ঢাকার সিনেমা জগতের সাড়া জাগানো নায়িকা সুচন্দা। একই পরিবারের তিন বোনের নায়িকা হওয়ার অনন্য রেকর্ডের অংশ তিনি।
আজ থেকে ছয় দশক আগে ‘কাগজের নৌকা’ সিনেমার মধ্য দিয়ে বড় পর্দায় তার অভিষেক হয়। সিনেমাটি পরিচালনা করেন সুভাষ দও।
এরপর এক এক করে অসংখ্য চলচ্চিত্র করেছেন। খ্যাতি, পুরস্কার, দর্শকদের ভালোবাসা—সবই পেয়েছেন। জাতীয় চলচ্চিত্রে আজীবন সম্মাননা পেয়েছেন তিনি।
অভিনয় ক্যারিয়ারে অনেক নায়কের বিপরীতে তিনি অভিনয় করেছেন। রাজ্জাক ও সুচন্দা জুটি হয়ে অনেক সিনেমা করে সাড়া জাগিয়েছেন। সেইসব সিনেমার গান আজও মানুষের মুখে মুখে শোনা যায়।
সিনেমার নাম ‘মনের মতো বউ’। এতে অভিনয় করেন সুচন্দা ও রাজ্জাক। সুচন্দার মায়ের চরিত্রে অভিনয় করেন রওশন জামিল। সুচন্দাকে গান শেখাতে আসেন রাজ্জাক। সেখান থেকেই দুইজনের ভালোবাসার সম্পর্ক। কিন্তু নাটকীয়ভাবে রাজ্জাক স্টুডিওতে গিয়ে তার বাবার কাছে ছবি পাঠায়। মা এই বিয়েতে রাজি নন। মা বিয়ে দেবেন বোনের ছেলের সঙ্গে।
‘মনের মতো বউ’ সিনেমার একটি গান—‘আহা কী যে সুন্দর’। অত্যন্ত প্রশংসিত একটি গান।
‘চন্দ্রনাথ’ সিনেমাটি চাষী নজরুল ইসলাম পরিচালিত। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাস অবলম্বনে এই সিনেমা। রাজ্জাক এই সিনেমায় মা ডাকেন সুচন্দাকে। সুচন্দার মেয়ের চরিত্রে অভিনয় করেন দোয়েল।
এই সিনেমার মাধ্যমে প্রথমবার সুচন্দা ও রাজ্জাককে সিনেমায় জুটি না বেঁধে ভিন্ন ভূমিকায় অভিনয় করতে দেখা যায়। দর্শকরা বেশ ভালোভাবেই নিয়েছিলেন বিষয়টি।
সিনেমার নাম ‘নয়নতারা’। এই সিনেমায় সুচন্দার নায়ক ছিলেন আজিম। আজিম বড়লোকের পুত্র আর সুচন্দা গরিব স্কুলশিক্ষকের কন্যা।
সিনেমার একটি দৃশ্য এরকম—আজিম যখন সুচন্দার ঘরের সামনে যান, তখন সুচন্দা বলেন, ‘আমার কাপড় নেই, আমি কী করে বের হবো।’ এরপর গল্প নানারকম নাটকীয়তায় মোড় নেয়। সুচন্দার সঙ্গে আজিমের প্রেম হয়। কিন্তু আজিমের পরিবার তা মেনে নিতে পারে না। শেষ পর্যন্ত অনেক ঘটনার পর সিনেমার শেষ অংশে তাদের ভালোবাসার সম্পর্ক পরিপূর্ণতা পায়।
‘নয়নতারা’ সিনেমায় সুচন্দা অসাধারণ অভিনয় করে দর্শকদের ভালোবাসা পেয়েছেন।
‘চোখ যে মনের কথা বলে’—এই গানটি সুচন্দা ও রাজ্জাক অভিনীত ‘যে আগুনে পুড়ি’ সিনেমার একটি গান। তুমুল জনপ্রিয় এই গানের আবেদন এখনো ফুরিয়ে যায়নি।
সুচন্দার দীর্ঘ ক্যারিয়ারের বেশিরভাগ সিনেমাই হিট হয়েছে।
‘সংসার’ নামের একটি সিনেমায় জুটি বেঁধেছেন রাজ্জাকের সঙ্গে। ‘সংসার’ সিনেমায় প্রথম দৃশ্যে দেখা যায়, প্রবল ঝড়ের রাতে শিশু সন্তান কোলে নিয়ে সুচন্দা আশ্রয় খুঁজছেন। একটি বাসায় গিয়ে সুচন্দা বলেন, ‘একটু আশ্রয় দিবেন?’ এভাবে একসময় আশ্রয় পেয়েও যান।
এই সিনেমার একটি সংলাপ এরকম—‘ব্যবসা এক জিনিস আর ভালোবাসা আরেক জিনিস।’
‘সংসার’ সিনেমায় রাজ্জাক যাত্রাপালায় অভিনয় করেন।
সিনেমাটির ‘যেজন প্রেমের ভাব জানে না, তার সাথে নাই লেনাদেন’ গানে ঠোঁট মেলান সুচন্দা।
সুচন্দা আনোয়ার হোসেনের সঙ্গেও জুটি বেঁধেছেন। ‘দয়াল মুর্শিদ’ নামের একটি সামাজিক সিনেমায় আনোয়ার হোসেন নায়ক আর সুচন্দা নায়িকা। এই সিনেমার বড় বিষয় হচ্ছে আনোয়ার হোসেন সৎ ছেলে আর সুচন্দাও অসাধারণ একটি চরিত্রে নিজেকে মানিয়ে নেন।
সুচন্দার ক্যারিয়ারকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায় ‘জীবন থেকে নেওয়া’ সিনেমাটি। এটি পরিচালনা করেন জহির রায়হান। ঢাকাই সিনেমার ইতিহাসে কালজয়ী সিনেমা হিসেবে ‘জীবন থেকে নেওয়া’ স্থান করে নিয়েছে।
‘জীবন থেকে নেওয়া’ সিনেমার আবেদন এখনো আছে। সুচন্দার অভিনয় নিয়ে এখনো প্রশংসাবাক্য শোনা যায়।
‘আনোয়ারা’ সিনেমায় সুচন্দা নাম ভূমিকায় অভিনয় করেন, ব্যাপক প্রশংসা কুড়ান। ‘আনোয়ারা’ সাহিত্যনির্ভর সিনেমা।
‘ধীরে বহে মেঘনা’ একটি প্রশংসিত সিনেমা। এই সিনেমায় অতিথি শিল্পী হিসেবে অভিনয় করেন সুচন্দা। অন্যদিকে, নায়ক রাজ রাজ্জাক নায়ক হিসেবে প্রথম যে সিনেমায় অভিনয় করেন, সেটার নাম ‘বেহুলা’। ওই সিনেমায় নায়িকা ছিলেন সুচন্দা।
‘কথা দিলাম’ সিনেমায় ভিন্নরূপে পর্দায় আসেন সুচন্দা। এই সিনেমার নায়ক ফারুক এবং নায়িকা ববিতা। আরেকজন নায়িকা সুচরিতা। সুচন্দা অভিনয় করেন নায়ক ফারুকের ভাবির চরিত্রে। ভাবির চরিত্রেও অসাধারণ মানিয়ে যান সুচন্দা। তার স্বামীর চরিত্রে অভিনয় করেন সৈয়দ আহসান আলী সিডনি।
সুচন্দা একাধারে নায়িকা, প্রযোজক, পরিচালক। জহির রায়হানের বিখ্যাত উপন্যাস ‘হাজার বছর ধরে’ পরিচালনা করে দারুণভাবে প্রশংসা কুড়ান তিনি। পরিচালক সুভাষ দওয়ের হাত ধরে তার সিনেমায় আগমন।
১৯৬৬ সালে তিনি ‘কাগজের নৌকা’ দিয়ে রূপালি পর্দায় নাম লেখান।
এ বছর তার অভিনয় জীবনের ৬০ বছর পূর্ণ হলো।
