন্তু শুধু গণতন্ত্রই যথেষ্ট নয়। তার বিশ্বাস ছিল, সামাজিক ন্যায়বিচার ছাড়া কোনো দেশের গণতন্ত্র সঠিকভাবে চলতে পারে না।’
স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খান বলেন, ‘গণতন্ত্র ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার বিশ্বাস থেকেই কামাল হোসেন গণফোরাম প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।’
তিনি বলেন, ‘গণতন্ত্রের পথ কোনো দিন কুসুমাস্তীর্ণ নয়। বাংলাদেশ বারবার হোঁচট খেয়েছে, আবার সেই হোঁচট থেকে বেরিয়ে সামনের দিকে এগিয়েছে।’
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘কামাল হোসেন শুধু সংবিধানপ্রণেতাই নন, মানবাধিকার, আইনের শাসন ও নাগরিকের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনেও তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
জাতীয় সম্পদ রক্ষায় তার আইনি অবদানের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে আজকে যে জাতীয় সম্পদ—গ্যাস বলেন বা অন্য কিছু বলেন—তার রক্ষাকর্তা হিসেবে ডক্টর কামাল হোসেনের আইনি অবদান অবশ্যই জাতিকে স্বীকার করতে হবে।’
গণফোরামের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সুব্রত চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, সিপিবির সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, জেএসডির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি তানিয়া রব প্রমুখ।
