শব্দদূষণ রোধে নতুন ও কঠোর বিধিমালা প্রণয়ন করা হলেও রাজধানীর নয়টি নির্ধারিত ‘নীরব এলাকায়’ সব ধরনের যানবাহনের অবিরাম হর্ন বাজানো অব্যাহত রয়েছে। এসব এলাকায় মাত্রাতিরিক্ত শব্দের হর্নও ব্যবহৃত হচ্ছে অহরহ।
পরিবেশ অধিদপ্তর এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) মিলিয়ে ঢাকা শহরের মোট নয়টি জায়গাকে নীরব এলাকা হিসেবে ঘোষণা করেছে। পরিবেশ অধিদপ্তর গত বছরের ডিসেম্বরে হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের চারপাশের তিন কিলোমিটার এলাকাকে নীরব এলাকা ঘোষণা করে। এর আগে তারা সচিবালয় ও এর আশপাশ, আগারগাঁও, সংসদ ভবন এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এলাকাকেও নীরব এলাকা ঘোষণা করেছিল। অন্যদিকে, ডিএনসিসি গত বছরের সেপ্টেম্বরে গুলশান, বনানী, বারিধারা ও নিকেতনকে নীরব এলাকা হিসেবে ঘোষণা করে।
গত বছর অন্তর্বর্তী সরকার শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে ‘শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা, ২০২৫’ প্রণয়ন করে। এতে অবৈধ হর্ন আমদানি, উৎপাদন, মজুত ও বিক্রির ওপর নিয়ন্ত্রণ ও শাস্তি জোরদার করা হয়।
নতুন বিধিমালার আওতায় সার্জেন্ট বা তার ওপরের পদমর্যাদার ট্রাফিক পুলিশ কর্মকর্তারা এখন ঘটনাস্থলেই জরিমানা করতে পারেন। ২০০৬ সালের বিধিমালায় এটা কেবল ম্যাজিস্ট্রেটরা করতে পারতেন। বর্তমান নিয়মে নিষিদ্ধ হর্ন ব্যবহারের দায়ে সর্বোচ্চ তিন মাসের কারাদণ্ড বা ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। আর যারা নিষিদ্ধ হর্ন উৎপাদন, আমদানি বা বাজারজাত করবেন, তাদের সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড বা দুই লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা বা উভয় দণ্ডের মুখোমুখি হতে হবে।
আইনে সাজা বৃদ্ধি ও কিছু এলাকাকে নীরব ঘোষণা করার পরও বাস্তবে পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়নি বললেই চলে। নীরব ঘোষিত এলাকাগুলোতেও অবিরাম শব্দের কারণে ভোগান্তিতে পড়ছেন পথচারী ও বাসিন্দারা। গবেষণায় দেখা গেছে, শহরের অন্তত চারটি নীরব এলাকায় শব্দের মাত্রা গ্রহণযোগ্য সীমার চেয়ে অনেক বেশি।
স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর অ্যাটমোসফেরিক পলিউশন স্টাডিজ (ক্যাপস)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের মার্চে সচিবালয়, আগারগাঁও, সংসদ ভবন ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়—এই চারটি নীরব এলাকায় শব্দের গড় মাত্রা ছিল ৯৭ দশমিক ৬৩ ডেসিবেল, যা গ্রহণযোগ্য মাত্রা ৫০ ডেসিবেলের প্রায় দ্বিগুণ। এর মধ্যে সচিবালয় এলাকায় গড় শব্দের মাত্রা ছিল ১০০ দশমিক ১৭ ডেসিবেল (সর্বোচ্চ ১২৭ ডেসিবেল), সংসদ ভবন এলাকায় ৯৯ দশমিক ৩৫ ডেসিবেল এবং আগারগাঁওয়ে ছিল ৭৮ দশমিক ১১ ডেসিবেল।
২০২৪ সালে বিমানবন্দর এলাকায় ক্যাপসের আরেক গবেষণায় দেখা যায়, নীরব এলাকা ঘোষণার আগে মূল ফটকে শব্দের গড় মাত্রা ছিল ৮৯ দশমিক ১৯ ডেসিবেল। ঘোষণার পরপরই তা বেড়ে দাঁড়ায় ৯০ দশমিক ০৩ ডেসিবেলে এবং দুই মাস পর তা ছিল ৮৯ দশমিক ৬৮ ডেসিবেল।
এ ছাড়া চলতি মাসে আন্তর্জাতিক জার্নাল ‘সায়েন্স অব দ্য টোটাল এনভায়রনমেন্ট’-এ একটি গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়, ম্যাকগিল বিশ্ববিদ্যালয়, ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডন ও ম্যাসাচুসেটস আমহার্স্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা ২০২৩ সালে ঢাকার ৬৭টি স্থান থেকে তথ্য সংগ্রহ করে এই গবেষণা করেন। এতে দেখা গেছে, ঢাকার কোনো আবাসিক বা নীরব এলাকাই রাতের বেলার শব্দের মানদণ্ড পূরণ করতে পারছে না।
রাত ৯টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত শব্দের গ্রহণযোগ্য মাত্রা ৪০-৬০ ডেসিবেল।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, সড়কে শব্দের মাত্রা দিনে ৫৩ ডেসিবেল এবং রাতে ৪৫ ডেসিবেলের নিচে থাকা উচিত। অথচ ঢাকার প্রায় সব বাসিন্দা ডব্লিউএইচওর নির্দেশিকার চেয়ে বেশি শব্দের মধ্যে আছেন এবং প্রায় ৯ লাখ মানুষ ৭০ ডেসিবেলের বেশি মাত্রার শব্দের মধ্যে বসবাস করছেন।
বিমানবন্দর এলাকার এক দোকানি হামিদুর রহমান বলেন, ‘উচ্চমাত্রার হর্নের কারণে কানে ব্যথা হয় এবং অনেক সময় মাথা ঘোরে। কর্তৃপক্ষ মাঝে মাঝে বেআইনি হর্ন খুলে জরিমানা করলেও কয়েক দিনের মধ্যে আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়।’ একই এলাকার বাসিন্দা সুমাইয়া আক্তার জানান, গাড়ির বিকট শব্দে তার শিশু সন্তান ভয় পায় এবং প্রায়ই মাথাব্যথার কথা বলে। তিনি এ বিষয়ে আরও কঠোর পদক্ষেপ দাবি করেন।
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ইএনটি-এর সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মো. আবু হানিফ জানান, উচ্চমাত্রার হর্ন শিশুদের কানের সংবেদনশীল কোষ স্থায়ীভাবে নষ্ট করে দিতে পারে। এতে শিশুদের শেখার ক্ষমতা বাধাগ্রস্ত হওয়া থেকে শুরু করে স্থায়ীভাবে বধির হওয়ার ঝুঁকিও থাকে। প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে ঘুমের ব্যাঘাত, উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।
নতুন বিধিমালার প্রয়োগ সম্পর্কে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিসুর রহমান বলেন, সনাতন পদ্ধতিতে শব্দদূষণকারী যান শনাক্ত করা বেশ কঠিন। তাই অতিরিক্ত শব্দ সৃষ্টিকারী গাড়ি স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত করার প্রযুক্তির কথা ভাবছে ডিএমপি।
তিনি জানান, পুলিশ হর্ন খুলে নেওয়ার পর চালকেরা অনেক সময় আবারও তা লাগিয়ে নেন, তাই সার্বক্ষণিক নজরদারি প্রয়োজন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা তীব্র শব্দের মধ্যে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ট্রাফিক পুলিশের অনেকেই শ্রবণশক্তি হারানো ও মাথাব্যথায় ভুগছেন। পুলিশ সদস্যদের জন্য ‘ইয়ার প্রোটেকশন ডিভাইস’ কেনার কথা ভাবছে ডিএমপি।
স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, শুধু আইন প্রয়োগ করে এই সমস্যার সমাধান হবে না। ম্যানুয়াল ট্রাফিক ব্যবস্থার কারণে চালকেরা ধৈর্য হারিয়ে ফেলেন এবং ক্রমাগত হর্ন বাজান। তিনি আইন প্রয়োগে কঠোর হওয়ার পাশাপাশি স্কুল ও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে যুক্ত করে দেশব্যাপী সচেতনতামূলক প্রচারণার ওপর জোর দেন।
