‘ত্রিরঙ্গা উড়িয়ে দাও’ সমাবেশের ডাক দীপকের, ২৩ অক্টোবর ভারতজুড়ে আন্দোলন

ভারতের রাজধানী দিল্লির কনট প্লেসের সেন্ট্রাল পার্কে আগামী ১৬ অক্টোবর ‘লেহরা দো তিরঙ্গা’ বা ‘ত্রিরঙ্গা উড়িয়ে দাও’ সমাবেশের ডাক দিয়েছেন ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দু বলছে, দলটির দুই নেতা আশুতোষ রাঙ্কা ও সৌরভ দাসকে জাতীয় পতাকা ওড়ানোর অভিযোগে পাঁচ দিনের বিচার বিভাগীয় হেফাজতে পাঠানোর পর এ কর্মসূচির ঘোষণা দেন তিনি।

Lehra do Tiranga 🇮🇳 16 Oct | Central Park, CP | 5 PM https://t.co/eFO1RfUBos

অভিজিৎ দীপকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে অভিযোগ করেন, নরেন্দ্র মোদি সরকারের আমলে জাতীয় পতাকা ওড়ানো কার্যত বেআইনি হয়ে পড়েছে।

প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, ভিন্ন উপায়ে বিরোধিতার কণ্ঠরোধ না করে আনুষ্ঠানিকভাবে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা উচিত।

Is waving tricolour a crime now, @narendramodi? https://t.co/0ABoNSteEj

সিজেপির পক্ষ থেকে দেওয়া আরেক পোস্টে বলা হয়, রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস) ৫২ বছর তাদের সদর দপ্তরে জাতীয় পতাকা ওড়ায়নি।

দলটি বলেছে, তারা সর্বত্র জাতীয় পতাকা ওড়াবে এবং গ্রেপ্তার বা আক্রমণের মুখেও আন্দোলন বন্ধ করবে না।

The RSS didn’t hoist National Flag At Their Headquarters For 52 Years! We will hoist it and wave it, Everywhere! This is Our Country! Attack Us, Jail Us. We will not stop!

এদিকে ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধন (এসআইআর) বাতিল এবং ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে আগামী ২৩ অক্টোবর দেশজুড়ে আন্দোলনের ঘোষণা দিয়েছে শতাধিক যুব, শ্রমিক ও কৃষক সংগঠন।

আজ বুধবার দিল্লিতে এসআইআরবিরোধী বিভিন্ন সংগঠনের এক বৈঠকের পর এ কর্মসূচির কথা জানান অল ইন্ডিয়া কিষান সভার নেতা রাজন ক্ষীরসাগর। তিনি বলেন, বৈঠকে শতাধিক যুব, শ্রমিক ও কৃষক সংগঠন অংশ নিয়েছে। এসআইআর প্রত্যাহার, প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ এবং ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া নামগুলোর নিরীক্ষার দাবিতে দেশজুড়ে আন্দোলন শুরু হবে।

যন্তর মন্তর নিয়ে বিতর্ক

এদিকে দিল্লির যন্তর মন্তরকে নির্ধারিত বিক্ষোভস্থলের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে দিল্লি হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছে ভারতীয় যুব কংগ্রেস। বুধবার সংগঠনটির সভাপতি উদয় ভানু চিব এ আবেদন করেন।

যন্তর মন্তরে বিক্ষোভ করার অনুমতি চেয়ে আগে থেকেই আদালতে একটি আবেদন বিচারাধীন রয়েছে। সেই আবেদনের সঙ্গে নতুন আবেদনটি যুক্ত করা হয়েছে।

দিল্লি পুলিশের কমিশনার অনুরাগ কুমার গত ১১ অক্টোবর এক আদেশে যন্তর মন্তরকে বিক্ষোভ ও সমাবেশের নির্ধারিত স্থান হিসেবে বাদ দেন। বিকল্প হিসেবে রামলীলা ময়দান, বুরারি ময়দান ও পূর্ব দিল্লির সিবিডি ময়দানকে নির্ধারণ করা হয়।

তবে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিকল্প বিক্ষোভস্থলগুলোর অন্যতম রামলীলা ময়দানে আগামী আড়াই মাসের মধ্যে কোনো ফাঁকা তারিখ নেই। শুধু ২৯, ৩০ ও ৩১ ডিসেম্বর মাঠটি বুকিংয়ের জন্য খালি রয়েছে।

Waving the Tricolour at Jantar Mantar in a peaceful protest is not a crime. Jailing youth for it is an act of cowardice. Students. Youth. Journalists. The INDIA bloc. Different banners, one cause. All protests are one: citizens demanding their constitutional rights. Jantar Mantar belongs to the people of India. We will reclaim it.

‘জাতীয় পতাকা ওড়ানো অপরাধ নয়’

জাতীয় পতাকা নিয়ে যন্তর মন্তরে যাওয়ার পর সিজেপির নেতা আশুতোষ রাঙ্কা ও সৌরভ দাসকে গ্রেপ্তার করে পাঁচ দিনের বিচার বিভাগীয় হেফাজতে পাঠানোর নিন্দা জানিয়েছেন কংগ্রেস নেতা ও লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী।

রাহুল বলেন, যন্তর মন্তরে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে জাতীয় পতাকা ওড়ানো কোনো অপরাধ নয়। এ কারণে তরুণদের কারাগারে পাঠানো কাপুরুষোচিত কাজ। শিক্ষার্থী, তরুণ, সাংবাদিক ও বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’র ব্যানার আলাদা হলেও তাদের দাবি এক—সাংবিধানিক অধিকার প্রতিষ্ঠা।

যন্তর মন্তর ভারতের জনগণের জায়গা উল্লেখ করে তিনি বলেন, তারা সেটি ফিরিয়ে নেবেন। একইসঙ্গে ভারতের প্রধান বিচারপতি, সুপ্রিম কোর্ট ও বিচারব্যবস্থার প্রতি কংগ্রেসের পূর্ণ শ্রদ্ধা রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, রাজনৈতিক ও জনপরিসরের প্রতিবাদ চলবে এবং শেষ পর্যন্ত তা জয়ী হবে।

We, and many generations before us, have fought strongly for our democratic rights. We must continue to do so. I strongly condemn the arrest of Ashutosh and Saurav of the CJP. These moments are about us all, pledging and standing up to fight unitedly to protect our great democracy. This is an attempt to intimidate and silence an entire generation. This is unacceptable. We must never surrender our constitutional rights. This murdering of democracy is happening in many parts of the country. At this moment, 14,000 of our people in Bengal are facing the brunt of police and political atrocities. A government that has forgotten that ‘it is of the people, by the people, for the people’ is nearing its end. To the millions of young people I say: Your Didi is with you – today and forever! Let us stand together and save our Mother India. Jai Hind! Vande Mataram! Joy Bangla!

ককরোচদের সঙ্গে বিরোধী নেতাদের সংহতি

সিজেপির দুই নেতার গ্রেপ্তারের নিন্দা জানিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তার অভিযোগ, এ পদক্ষেপ একটি পুরো প্রজন্মকে ভয় দেখিয়ে চুপ করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা।

সংবিধান রক্ষায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, তরুণ আন্দোলনকারীদের প্রতি তার সমর্থন নিঃশর্ত। পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ১৪ হাজার মানুষ একই ধরনের পুলিশি ও রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

কেরালার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়নও সিজেপির নেতা সৌরভ দাস, আশুতোষ রাঙ্কা ও অজিঙ্কা শিন্ডেকে আটকের নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি যন্তর মন্তরকে আবার বিক্ষোভস্থল হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ ও তার বিচারের দাবি জানান।

তামিলনাড়ুর সাবেক মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্ট্যালিন আশুতোষ রাঙ্কা ও সৌরভ দাসের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছেন। তাদের প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তা দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে তিনি বলেন, আরও তরুণকে কারাগারে পাঠালে আরও বেশি মানুষ রাস্তায় নামবেন।

অভিনেতা প্রকাশ রাজ ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণও দিল্লিতে এসআইআরবিরোধী সংগঠনগুলোর এক জরুরি বৈঠকের পর সংবাদ সম্মেলন করেন। প্রকাশ রাজের অভিযোগ, যান চলাচলে বাধা না দেওয়া সত্ত্বেও জাতীয় পতাকা নিয়ে যন্তর মন্তরে যাওয়ার পর দুই তরুণ নেতাকে গ্রেপ্তার করে হেফাজতে পাঠানো হয়েছে। তরুণদের বিরুদ্ধে যে শক্তি প্রয়োগ করা হয়েছে, একইভাবে নাগরিক সমাজ ও কৃষক সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধেও তা প্রয়োগ করার চ্যালেঞ্জ জানান তিনি।

অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন (আইসা) এক বিবৃতিতে সিজেপির দুই নেতার গ্রেপ্তারের নিন্দা জানিয়েছে। সংগঠনটির অভিযোগ, এসআইআর বাতিল ও প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনকারীদের দমনে পুলিশি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। যন্তর মন্তরকে বিক্ষোভস্থলের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া এবং নারী বিক্ষোভকারীদের ওপর পুলিশি বলপ্রয়োগের অভিযোগও তুলেছে তারা। দুই নেতার অবিলম্বে মুক্তি দাবি করেছে সংগঠনটি।

কংগ্রেস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় গণতন্ত্র রক্ষার লড়াই চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে। শিবসেনা (উদ্ধব বালাসাহেব ঠাকরে) নেতা সঞ্জয় রাউতও বলেছেন, প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ না হওয়া পর্যন্ত ‘ইন্ডিয়া’ জোটের আন্দোলন চলবে।

ভোটার তালিকা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপ

দিল্লিতে এসআইআরের মাধ্যমে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া ব্যক্তিদের নাম পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়া নিয়েও সুপ্রিম কোর্টে উদ্বেগ জানানো হয়েছে।

আবেদনকারীদের পক্ষে আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ ও নেহা রাঠি আদালতকে জানান, বাদ পড়া ভোটারদের নাম ফেরাতে নির্বাচন কমিশন তাদের নতুন ভোটার হিসেবে ফরম-৬ পূরণ করতে বলছে। তাদের অভিযোগ, আগে কখনো ভোট দেননি—এমন ঘোষণা দিতে বাধ্য করা হচ্ছে, অন্যথায় কারাদণ্ডের ঝুঁকি রয়েছে বলে জানানো হচ্ছে।

প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ বিষয়টি দেখার আশ্বাস দিয়েছে।

এসআইআরের বিরোধিতাকারী সংগঠনগুলোর অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ায় ভোটারদের নাম বাদ দেওয়ার অনিয়ম ঘটছে। তাদের দাবি, সংশোধন প্রক্রিয়া বাতিল করে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া নামগুলোর নিরীক্ষা করতে হবে। এ দাবিকে কেন্দ্র করেই আগামী ২৩ অক্টোবর দেশজুড়ে আন্দোলনের কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।

Related Articles

Latest Posts