রাজশাহীর কাদিরগঞ্জ মোড়। এক পথচারী পানির বোতল খালি করে চারপাশটা দেখে নিলেন। তারপর কয়েক কদম এগিয়ে গিয়ে সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত ঝুড়িতে সেটা ফেলে দিলেন। দৃশ্যটা খুব সাধারণ মনে হলেও এমন ছোট ছোট অভ্যাসের কারণেই রাজশাহী আজ দেশের সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন শহর।
উপশহর এলাকার বাসিন্দা রুহুল আমিনের কাছে এই পরিচ্ছন্নতা এখন রোজকার জীবনেরই অংশ। তিনি বলেন, সিটি করপোরেশন প্রতিদিন নিয়ম করে বাসা থেকে ময়লা নেয়, রাস্তাও ঝাড়ু দেয়। আর সাধারণ মানুষও রাস্তায় ময়লা ফেলতে সংকোচ বোধ করে। ফলে শহর পরিষ্কার রাখতে সাধারণ মানুষেরও বড় ভূমিকা রয়েছে।
বাইরে থেকে রাজশাহীতে পা রাখলে চোখে প্রথমেই কোনো দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা বা পদ্মা নদী পড়ে না, বরং নজর কাড়ে পরিচ্ছন্ন ও সাজানো-গোছানো পরিবেশ। ঝকঝকে সড়ক, ফুটপাত ও রোড ডিভাইডারে ফুলের গাছ, আর রাতে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা। দেশের অন্য অনেক শহরের মতো মোড়ে মোড়ে উপচে পড়া ময়লার স্তূপ এখানে চোখে পড়ে না। বহু বছর ধরেই রাজশাহী ‘পরিচ্ছন্ন ও সবুজ শহর’ হিসেবে নিজের সুনাম ধরে রেখেছে।
তবে একটা শহরকে পরিচ্ছন্ন রাখা শুধু সিটি করপোরেশনের একার কাজ নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছেন নগরবাসীও। বাইরে থেকে যারা আসেন, তারাও ধীরে ধীরে এই চর্চার সঙ্গে মিশে যান। আর যখন পুরো শহর ঘুমিয়ে থাকে, তখন শত শত পরিচ্ছন্নতাকর্মী নীরবে কাজ করে যান।
নগরী পরিষ্কার থাকায় বাসিন্দাদের মানসিকতাতেও বড় পরিবর্তন এসেছে। তালাইমারীর সুমাইয়া বিনতে সামাদ বলেন, অন্য কোথাও প্লাস্টিকের প্যাকেট বা বোতল ফেলে দেওয়া স্বাভাবিক মনে হতে পারে, কিন্তু এখানে কেউ তা করে না। রাস্তা পরিষ্কার দেখলে সবার মনেই তা পরিষ্কার রাখার একটা দায়িত্ববোধ তৈরি হয়।
রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা শেখ মো. মামুন জানান, বাসিন্দাদের সক্রিয় সহযোগিতা ছাড়া কোনো পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমই দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না।
২০০৯ সালের জুলাইয়ে রাজশাহীতে চালু হয় নৈশকালীন বর্জ্য অপসারণ ও সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন (এসটিএস) ভিত্তিক আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা।
৩০টি ওয়ার্ডে দুপুরের দিকে বাসা থেকে বর্জ্য সংগ্রহ করে কাছের এসটিএসে রাখা হয়। রাত ৯টা থেকে শুরু হয় সড়ক ঝাড়ু দেওয়ার কাজ। আর রাত ১০টার পর এসটিএস থেকে ট্রাক ও ট্রেইলারে করে বর্জ্য নিয়ে যাওয়া হয় নির্ধারিত ভাগাড়ে। ভোরের আলো ফোটার আগেই ময়লা সরিয়ে আবার নতুন করে ঝাড়ু দেওয়া হয়। ড্রেন পরিষ্কারের সময় উঠানো কাদা সঙ্গে সঙ্গেই গাড়িতে তুলে নেওয়া হয়, রাস্তায় ফেলে রাখা হয় না।
এই পুরো ব্যবস্থার পেছনে কাজ করেন বিপুলসংখ্যক মানুষ। সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে সরাসরি যুক্ত আছেন ১ হাজার ২৫৩ জন কর্মী।
এছাড়া মশা নিয়ন্ত্রণে ১২৮ জন, গাছপালা ও পার্কের যত্নে ৮০ জন এবং সড়কবাতির দায়িত্বে আছেন ৭১ জন কর্মী। ৬৪ জন পরিদর্শক কেন্দ্রীয়ভাবে পুরো কাজটি তদারকি করেন।
৩০ নম্বর ওয়ার্ডের পরিচ্ছন্নতাকর্মী মুসলিম রেজা বলেন, কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে অন্য একজন তার দায়িত্ব পালন করেন। নতুন কেউ রাজশাহীতে এলে তিনিও ধীরে ধীরে এই সংস্কৃতির সঙ্গে মানিয়ে নেন। কেউ রাস্তায় ময়লা ফেললে আশপাশের মানুষ সাধারণত তাকে বাধা দেন।
ঢাকার বাসিন্দা শিশির দাস রাজশাহী সফরে এসে বলেন, ঢাকার তুলনায় রাজশাহী পরিষ্কার রাস্তা ও সুন্দর পরিবেশের কারণে আলাদা করে নজরে পড়ে।
সম্প্রতি চাকরির কারণে রাজশাহীতে আসা মো. জাবির হোসেনও শহরের পরিবেশে মুগ্ধ। তিনি বলেন, এখানে ধুলা ও দূষণ তুলনামূলক কম। রাস্তা পরিষ্কার। সুন্দর আলো আছে। শহরজুড়ে ফুল ও সবুজের ছড়াছড়ি। বেশ ভালো লাগে।
তবে রাজশাহী সবসময় এমন ছিল না, ধুলোময় ও অনেকটাই গাছপালাহীন ছিল। বছরের পর বছর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি রাস্তা, সড়কের মাঝের অংশ ও খোলা জায়গায় প্রচুর গাছ লাগানো হয়েছে। ফলে ধীরে ধীরে বদলেছে এই নগরীর চেহারা।
পরিবেশ ব্যবস্থাপনা ও বৃক্ষরোপণের জন্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়েও স্বীকৃতি পেয়েছে রাজশাহী। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও রেড ক্রিসেন্টের মতো প্রতিষ্ঠান থেকেও স্বীকৃতি পেয়েছে শহরটি।
মামুনের দাবি, ২০১৩-১৪ সালেও বাতাসে থাকা ধুলিকণা কমানোর ক্ষেত্রে বিশ্বের শীর্ষ শহরগুলোর মধ্যে ছিল রাজশাহী।
বর্তমান সিটি করপোরেশনও এই সাফল্য ধরে রাখতে চায়। সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. মাহফুজুর রহমান রিটন বলেন, আগামী এক বছরে ২ লাখ ৫০ হাজার গাছ লাগানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। এ কাজে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে যুক্ত করা হবে।
তিনি আরও বলেন, বর্জ্য সংগ্রহের ব্যবস্থাও আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে পলিথিনের ব্যবহার কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
ঈদুল আজহার সময় সিটি করপোরেশন বাসিন্দাদের মধ্যে কয়েক লাখ পরিবেশবান্ধব ও পচনশীল ব্যাগ বিতরণ করেছে। রিটন বলেন, ধীরে ধীরে রাজশাহীকে পলিথিনমুক্ত শহরে পরিণত করাই তাদের লক্ষ্য।
তবে শুধু আইন করে পলিথিন বন্ধ করা কঠিন। কারণ পরিবেশবান্ধব বিকল্প পণ্যের দাম বেশি। বাসিন্দাদের আর্থিক সহায়তা দেওয়া গেলে পলিথিনের বিকল্প ব্যবহারে তাদের উৎসাহিত করা সহজ হবে বলে জানান মাহফুজুর রহমান রিটন।
কিছু সীমাবদ্ধতাও আছে রাজশাহীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনায়। হাসপাতাল ও অন্যান্য চিকিৎসা বর্জ্য আলাদাভাবে সংগ্রহ করা হয়। সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধানে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এই বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করে।
তবে অন্যান্য বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ বা সার তৈরির মতো ব্যবস্থা এখনো শহরে নেই। এ জন্য সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের পরিকল্পনা করছে সিটি করপোরেশন।
এই প্রকল্পে বর্জ্যপানি, কঠিন বর্জ্য ও চিকিৎসা বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আলাদা ব্যবস্থা থাকবে। বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ ও গ্যাস উৎপাদন করা যায়, এমন আধুনিক একটি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কারখানা তৈরির বিষয়েও চিন্তা করা হচ্ছে বলে জানান প্রশাসক।
রাজশাহী দিন দিন বড় হচ্ছে। নতুন মানুষও শহরে আসছেন। তাই শহরের চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে পরিচ্ছন্নতার ব্যবস্থাও এগিয়ে নেওয়া এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
মামুন মনে করেন, ভবিষ্যতে শহর পরিচ্ছন্ন রাখার জন্যও তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—পরিকল্পনা, নিয়ম মেনে কাজ করা এবং মানুষের অংশগ্রহণ।
সিটি করপোরেশন ময়লার ঝুড়ি, ট্রাক, এসটিএস ও কর্মী দিতে পারে। পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা রাস্তা ঝাড়ু দিতে এবং ময়লা সরিয়ে নিতে পারেন। কিন্তু মানুষ যদি রাস্তায় ময়লা ফেলতেই থাকে, তাহলে কোনো ব্যবস্থাই দীর্ঘদিন শহরকে পরিষ্কার রাখতে পারবে না। রাজশাহীর গল্পের সবচেয়ে বড় পার্থক্য হয়তো এখানেই।
