একটা সময় শীর্ষ স্তরের ফুটবলে জায়গা পাওয়া যেখানে কঠিন হয়ে উঠেছিল, বাফুফের সাম্প্রতিক কিছু সিদ্ধান্তে সেই চিত্রটাই কিছুটা বদলেছে। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) সিদ্ধান্তে এবার প্রায় ১০০ ফুটবলার নতুন করে পেশাদার লিগে খেলার সুযোগ পেয়েছেন। ২০২৬-২৭ মৌসুমে বাংলাদেশ ফুটবল লিগে অংশ নেওয়া ক্লাবের সংখ্যাও গত মৌসুমের ১০ থেকে বেড়ে হয়েছে ১৩টি।
পেশাদার লিগের ভবিষ্যৎ নিয়ে যখন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল, তখনই ক্লাব বাড়ানোর এই সিদ্ধান্ত আসে। কয়েকটি ক্লাবের ওপর ফিফার নিবন্ধন নিষেধাজ্ঞা ছিল। এর মধ্যে সাম্প্রতিক মৌসুমগুলোতে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠিত ক্লাবও লিগ থেকে সরে দাঁড়িয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে শেষ পর্যন্ত গত মৌসুমের অবনমন স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেয় বাফুফে। পাশাপাশি বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়নশিপ লিগ থেকে আরও একটি ক্লাবকে শীর্ষ স্তরে তুলে আনা হয়। ফলে লিগের ক্লাব সংখ্যা আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা যেমন কেটেছে, তেমনি দেশের বিভিন্ন প্রান্তের স্থানীয় ফুটবলারদের জন্যও এবার বেড়েছে খেলার সুযোগ।
২০২৪ সালে শেখ জামাল ডিসি ও শেখ রাসেল কেসি শীর্ষ স্তরের ফুটবল থেকে সরে দাঁড়ানোর পর সমস্যাটা আরও প্রকট হয়ে ওঠে। দুই ক্লাবের বিদায়ে সাবেক বাংলাদেশ জাতীয় দলের খেলোয়াড় মতিন মিয়া, মাসুক মিয়া জনি ও বিপ্লু আহমেদসহ বেশ কয়েকজন ফুটবলার ক্লাবহীন হয়ে পড়েন।
এবারের সিদ্ধান্তে আরামবাগ ক্রীড়া সংঘ ও ফকিরেরপুল ইয়ংমেনস ক্লাবও শীর্ষ স্তরে ফিরে আসার সুযোগ পেয়েছে। শুরুতে তাদের দ্বিতীয় স্তরে খেলার কথা ছিল। কিন্তু সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের পর বৃহস্পতিবার দলবদলের শেষ সময়সীমার আগেই দুই ক্লাব নিজেদের দল গুছিয়ে নিয়েছে।
ফকিরেরপুলের সাধারণ সম্পাদক আহমেদ আলী দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘দুই দিন আগে আমরা ফিফার নিবন্ধন নিষেধাজ্ঞা থেকে মুক্তি পেয়েছি। তবে তার আগেই পুরোনো ও নতুন খেলোয়াড়দের নিয়ে আমরা দল গুছিয়ে ফেলেছিলাম। বৃহস্পতিবারের সময়সীমার মধ্যেই অনলাইন নিবন্ধনের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করতে পারব বলে আশা করছি।’
অবনমন স্থগিত রাখার সিদ্ধান্তকেও স্বাগত জানিয়েছেন তিনি। আহমেদ আলীর ভাষায়, ‘অবনমন স্থগিত রাখার সিদ্ধান্তটি অবশ্যই ভালো হয়েছে। কারণ এর ফলে এখন অনেক খেলোয়াড় পেশাদার লিগে নিজেদের প্রতিভা দেখানোর সুযোগ পাচ্ছেন।’
তবে আর্থিক সংকটের কারণে ফকিরেরপুলকে স্বল্প বাজেটেই দল গড়তে হয়েছে। ছোট ক্লাবগুলোকে কী ধরনের আর্থিক বাস্তবতার মধ্যে দিয়ে যেতে হচ্ছে, তাদের দল গড়ার চিত্রে সেটিও উঠে এসেছে।
আরামবাগের সহসভাপতি এজাজ আহমেদ জাহাঙ্গীর জানিয়েছেন, তাদের দলে এবার প্রায় ৫০ শতাংশ নতুন খেলোয়াড় যোগ হয়েছেন। নিচের বিভাগ থেকে ফুটবলার তুলে আনার যে নীতি ক্লাবটি দীর্ঘদিন ধরে অনুসরণ করছে, এবারও সেটি ধরে রেখেছেন তারা।
জাহাঙ্গীর বলেন, ‘সত্যি বলতে, স্বল্প বাজেটের ক্লাবগুলো নিজেদের কার্যক্রম চালিয়ে নিতে বেশ সংগ্রাম করছে। ফলে লিগের মানও ধীরে ধীরে নিচের দিকে নামছে। ফেডারেশন যদি ছয় মাসের মধ্যে লিগ শেষ করতে পারে, তাহলে দুই পক্ষেরই উপকার হবে।’
এবার সম্প্রসারিত লিগে যোগ দিয়েছে সদ্য উন্নীত চট্টগ্রাম সিটি এফসি ও ঢাকা সিটি এফসিও। দুই ক্লাবই প্রথমবারের মতো শীর্ষ স্তরে খেলতে যাচ্ছে। এরই মধ্যে তারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মতো দলও গড়ে তুলেছে।
লিগের পরিধি আরও বাড়ানো দরকার বলে মনে করেন চট্টগ্রাম সিটির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নাজিম উদ্দিন, ‘অংশগ্রহণকারী ক্লাবের সংখ্যা ১৫ থেকে ১৬টি হওয়া উচিত। তাহলে আরও বেশি স্থানীয় খেলোয়াড় শীর্ষ স্তরের লিগে খেলার সুযোগ পাবেন। কিন্তু এখন পরিস্থিতি উল্টো। খেলোয়াড়দেরই শীর্ষ স্তরে ওঠার পথ খুঁজে পেতে সংগ্রাম করতে হচ্ছে।’
নাজিমের হিসাব অনুযায়ী, তিনটি ক্লাব বাড়ায় প্রায় ৮০ জন খেলোয়াড়ের জন্য আর্থিক সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে সার্কভুক্ত দেশগুলোর খেলোয়াড়দের স্থানীয় খেলোয়াড় হিসেবে বিবেচনা না করা হলে এই সংখ্যা আরও বেশি হতে পারত বলেও মনে করেন তিনি।
বাংলাদেশের সাবেক মিডফিল্ডার জনি গত দুই মৌসুম ধরে শীর্ষ স্তরের ফুটবলের বাইরে। এবার পিডব্লিউডি স্পোর্টস ক্লাব থেকে প্রস্তাব পেলেও আর্থিক শর্ত পছন্দ না হওয়ায় সেটি গ্রহণ করেননি তিনি।
জনি বলেন, ‘পিডব্লিউডি আমাকে যে প্রস্তাব দিয়েছিল, তার চেয়ে নিজের এলাকায় খেলেই আমি বেশি আর্থিক সুবিধা পাচ্ছি। গত দুই মৌসুমে বাংলাদেশ ফুটবল লিগে খেলিনি, কারণ প্রস্তাবগুলো সন্তোষজনক ছিল না।’
তবে লিগের পরিধি বাড়ানোর ফলে তরুণ ও উদীয়মান ফুটবলারদের সামনে নিজেদের তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন জনি, ‘আমার মনে হয়, এখন তরুণ খেলোয়াড়দের শীর্ষ স্তরের লিগে নিজেদের প্রতিভা দেখানোর সময়। সিলেট অঞ্চল থেকে তরুণ খেলোয়াড়েরা নিয়মিত ঢাকায় আসছেন।’
প্রয়োজনের তাগিদ থেকেই মূলত এবারের লিগ সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। তবে এই সিদ্ধান্ত পেশাদার লিগকে আরও এক দফা সংকুচিত হওয়ার হাত থেকে বাঁচিয়েছে। পাশাপাশি কয়েক ডজন ফুটবলারকে দিয়েছে প্রতিযোগিতামূলক ফুটবলে টিকে থাকা এবং নিজেদের প্রমাণ করার নতুন সুযোগ।
