আমার প্রথম পিরিয়ড হয় ১১ বছর বয়সে। মনে আছে, বিষয়টি বুঝে ওঠার মতো বয়স তখনো হয়নি। তবে এটুকু বোঝার মতো বড় হয়েছিলাম যে, বিশেষ কিছু একটা ঘটেছে। এখন ১১ বছর বয়সকে আর খুব কম বয়স বলে মনে হয় না।
এখন আট বছর বয়সেও মেয়েদের বয়ঃসন্ধিকাল শুরু হতে পারে। হার্ভার্ড টি এইচ চ্যান স্কুল অব পাবলিক হেলথের নেতৃত্বে ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ৭১ হাজারের বেশি নারীর ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৫০ থেকে ১৯৬৯ সালের মধ্যে জন্ম নেওয়া নারীদের প্রথম ঋতুস্রাবের গড় বয়স ছিল ১২ বছর ৫ মাস। ২০০০ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে জন্ম নেওয়া নারীদের ক্ষেত্রে গড় বয়স দেখা গেছে, ১১ বছর ৯ মাস। এই সময়ের ব্যবধানে নয় বছর বয়সের আগে ঋতুস্রাব শুরু হওয়ার হারও দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে।
আট! শুধু এই সংখ্যাটিই বয়ঃসন্ধিকাল নিয়ে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি নতুন করে ভাবার জন্য যথেষ্ট হওয়া উচিত।
বাংলাদেশে কোনো মেয়ের পিরিয়ড বা শারীরিক পরিবর্তন শুরু হলে প্রায়ই তাকে শুনতে হয়, ‘বড় হয়ে গেছ।’
কিন্তু আট বছর বয়সে একটি শিশু বড় হয়ে যায় না। ১১ বছরের কিশোরীটিও নয়।
শারীরিক পরিবর্তন এলে সমাজের চোখে বদলে যায় তার পরিচয়ও। পিরিয়ডকে ‘নারী হয়ে ওঠার’ সমার্থক হিসেবে দেখা হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় নানা নতুন প্রত্যাশা কিংবা বিধি-নিষেধ। ঠিকভাবে বসতে হবে, ওড়না পরতে হবে, ছেলেদের সঙ্গে খেলতে পারবে না, একা বাইরে যাওয়া যাবে না, সন্ধ্যা হওয়ার আগেই বাড়ি ফিরতে হবে। এমনকি, কত জোরে হাসছে, খেয়াল রাখতে হবে সেদিকেও!
সর্বোপরি, অন্যের নজরে পড়া থেকে সাবধান থাকতে হবে।
এখানেই মেয়েদের শৈশবের সবচেয়ে নিষ্ঠুর বৈপরীত্যগুলোর একটি সামনে আসে—যে সময়ে একটি শিশুর পৃথিবীকে আবিষ্কার করার কথা, ঠিক তখনই তার চারপাশের পৃথিবী ক্রমশ সংকুচিত হতে শুরু করে।
ছেলেদের বড় হয়ে ওঠার অর্থ প্রায়ই বেশি স্বাধীনতা পাওয়া। আর মেয়েদের ক্ষেত্রে বয়ঃসন্ধিকালের অর্থ হতে পারে বিধিনিষেধের তালিকা দীর্ঘ হওয়া।
আমরা একে সুরক্ষা বলি। সেই ভয়ের পেছনে বাস্তব কারণও আছে। ছোট্ট শিশুদের, এমনকি কোলে থাকা শিশুদেরও যৌন হয়রানি ও সহিংসতার শিকার হতে হয়।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য বিশ্লেষণ করে দ্য ডেইলি স্টার দেখেছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ধর্ষণের শিকার কন্যাশিশুদের মধ্যে ২০ শতাংশের বয়স ছিল ছয় বছর বা তার কম। আরও ৩৯ শতাংশের বয়স ছিল সাত থেকে ১২ বছরের মধ্যে। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ১৯৫, যা ২০২৫ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ৩৫৭-তে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে কন্যাশিশু ধর্ষণের ঘটনা প্রথম নয় মাসে ৮৩ শতাংশ বেড়েছে।
বিপদজনক এই বাস্তবতা এখনো রয়েছে। হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের শুধু আগস্টেই ৭৯ জনকে ধর্ষণ করা হয়, যাদের মধ্যে ৪৬ জনই শিশু। এ ছাড়া এই সময়ে ৯৩ জনকে যৌন নিপীড়ন করা হয়েছে, যার মধ্যে ৩৮ জন শিশু।
বয়ঃসন্ধিকাল এমন কোনো বিষয় নয়, যা হঠাৎ মেয়েদের ঝুঁকির মুখে ফেলে দেয়।
তাহলে ঠিক কী বদলে যায়?
অনেক ক্ষেত্রেই আমরা বিপদ মোকাবিলার দায়িত্ব মেয়েটির ওপর চাপিয়ে দিতে শুরু করি। আগে তার সুরক্ষার প্রয়োজন ছিল। এখন তাকে শেখানো হয়, কীভাবে নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে হবে।
হুমকিটা পুরোনো। নতুন হলো তার প্রতি আমাদের প্রত্যাশা।
পুরুষেরা তার দিকে তাকাতে পারে, তাই তাকে শরীর ঢেকে রাখতে হবে। পুরুষেরা তাকে উত্ত্যক্ত করতে পারে, তাই তাকে ঘরে থাকতে হবে। পুরুষেরা নারীর শরীরকে বাজে দৃষ্টিতে দেখতে পারে, তাই তার এটাও খেয়াল রাখতে হবে।
ভাবুন তো, আট বছর বয়সী একটি শিশুর ওপর কী বিশাল দায়িত্ব চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে!
বয়ঃসন্ধিকালে মেয়েদের সঙ্গে ঋতুস্রাব, শারীরিক পরিবর্তন, সম্মতি, ব্যক্তিগত সীমারেখা, যৌনতা ও নিরাপত্তা নিয়ে কথা বলা উচিত। কিন্তু শারীরিক বিকাশ ঘটলেই অন্যের দৃষ্টির জন্য সে দায়ী—এমন শিক্ষা দেওয়া নয়।
পিরিয়ড প্রজননক্ষমতা বিকাশের সংকেত, মানসিক পরিপক্বতার নয়। মেয়েদের ছেলেদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করার সুযোগ থাকা উচিত এবং প্রাপ্তবয়স্কদের এটাকে যৌনতার দৃষ্টিতে দেখা উচিত নয়। একইভাবে, জনপরিসরেও চলাচলের ক্ষেত্রেও কে, কীভাবে দেখছে কেবল তা না ভেবে নারীর স্বাধীনভাবে চলাফেরার অধিকার থাকা উচিত।
ছেলেদের সঙ্গে আমাদের আলোচনার ধরনও বদলাতে হবে। ভাবুন তো, মেয়েদেরকে অন্যের বাজে দৃষ্টি এড়িয়ে চলতে শেখানোর পেছনে আমরা যতটা সময়-শ্রম ব্যয় করি, ‘মেয়েদের উত্ত্যক্ত করা যে অন্যায়’—ছেলেদের এটা শেখানোর পেছনেও কি আমরা ঠিক ততটা সময়-শ্রম ব্যয় করি?
মেয়েদের ‘নিরাপত্তার’ জন্য আরোপ করা প্রতিটি বিধিনিষেধই কিছু প্রশ্নের জন্ম দেয়: কার কাছ থেকে নিরাপদ থাকতে হবে? আর সেই নিরাপত্তার দায়িত্ব কেন তারই?
হয়রানিমূলক আচরণের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো মেয়েদের চলাফেরায় বিধিনিষেধ আরোপ করে মূলত তাকে শেখানো হয়, স্বাধীনতা শর্তসাপেক্ষ।
কৈশোরজুড়ে আমরা একটি মেয়ের পৃথিবীকে সংকুচিত করে রাখব, এরপর প্রাপ্তবয়স্ক হলে তার কাছেই নির্ভীক ও স্বাধীন হয়ে ওঠার প্রত্যাশা করব—এটা হতে পারে না। নয় বছর বয়সে তাকে যদি বলা হয়, রাস্তা তার জন্য নয়, তাহলে ২৫ বছর বয়সে সে সেই রাস্তায় আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে হেঁটে যাবে—এমন প্রত্যাশাও করা যায় না।
মেয়েদের শৈশব সংক্ষিপ্ত করে দেওয়া উচিত নয়। পিরিয়ড কখন শুরু হবে, তা একটি জৈবিক বিষয়। কিন্তু শৈশবকাল কতদিন থাকবে, তা এটি নির্ধারণ করে দেবে না।
একটি মেয়ে যখন বড় হতে থাকবে, একইসঙ্গে তার পৃথিবীকেও বড় হতে দিতে হবে।
