১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে বিরোধিতা নিয়ে ক্ষমা চাওয়ার একাধিক উদ্যোগ আটকে গেছে জামায়াতের ভেতরেই

জামায়াতে ইসলামীর একাংশের নেতারা বারবার চেষ্টা করেছেন যেন দলটি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ও নিঃশর্ত ক্ষমা চায়।

বছরের পর বছর ধরে এ নিয়ে বেশ কয়েকটি খসড়া প্রস্তুত করা হলেও দলীয় প্রভাবশালীরা বারবার এ উদ্যোগ আটকে দিয়েছেন। ফলে, এটি কখনোই বাস্তবে রূপ নেয়নি।

আইনজীবী আব্দুর রাজ্জাকের মৃত্যুর পর প্রকাশিত তার লেখা ‘বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী: ইটস হিস্ট্রি অ্যান্ড পলিটিকস’ বইয়ে এই বিষয়ে দলটির শীর্ষ পর্যায়ের অভ্যন্তরীণ বিরোধের কথা তুলে ধরেছেন। আগামীকাল শুক্রবার বইটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হবে।

আব্দুর রাজ্জাক ২০০৩ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এরপর তিনি দলটি ছেড়ে দেন।

বইয়ে তিনি জামায়াতের পক্ষ থেকে ক্ষমা চাওয়ার উদ্যোগের পটভূমি, এর পক্ষে ও বিপক্ষে যুক্তি এবং দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে তৈরি করা খসড়াগুলোর বিস্তারিত তুলে ধরেছেন।

১৯৯৪ সালে সুপ্রিম কোর্টের এক রায়ের মাধ্যমে তৎকালীন জামায়াত আমির গোলাম আযম বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ফিরে পান। এরপর একটি জনসমাবেশে তিনি ভাষণ দেওয়ার আগে প্রথমবারের মতো দলের পক্ষ থেকে ক্ষমা চাওয়ার বিষয়টি সামনে আসে। ২০০১ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে ক্ষমা চাওয়ার বিষয়ে আরও কয়েকটি উদ্যোগ নেওয়া হয়।

বিষয়টি সমাধানে একাধিক উদ্যোগের সারসংক্ষেপ করতে গিয়ে আব্দুর রাজ্জাক লিখেছেন, ‘প্রতিবারই উদ্যোগ নেওয়ার সময় জামায়াতের কাঠামোর ভেতরের কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি হস্তক্ষেপ করে দলকে পিছিয়ে দেন। শেষ পর্যন্ত নতুন আমিরও বিষয়টি নিয়ে কথা বলেননি। অতীতের মতো বিষয়টি আবারও হিমঘরে পাঠানো হয়।’

১৯৯৪ সালের উদ্যোগের কথা স্মরণ করে আব্দুর রাজ্জাক লিখেছেন, গোলাম আযমের সেই ভাষণ প্রস্তুতে সহায়তার জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। সেই কমিটি তাকে ১৯৭১ সালে জামায়াতের ভূমিকার বিষয়টি ভাষণে তুলে ধরার পরামর্শ দিয়েছিল।

আব্দুর রাজ্জাক লিখেছেন, ‘ক্ষমতার সুদৃঢ় অবস্থান থেকে ক্ষমা চাওয়া হলে সেটাকে আন্তরিক বলে মনে করা হতো এবং ১৯৭১ সালে জামায়াতের ভূমিকা নিয়ে কঠোর ও প্রায়শই অযৌক্তিক সমালোচনার অবসান ঘটাতে পারত। অধ্যাপক আযম নীতিগতভাবে আমাদের প্রস্তাবনার সঙ্গে একমত পোষণ করেছিলেন।’

তবে সেই সমাবেশে গোলাম আযম কেবল একটি বাক্যে জামায়াতের ভূমিকার প্রতি পরোক্ষ ইঙ্গিত করে বলেন, ‘যারা আমার কোনো কাজকে ভুল মনে করেছেন, আমার কোনো কাজে অসন্তুষ্ট হয়েছেন, আমার কোনো কাজে ব্যথিত হয়েছেন, দুঃখ পেয়েছেন, আমি তাদের সবার কাছে জানাচ্ছি, আপনাদের এই বেদনার সাথে আমি শরিক, আমিও দুঃখিত।’

আব্দুর রাজ্জাক লিখেছেন, ‘গণমাধ্যম মূলত এই বক্তব্য উপেক্ষা করেছিল। সেটাকে বড়জোর দায়সারা ক্ষমা প্রার্থনা বলা যেতে পারে।’

২০০১ সালের অক্টোবরের নির্বাচনে চারদলীয় জোটের বিজয়ের পর ক্ষমা চাওয়ার বিষয়টি আবার সামনে আসে। আব্দুর রাজ্জাক এটিকে ক্ষমতার সুদৃঢ় অবস্থানে থেকে ১৯৭১ সালের প্রশ্নটি মোকাবিলার আরেকটি ঐতিহাসিক সুযোগ হিসেবে দেখেছিলেন।

ওই বছর ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসের আগেই এ বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়ার জন্য তিনি জামায়াতের ভেতরে তদবির শুরু করেন। এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনজন অধ্যাপকের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং তারা একটি বিবৃতির খসড়া তৈরিতে সহায়তা করতে সম্মত হন।

খসড়া প্রস্তুত হওয়ার পর আব্দুর রাজ্জাক সবচেয়ে কঠিন কাজটিতে হাত দেন। আর তা হলো—জামায়াত নেতৃত্বের অনুমোদন পাওয়া।

প্রাথমিক বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন তৎকালীন আমির মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী। সেখানে দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের মধ্যে আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ, মুহাম্মদ কামারুজ্জামান, আবদুল কাদের মোল্লা ও এটিএম আজহারুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন। পরে আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদের নেতৃত্বে একটি উপকমিটি গঠন করা হয়, যার কাজ ছিল খসড়াটি চূড়ান্ত করা।

বর্তমানে তাদের মধ্যে কেবল এটিএম আজহারুল ইসলাম জীবিত আছেন।

সেই বিবৃতি চূড়ান্ত করতে উপকমিটি অন্তত ছয়বার বৈঠক করে এবং বিজয় দিবসের আগে একটি সংবাদ সম্মেলন করার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেয়।

আব্দুর রাজ্জাকের ভাষ্য, আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ, মুহাম্মদ কামারুজ্জামান ও আবদুল কাদের মোল্লা বিষয়টির নিষ্পত্তি করে চিরতরে এই অধ্যায়ের সমাপ্তি টানতে চেয়েছিলেন। কিন্তু, ২০১০ সালের জুনে দলের আমির ও সেক্রেটারি জেনারেল গ্রেপ্তার হওয়ার পর সেক্রেটারি জেনারেলের দায়িত্ব পাওয়া এটিএম আজহারুল ইসলাম ক্ষমা চাওয়ার বিষয়ে ‘আপত্তি’ তোলেন।

এ বিষয়ে জানতে বারবার কল ও খুদে বার্তা পাঠানো হলেও কোনো জবাব দেননি এটিএম আজহারুল ইসলাম।

বইয়ে লেখা হয়েছে, ‘প্রতিটি শব্দ অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে বেছে নিতে হয়েছিল এবং প্রতিটি বাক্য অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে তৈরি করতে হয়েছিল। আমরা ঠিক কতগুলো খসড়া করেছিলাম, এখন আর তা মনে করতে পারি না। কিন্তু, সাতটির বেশি ছিল। শেষ পর্যন্ত সেগুলোর মধ্যে একটি সর্বসম্মত বিবৃতি হিসেবে চূড়ান্ত করা হয়।’

‘আমরা যখন খসড়াটি সম্পন্ন করলাম, মুজাহিদ সাহেব আমাকে জানালেন, তার মনে হয়েছে দলের একজন প্রবীণের পরামর্শে মাওলানা নিজামী হয়তো ক্ষমা চাওয়ার বিষয়ে নিজের মত পরিবর্তন করেছেন। মুজাহিদ সাহেব ওই প্রবীণের নাম প্রকাশ করেননি, আমিও বিস্তারিত জানতে চাইনি।’

২০০২ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসের আগে দলটি এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেবে, এই আশায় আব্দুর রাজ্জাক তার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখেন। কিন্তু সেটিও আর হয়নি। নিজামী মত পরিবর্তনের কোনো কারণ জানাননি। বরং তিনি বলেন, বিষয়টি জামায়াতের ৩৫-৪০ সদস্যের ওয়ার্কিং কমিটির সামনে উপস্থাপন করা হবে।

আব্দুর রাজ্জাক লিখেছেন, ‘এখন বিষয়টিকে জামায়াতের আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে।’

ক্ষমা প্রার্থনার খসড়া হওয়ার চার বছর পর অবশেষে ২০০৫ সালের অক্টোবরে বিষয়টি ওয়ার্কিং কমিটির সামনে উপস্থাপন করা হয়। সূচনা বক্তব্যে আব্দুর রাজ্জাক যুক্তি দেন, বিশ্বের ইতিহাসে কোনো দেশের স্বাধীনতার বিরোধিতাকারী কোনো দল নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছে, এমন নজির নেই। কণ্ঠভোটে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় তার সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হয়।

ওই বৈঠক এবং পরবর্তী বৈঠকগুলোতে আব্দুর রাজ্জাক বারবার একটি মৌলিক প্রশ্ন তোলেন। সেটি হলো, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের পর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে সমর্থন করা জামায়াতের রাজনৈতিক ও নৈতিকভাবে সঠিক ছিল কি না। ২০০৫ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে এমন অনেক বৈঠক হয়। এই সময়কালে দলটির শীর্ষ নেতারা গ্রেপ্তার হন।

আব্দুর রাজ্জাক লিখেছেন, ক্ষমা চাওয়ার বিষয়ে সেই বিরোধিতা এতটাই প্রবল ছিল যে, যারা এ বিষয়ে আলোচনা ও ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষে ছিলেন, তাদের ভয় দেখিয়ে নীরব করে দেওয়া হয় এবং তারা নতিস্বীকার করেন।

ক্ষমা চাওয়ার বিরোধিতায় বিভিন্ন ধরনের যুক্তি দেওয়া হয়। কেউ কেউ বলেন, ‘জামায়াত মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ পাকিস্তানের অখণ্ডতার পক্ষে ছিল, এতে কোনো ভুল ছিল না।’

অন্যরা বলেন, ‘আমরা ভারতের আধিপত্য নিয়ে শঙ্কিত ছিলাম এবং ইতিহাস প্রমাণ করে যে আমাদের কর্মকাণ্ড ন্যায্য ছিল।’

আরেকটি যুক্তি ছিল, ‘আমরা ক্ষমা চাইলেও আওয়ামী লীগ ও তাদের মিত্ররা তা গ্রহণ করবে না।’

ওয়ার্কিং কমিটির জ্যেষ্ঠ দুই সদস্যের মতামত আব্দুর রাজ্জাককে বিশেষভাবে বিচলিত করেছিল। সাবেক এক সংসদ সদস্য বলেছিলেন, ‘আমরা ক্ষমা চাইলে পাকিস্তান আমাদের ওপর অসন্তুষ্ট হবে।’

জামায়াতের শিক্ষা বিভাগের তৎকালীন প্রধান বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশের রাজনীতিতে এটি কোনো বিষয়ই না। বছরে দুবার, মার্চ (স্বাধীনতা দিবস) ও ডিসেম্বরে (বিজয় দিবস) বিষয়টি আলোচনায় আসে এবং কিছুদিন পর আবার হারিয়ে যায়। ওয়ার্কিং কমিটিতে এই বিষয়টি আলোচনা করা কমিটির (মূল্যবান) সময়ের অপচয় হবে।’

আব্দুর রাজ্জাক লিখেছেন, ‘১৯৭১ সালের কর্মকাণ্ডের জন্য জামায়াত ক্ষমা চাইলে পাকিস্তান অসন্তুষ্ট হবে—ওয়ার্কিং কমিটির ওই সদস্যের এমন দাবি সঠিক ছিল কি না, সেটা নিয়ে আমি সবসময়ই ভেবেছি। পরবর্তী ঘটনাবলি আমাকে নিশ্চিত করেছে যে তার মূল্যায়ন মোটেই সঠিক ছিল না।’

২০০৫ সালের অক্টোবর থেকে ২০১০ সালের জুন পর্যন্ত যখন মতিউর রহমান নিজামী ও জামায়াতের অন্যান্য নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়, ওয়ার্কিং কমিটি ও নির্বাহী কমিটির বৈঠকে বহুবার ১৯৭১ সালে দলটির ভূমিকা নিয়ে আলোচনা হয়। কিন্তু, বরাবরের মতো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

১৯৭১ সালের বিষয়টি নিয়ে জামায়াতের ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যর্থতা ২০০৮ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনের আগে বারবার দলটির নেতৃত্বকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলেছিল। আওয়ামী লীগের বিপুল বিজয়ের পর ১৯৭১ সালে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধের জন্য জামায়াত নেতাদের বিচার প্রায় নিশ্চিত হয়ে যায় বলে আব্দুর রাজ্জাক লিখেছেন।

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের আগে মজলিসে শুরার সর্বশেষ উন্মুক্ত অধিবেশনে (২০১১ সালে) আব্দুর রাজ্জাক আবারও ১৯৭১ সালের বিষয়টি নিয়ে উদ্যোগ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন। তিনি বিশেষভাবে তরুণ সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানান, তারা যেন বিষয়টি এগিয়ে নিয়ে যায়।

বইয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল এটিএম আজহারুল বলেন, ‘১৯৭১ সালের বিষয়টি নিয়ে কোনো উদ্যোগ না নিয়েও যদি আমরা আমাদের দুই নেতার গাড়িতে জাতীয় পতাকা উড়াতে পারি, তাহলে এটি নিয়ে আর উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ কী?’

‘আমার দৃষ্টিতে, অত্যন্ত গুরুতর ও গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় নিয়ে এটি যথাযথ পন্থা ছিল না,’ আব্দুর রাজ্জাক লিখেছেন।

২০১৬ সালের মাঝামাঝি একের পর এক ফাঁসি কার্যকরের পর জামায়াতে নেতৃত্বের শূন্যতা তৈরি হয়। ওই বছরের নভেম্বরে নতুন আমির নির্বাচিত হন। নির্বাচিত হওয়ার পরপরই জামায়াত আমির আবারও ১৯৭১ সালের বিষয়টি নিয়ে উদ্যোগ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। একটি কমিটি গঠন করা হয় এবং আব্দুর রাজ্জাকের সঙ্গে যোগাযোগ করে দলের সেক্রেটারি জেনারেল একটি বিবৃতির খসড়া তৈরি করতে বলেন।

২০১৬ সালের ২১ নভেম্বর আব্দুর রাজ্জাক আমিরকে একটি ব্যক্তিগত চিঠি লেখেন এবং কমিটির সদস্যদের কাছে এর অনুলিপি পাঠান। চিঠিতে তিনি ১৯৭১ সালের বিষয়টি নিয়ে উদ্যোগ নেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রশংসা করেন। এর সঙ্গে তিনি ক্ষমা প্রার্থনার একটি খসড়া বিবৃতি সংযুক্ত করেন।

১৯৭১ সাল সম্পর্কে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের বিবৃতির সেই খসড়ার লেখা হয়েছিল—

‘১. ১৯৭১ সালে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিলো, এই জন্য আজ আমরা দুঃখ প্রকাশ করছি এবং বাংলাদেশের জনগণের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি।

২. জামায়াত তখন সামরিক হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করেনি এই জন্য আমরা দুঃখিত।

৩. ১৯৭১ সালে নিরীহ জনগণের উপর সামরিক জান্তার অত্যাচার অবিচারের ফলে দেশবাসী ভাই-বোনদের যে সীমাহীন দুঃখ, দুর্দশা পোহাতে হয়েছে আমরা তার প্রতিবাদ করতে পারিনি। এইজন্য আমরা নির্যাতিতদের ও তাঁদের পিতা-মাতা, ভাই-বোন, স্বামী-স্ত্রী এবং অন্যান্য নিকটাত্মীয়দের কাছে আজ গভীর দুঃখ প্রকাশ করছি।

৪. আজকের পূর্বে আমরা জাতির কাছে এই ক্ষমা প্রার্থনা করতে পারিনি এই জন্য আমরা দুঃখিত।

৫. জামায়াতে ইসলামী মনেপ্রাণে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে গ্রহণ করেছে। জামায়াত স্বাধীনতার পর থেকে প্রত্যক্ষ, পরোক্ষ, প্রকাশ্য বা গোপনে এমন কোন কাজ করেনি যা রাষ্ট্রের স্বাধীনতা, সংহতি ও কল্যাণের পরিপন্থী। তাই আজকের দিনে আমরা বাংলাদেশের জনগণের কাছে এই আহ্বান জানাচ্ছি: যে আন্তরিকতা নিয়ে আমরা জাতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি জাতি যেন ঠিক সেইভাবে তা গ্রহণ করে। আমরা আশা করি এই শুভ প্রচেষ্টার মাধ্যমে আমাদের জাতীয় জীবনের এই ক্ষত নিরাময় হবে এবং একটি ঐক্যবদ্ধ জাতি হিসাবে আমরা ভবিষ্যতে উন্নতির দিকে অগ্রসর হতে পারব।

৬. এই পর্যায়ে যাতে কোন ভুল বুঝাবুঝির অবকাশ না থাকে সেই জন্য আমরা আবারও বলতে চাই যে, জামায়াতের কোন নেতা-কর্মী বা সমর্থক যুদ্ধাপরাধ অথবা মানবতা বিরোধী অপরাধের সাথে কখনও জড়িত ছিলনা।’

২০১৮ সালের ডিসেম্বরের জাতীয় নির্বাচনের পর আব্দুর রাজ্জাক জানতে পারেন, যুদ্ধাপরাধের বিষয়ে জামায়াতকে পরামর্শ দেওয়া আইনজীবীরা ইতোমধ্যেই দলটিকে রাজনীতি থেকে সরে যাওয়ার সুপারিশ করেছে।

এদিকে খবর প্রকাশিত হয় যে, সরকার যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করার বিষয়টি বিবেচনা করছে। আসন্ন এই সংকটের মুখে জামায়াত তার অবস্থান পুনর্মূল্যায়ন করতে বাধ্য হয়।

দলের নির্বাহী কমিটি জরুরি বৈঠকে বসে। সেখানে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত হয়, দলটি নিম্নলিখিত ব্যবস্থা নেবে:

১. ১৯৭১ সালের বিষয়টি মোকাবিলা করবে

২. দল বিলুপ্ত করবে এবং

৩. নতুন দল গঠন করবে।

আব্দুর রাজ্জাক লিখেছেন, ‘সেক্রেটারি জেনারেল আমাকে ক্ষমা প্রার্থনার একটি খসড়া এবং দল বিলুপ্তির একটি প্রস্তাব তৈরির দায়িত্ব দেন। যেহেতু ক্ষমা প্রার্থনার একটি খসড়া বিবৃতি ইতোমধ্যেই প্রস্তুত ছিল, তাই আমি আমার আইনজীবী দলের সহায়তায় দ্রুত দল বিলুপ্তির প্রস্তাবের খসড়া তৈরি করি।’

শুরা সদস্যরা ছোট ছোট দলে বৈঠক করেন, যার মাধ্যমে মোট ৩০০ সদস্যের প্রায় ৮০ শতাংশের মতামত নেওয়া হয়। বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য দল বিলুপ্তির পক্ষে মত দেন এবং এক-তৃতীয়াংশ সদস্য মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকার জন্য ক্ষমা প্রার্থনার পক্ষে ছিলেন।

কিন্তু, পরবর্তীতে দল নিষিদ্ধ না করায় জামায়াতের নির্বাহী কমিটি বৈঠকে বসে সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থান নেয়—কোনো ক্ষমা প্রার্থনা নয়, দল বিলুপ্তিও নয়।

আব্দুর রাজ্জাক লিখেছেন, ‘নির্বাহী কমিটি ক্ষমা না চাওয়া এবং দল বিলুপ্ত না করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমি পদত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নিই।’

তিনি লিখেছেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ তৈরি করেছিল।

তিনি বলেন, সম্প্রতি জামায়াত আমির শফিকুর রহমান শান্ত, আত্মবিশ্বাসী ও মর্যাদাপূর্ণভাবে গণমাধ্যমের সাক্ষাৎকারগুলো সামলেছেন। কিন্তু অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় আগে দলটির পূর্বসূরিদের কর্মকাণ্ড নিয়ে বর্তমান জামায়াতের সুস্পষ্ট কোনো নীতি না থাকায় তার উত্তরগুলো স্বাভাবিকভাবেই বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়নি।

২০২৫ সালের মে মাসে মারা যান আব্দুর রাজ্জাক। এর আগে বইটিতে তিনি লিখেছেন, ‘১৯৭১ সালে জামায়াতের ভূমিকা এখনো তাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা।’

Related Articles

Latest Posts