লোডশেডিংয়ে বরিশাল জেনারেল হাসপাতাল ও শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ (শেবাচিম) হাসপাতালে রোগীদের ব্যাপক ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। বিদ্যুৎ না থাকায় ব্যাহত হচ্ছে চিকিৎসাসেবা, দুর্ভোগ বাড়ছে রোগী ও স্বজনদের।
আজ রোববার হাসপাতাল দুটিতে গিয়ে এমন চিত্র দেখা যায়।
দুপুর ১২টার দিকে বরিশাল জেনারেল হাসপাতালের ডায়রিয়া ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, বিদ্যুৎ নেই। প্রায় সব রোগীই হাতপাখা দিয়ে বাতাস করছেন। এ সময় বাইরে তাপমাত্রা ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকলেও ওয়ার্ডের ভেতরে গরম আরও বেশি অনুভূত হচ্ছিল।
মুকুল মিয়া (৪৬) নামে এক রোগী দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘সকাল ১১টায় একবার বিদ্যুৎ গেছে। এক ঘণ্টা পর এসেছে। প্রচণ্ড গরমের কারণে বাধ্য হয়ে হাতপাখা দিয়ে বাতাস করছি।’
‘এক-দুই ঘণ্টা পরপর বিদ্যুৎ আসে, আবার চলে যায়’
ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার লাকুটিয়ার বাসিন্দা আনোয়ার হোসেন (৪০)।
তিনি বলেন, ‘এখানে এক-দুই ঘণ্টা পরপর বিদ্যুৎ আসে, আবার চলে যায়।’
ওয়ার্ডের ইনচার্জ সেবিকা টুম্পা রানী ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘রাতে বিদ্যুৎ চলে গেলে মোবাইলের আলো জ্বালিয়ে রোগীদের চিকিৎসা দিতে হয়।’
‘গত দেড় মাস ধরে এমন পরিস্থিতি চলছে। বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি, কিন্তু এখনো কোনো সুরাহা হয়নি। আজ এখন পর্যন্ত ২৮ জন ডায়রিয়া রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। কখনো কখনো রোগীর সংখ্যা ৮০ জন পর্যন্ত হয়। আমরা একটি আইপিএসের জন্য চাহিদাপত্র পাঠিয়েছি, কিন্তু এখনো কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি’, বলেন তিনি।
হাসপাতালের চত্বরে কথা হয় বাকেরগঞ্জের ফারুক হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘ডেঙ্গুতে আক্রান্ত এক আত্মীয়কে নিয়ে হাসপাতালে এসেছি। কিন্তু প্রচণ্ড গরমে টিকতে না পেরে রোগীকে বাসায় নিয়ে যাচ্ছি। রোগীকে স্যালাইন দেওয়ার জন্য চিকিৎসক লিখে দিয়েছেন। তবে নিজেদের উদ্যোগেই স্যালাইন দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।’
নষ্ট জেনারেটর
হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. মলয় কৃষ্ণ বড়াল ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘বর্তমানে আবাসিকে ৪৫০ ও বহির্বিভাগে ৭৫০ রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন।’
তিনি বলেন, ‘হাসপাতালে বিদ্যুতের একটি মাত্র লাইন থাকায় অপারেশনের সময় বিদ্যুৎ চলে গেলে আমরা অসহায় হয়ে পড়ি। এখানে জেনারেটর থাকলেও সেটি করোনার পর থেকেই নষ্ট হয়ে আছে। আমরা ডাবল লাইন দেওয়ার জন্য আবেদন করেছি। কারণ, জেনারেটর দেওয়া হলেও তেলের সমস্যার কারণে সেটি সচল রাখা সম্ভব হবে না।’
‘হাসপাতালে আলাদা কোনো বাজেট না থাকায় নিজস্ব বাজেট থেকে জেনারেটরের তেলের ব্যবস্থা করা সম্ভব হয় না। এছাড়া পিডব্লিউডিও তেল দিতে পারে না। ডাবল লাইনের জন্য আমরা প্রতি মাসেই আবেদন করছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত এর কোনো সুরাহা হয়নি’, বলেন মলয় কৃষ্ণ।
শেবাচিম হাসপাতালেও একই চিত্র
শেবাচিম হাসপাতালের দোতলার শিশু ওয়ার্ডের করিডোর, সিঁড়ি ও বারান্দা রোগীতে পরিপূর্ণ। কোথাও হাঁটা-চলারও জায়গা নেই।
ঝালকাঠির নলছিটি থেকে তিন বছর বয়সী শিশুকে শ্বাসকষ্টের চিকিৎসার জন্য তিন দিন আগে হাসপাতালে ভর্তি করেন বাবা মসজিদের ইমাম মাহাবুল আলম। বেড না পেয়ে সিসিইউ ইউনিটের সিঁড়িতেই ঠাঁই হয়েছে শিশুটির।
মাহাবুল আলম বলেন, ‘প্রচণ্ড গরমে বেড না পাওয়ায় সিঁড়িতে এসে আশ্রয় নিতে হয়েছে।’
শিশু ওয়ার্ডের সামনে দিয়ে অন্য ওয়ার্ডে যাওয়ার সময় দেখা যায়, শত শত শিশুর স্বজন বারান্দায় আশ্রয় নিয়েছেন। তারা জানান, শিশু ওয়ার্ডে একটি বেড পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। সাত দিন অপেক্ষা করেও অনেকে বেড পান না। কেউ কেউ স্ট্যান্ড ফ্যান আনলেও বারবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় শেষ পর্যন্ত তালপাতার পাখাই ভরসা।
করোনারি কেয়ার ইউনিটে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে ২২ জন রোগী ভর্তি রয়েছেন।
চিকিৎসার দায়িত্বে থাকা ডা. আফজাল ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘এখানে একটি জেনারেটর থাকলেও সেটি দিয়ে এসি ও বড় মেশিন চালানো সম্ভব নয়।’
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, এই হাসপাতালে আবাসিক ও বহির্বিভাগ মিলিয়ে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক রোগী চিকিৎসা নেন। আবাসিকে প্রায় ২ হাজার রোগী থাকেন, আর বহির্বিভাগে এর অন্তত তিন গুণ রোগী চিকিৎসা নেন। রোগীর স্বজনসহ প্রতিদিন ১০ হাজারের বেশি মানুষ হাসপাতালে আসেন।
তবে এই বিপুলসংখ্যক মানুষকে সেবা দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত জনবল, সরঞ্জাম, জায়গা ও বিদ্যুৎ, কোনোটিই হাসপাতালে নেই। ইতোমধ্যে মেডিসিন বিভাগের নতুন ভবনের জন্য আরও একটি বিদ্যুৎ সংযোগ এবং জেনারেটর চালানোর জন্য পর্যাপ্ত জ্বালানি বরাদ্দ চেয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
জানতে চাইলে গণপূর্ত বিভাগের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. রাকিব হোসেন ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘শেবাচিম হাসপাতালে এক মেগাওয়াট বিদ্যুৎ প্রয়োজন। বিদ্যুৎ বিভ্রাট হলে হাসপাতালের তিনটি জেনারেটর রয়েছে। এর মধ্যে দুটি ২৫০ কিলোওয়াটের ও একটি ১৭৫ কিলোওয়াটের। বিদ্যুৎ চলে গেলে দুটি জেনারেটর চালু করা হয়। আর একটি অপেক্ষমাণ থাকে।’
‘এর জন্য প্রতিদিন অন্তত ১৫০ লিটার তেল লাগে। তেলের জন্য আমাদের আলাদা কোনো বরাদ্দ নেই। অন্যান্য পরিচালন ব্যয় কমিয়ে তেলের সংস্থান করা হয়। তবে সমস্যা হলো, নতুন ভবন, মেডিসিন, আইসিইউসহ অন্যান্য জায়গায় এসব জেনারেটরের সেবা নেই। তেল বরাদ্দের জন্য কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত আবেদন করলেও বিষয়টি স্থানীয়ভাবে সমাধানের জন্য বলা হয়’, বলেন তিনি।
হাসপাতালের কর্মচারীরা জানান, গত দুই মাস ধরে ঘনঘন বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় হাসপাতাল অন্ধকার হয়ে পড়ছে। জেনারেটরের তেল বরাদ্দের দায়িত্ব কর্তৃপক্ষ না নেওয়ায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এত বড় হাসপাতালে আরও জেনারেটরের পাশাপাশি পর্যাপ্ত তেলের বরাদ্দও প্রয়োজন।
তারা আরও জানান, চার দিন আগে হঠাৎ পুরো হাসপাতাল অন্ধকার হয়ে গেলে রোগীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সেসময় অনেকেই বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুলে ধরেন।
‘হাসপাতালের অবস্থা দেখে আমাকেও লজ্জায় পড়তে হয়’
শেবাচিম হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. মসিউল মুনির ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘বিদ্যুৎ চলে গেলে আমাদের নানা অসুবিধায় পড়তে হয়। অপারেশন থিয়েটারেও সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। তাছাড়া পিডব্লিউডি সব সময় জেনারেটরের তেল সরবরাহ করতে পারে না।হাসপাতালের অবস্থা দেখে আমাকেও লজ্জায় পড়তে হয়। হাসপাতালে যত লোক আছে, স্টেডিয়ামেও এত লোক নেই। এত সমস্যা কীভাবে সমাধান করা যায়?’
তিনি বলেন, ‘এখন বিদ্যুৎ সমস্যা তীব্র হওয়ায় এর প্রভাব যে রোগীদের ওপর পড়ছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু তেলের বরাদ্দ নেই, প্রয়োজনীয় জেনারেটর নেই, আইপিএসও নেই। কোনটির কথা বলব?
ইতোমধ্যে সিএমএসডিতে আমি অনেকগুলো চাহিদাপত্র পাঠিয়েছি। কিন্তু গত জুনে সামান্য সংখ্যক সরঞ্জাম পেয়েছি।’
জানতে চাইলে পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের (পিজিসিবি) বরিশাল বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আখতারুজ্জামান পলাশ ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘বরিশালে এই মুহূর্তে সর্বোচ্চ বিদ্যুতের চাহিদা ১৯২ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে সর্বোচ্চ ১৮০ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। তবে গত এক সপ্তাহে সর্বোচ্চ ১২৫ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ পাওয়া যায়নি। ফলে বিদ্যুতের ঘাটতি ৩০ শতাংশ পর্যন্ত দাঁড়িয়েছে। এরই প্রভাব পড়েছে সর্বত্র।’
বরিশাল সচেতন নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক টুনু রানী কর্মকার ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘বিদ্যুৎ ছাড়া কোনো হাসপাতাল চলতে পারে না। বিদ্যুৎ চলে গেলে বিকল্প হিসেবে অবশ্যই জেনারেটরের ব্যবস্থা থাকতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘বরিশাল জেনারেল হাসপাতালের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে কোনো জেনারেটর থাকবে না, আর একটি মাত্র বিদ্যুৎ লাইনের ওপর ভরসা করে হাজার হাজার রোগীকে সেবা দেওয়া হবে—এটি ভাবাই যায় না। এর ফলে যেকোনো সময় বড় ধরনের বিপর্যয় বা গুরুতর পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। এই সংকটের অবসান ঘটাতে এখনই জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।’
