কোন এলাকায় কোন বিষধর সাপ, জানা কেন জরুরি

চা-বাগান শ্রমিক অর্জুন চাষা। গত ১১ সেপ্টেম্বর সকাল ১০টার দিকে তিনি চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার কোদালার একটি বাগানে চা-পাতা তুলছিলেন। বুঝতে পারেন, পায়ে কিছু একটা কামড়েছে। নিচে তাকিয়ে দেখেন, একটা সাপ। তার বর্ণনা অনুযায়ী, সাপটার রং ছিল পাতার মতো।

এরপর অর্জুনকে দ্রুত চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সাপ কামড়ানোর প্রায় ১৫ মিনিট পর তিনি ব্যথা অনুভব করতে শুরু করেন।

হাসপাতালে চিকিৎসকদের কাছে সাপের রং ও আকার-আকৃতির বর্ণনা দেন অর্জুন। এরপর তাকে অ্যান্টিভেনম দেওয়া হয়।

অর্জুনের বর্ণনা এবং কামড় দেওয়ার পরের উপসর্গের ওপর ভিত্তি করে চমেকের এক চিকিৎসক সাপটিকে পিট ভাইপার বলে শনাক্ত করেন। পরে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পান ৩০ বছর বয়সী অর্জুন।

গত ১২ সেপ্টেম্বর চমেকে গেলে এই ঘটনা সম্পর্কে জানতে পারে দ্য ডেইলি স্টার। অর্জুনের এই ঘটনায় বোঝা যায়, মানুষের জীবন ঘনিষ্ঠভাবে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থলের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।

বাংলাদেশে কৃষিজমি, জলাভূমি, বন, পাহাড় ও ম্যানগ্রোভসহ প্রায় সব ধরনের পরিবেশেই সাপ থাকে।

নতুন প্রজাতির তথ্য সামনে আসা এবং আগের তথ্য নতুন করে যাচাইয়ের কারণে দেশের সাপের তালিকাও সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হচ্ছে।

২০২৫ সালে ‘রিভিজিটিং দ্য স্নেকস অব বাংলাদেশ: এ সিস্টেমেটিক রিভিউ অব স্পিসিজ ডাইভারসিটি অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন প্যাটার্নস’ শিরোনামে একটি গবেষণা পরিচালিত হয়। সেখানে বাংলাদেশে ৮৯টি সাপের প্রজাতির অস্তিত্ব নিশ্চিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৭টি বিষধর ও ৬২টি নির্বিষ।

গবেষণায় বলা হয়েছে, গত পাঁচ দশকের বিভিন্ন তথ্য ও সাপ দেখার রেকর্ডের ভিত্তিতে বাংলাদেশে তিনটি প্রজাতিকে আঞ্চলিকভাবে বিলুপ্ত বলে মনে করা হচ্ছে। এছাড়া নিশ্চিত তথ্য না থাকায় আরও ১৬টি প্রজাতিকে দেশের সাপের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

সাপের বিস্তার ও আবাসস্থল জানা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাংলাদেশে অহরহই সাপের কামড়ে মানুষ মারা যাচ্ছে।

গবেষণায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশে প্রতি বছর আনুমানিক ৭ লাখ মানুষকে সাপে কাটে। তাদের মধ্যে ৬ হাজারের বেশি মানুষ মারা যান।

দেশে থাকা ২৭টি বিষধর প্রজাতির মধ্যে আটটিকে জনস্বাস্থ্যের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয়।

কোন এলাকায় কোন সাপ পাওয়া যায়, তা জানা থাকলে সাপের কামড়ের ঝুঁকি বেশি, এমন এলাকা চিহ্নিত করা সহজ হয়। একই সঙ্গে আগাম প্রস্তুতি নেওয়া, হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা রাখা এবং দ্রুত চিকিৎসা দেওয়ার ক্ষেত্রেও এটা কাজে আসে।

২০২৩ সালের ‘ইমপ্লিমেন্টেশন অব ইকোলজিক্যাল ডিস্ট্রিবিউশন অব ভেনোমাস স্নেকস ফর ক্লিনিক্যাল ম্যানেজমেন্ট অব স্নেকবাইট ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক একটি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, দেশের সব এলাকায় বিষধর সাপের উপস্থিতি একরকম নয়।

কৃষিজমি, মানুষের বসতি, বন, জলাভূমি ও ম্যানগ্রোভসহ বিভিন্ন ধরনের পরিবেশের সঙ্গে এসব সাপের বিস্তারের সম্পর্ক রয়েছে।

পাতি কালাচ (কমন ক্রেইট): বাংলাদেশের প্রায় সব এলাকাতেই এই সাপের দেখা পাওয়া যায়। তবে চট্টগ্রাম ও সিলেটে এই সাপ তুলনামূলকভাবে কম। গ্রামাঞ্চলের বসতি এলাকায় এদের দেখা যায়। এই সাপ মূলত স্থলভূমিতে বাস করে।

ছোট কৃষ্ণ কালাচ (লেসার ব্ল্যাক ক্রেইট): দেশের বিভিন্ন এলাকায় অহরহই এদের পাওয়া যায়। তবে চট্টগ্রাম ও সিলেটের মিশ্র চিরহরিৎ বন, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে এদের উপস্থিতির রেকর্ড নেই। মূলত সমতলের স্থলভূমির সঙ্গে এ সাপের বসবাসের সম্পর্ক রয়েছে।

বড় কৃষ্ণ কালাচ (গ্রেটার ব্ল্যাক ক্রেইট): এই সাপের বিস্তার তুলনামূলকভাবে কম। চট্টগ্রাম, সিলেট, কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রামের মিশ্র চিরহরিৎ বন এবং সুন্দরবনে এ সাপ পাওয়া যায়। এরা মূলত এসব এলাকায় থাকতে পছন্দ করে।

সিন্ধু কালাচ (ওয়ালস ক্রেইট): এই সাপটিও বাংলাদেশের বিভিন্ন বিচ্ছিন্ন এলাকায় পাওয়া যায়। এরা মূলত সমতলের স্থলভূমিতে বসবাস করে।

পদ্ম গোখরা বা কেউটে (মনোকলড কোবরা): সারা দেশেই এই সাপ ছড়িয়ে আছে। তবে রাজশাহী অঞ্চলে তুলনামূলক কম দেখা যায়। কৃষিজমি, জলাভূমি ও মানুষের বসতিপূর্ণ এলাকাসহ বিভিন্ন পরিবেশে এদের দেখা মেলে।

খৈয়া গোখরা (স্পেকট্যাকলড কোবরা): এই সাপটির দেখাও দেশের সবখানেই মেলে। তবে চট্টগ্রাম ও সিলেটে তুলনামূলকভাবে কম পাওয়া যায়। সমতলের স্থলভূমি, কৃষিজমি ও গ্রামীণ এলাকায় এদের বেশি দেখা যায়।

চন্দ্রবোড়া (রাসেলস ভাইপার): এই সাপটির বিস্তার তুলনামূলকভাবে নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় সীমিত। রাজশাহী বিভাগের বেশিরভাগ এলাকায় এর দেখা মেলে। তবে বগুড়া ও সিরাজগঞ্জ ব্যতিক্রম।

এছাড়া কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, রাজবাড়ী, ফরিদপুর, শরীয়তপুর, মাদারীপুর, মানিকগঞ্জ, ঢাকা, মুন্সিগঞ্জ, চাঁদপুর, লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালীসহ দেশের মধ্যাঞ্চল, দক্ষিণাঞ্চল ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের কয়েকটি জেলায় এ সাপের উপস্থিতি রয়েছে। বরিশাল বিভাগের কিছু এলাকাতেও এদের পাওয়া যায়।

ঘাসে ঢাকা সমতল এলাকা, ফসলি জমি, নদীর তীর ও বাড়ির আশপাশের এলাকা রাসেলস ভাইপারের পছন্দের আবাসস্থল।

দাগি লেজি সবুজ বোড়া (স্পট-টেইলড পিট ভাইপার): এরা মূলত চট্টগ্রাম, সিলেট, কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রামের মিশ্র চিরহরিৎ বন এবং সুন্দরবনে পাওয়া যায়। 

এসব তথ্য থেকে বোঝা যায়, বাংলাদেশের সব এলাকায় বিষধর সাপের উপস্থিতি একই রকম নয়। কিছু প্রজাতি দেশের বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে আছে। আবার কিছু প্রজাতি নির্দিষ্ট বন, পাহাড়, জলাভূমি বা অঞ্চলের সঙ্গে সম্পর্কিত।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ইব্রাহিম খলিল আল হায়দার বলেন, সাপে কাটার সন্দেহ হলেই দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে। কারণ বিষধর সাপের কামড়ে দ্রুত চিকিৎসার প্রয়োজন হয়।

তিনি বলেন, বিষধর সাপের কামড়ে সবসময় সঙ্গে সঙ্গে ব্যথা নাও হতে পারে।

উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, কেউটে কামড়ানোর পর শুরুতে তেমন ব্যথা অনুভব হয় না। অনেক সময় মশার কামড়ের মতোও মনে হতে পারে।

অন্যদিকে, ভাইপারের কামড়ে সাধারণত দ্রুত ব্যথা ও ফোলা দেখা দেয়। তবে ব্যথা আছে কি না, তা দেখে সাপের কামড় বিষধর কি না নিশ্চিত হওয়া যায় না।

ইব্রাহিম খলিল আল হায়দার বলেন, মানুষের আশপাশে থাকা প্রতিটি সাপ চেনার প্রয়োজন নেই। বরং নিজের এলাকায় কোন কোন বিষধর সাপ পাওয়া যায়, সে সম্পর্কে ধারণা থাকাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

তার মতে, এতে কোন জায়গায় সাপের কামড়ের ঝুঁকি বেশি তা বুঝতে সুবিধা হয় এবং সাপে কাটলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়ার সিদ্ধান্তও নেওয়া যায়।

Related Articles

Latest Posts