গাজা-লেবাননে ২৫৪ হত্যাকাণ্ডের তদন্তের ফল এখনো প্রকাশ করেনি আইডিএফ: বিবিসি ভেরিফাই

গাজা, লেবানন, অধিকৃত পশ্চিম তীর ও ইসরায়েলে বিভিন্ন হতাহতের অভিযোগের ২৫৪টি ঘটনার তদন্ত করা হচ্ছে বলে জানিয়েছিল ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ)। তবে এসব তদন্তের প্রতিবেদন কখনো জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি।

ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসি ভেরিফাইয়ের অনুসন্ধানে এ তথ্য উঠে এসেছে। এ কাজে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক বিশেষ প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিবিসি ভেরিফাই ৬০ হাজারের বেশি সংবাদ প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করেছে।

২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজা যুদ্ধ শুরুর পর থেকে আইডিএফের বিরুদ্ধে হতাহতের অভিযোগ ওঠা শত শত ঘটনা খতিয়ে দেখেছে বিবিসি।

প্রতিটি ঘটনা হাতে-কলমে যাচাই করার পর বিবিসি ভেরিফাই ৩০০টি ঘটনার সন্ধান পায়। এ ঘটনাগুলোর মধ্যে মাত্র ২৮টির তদন্তের ফলাফল আইডিএফের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। আরও ১৮টি ঘটনার তদন্ত শেষ হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়।

প্রতিটি ঘটনা নিয়ে আইডিএফের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করেছে বিবিসি ভেরিফাই। তবে মাত্র দুটি ঘটনা সম্পর্কে তথ্য পেয়েছে তারা। আইডিএফ জানিয়েছে, ওই দুটি ঘটনার পর্যালোচনা এখনো চলছে।

এক বিবৃতিতে আইডিএফ বলেছে, ‘আইন বা আইডিএফের নির্দেশনার সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ প্রতিটি অভিযোগ বা প্রতিবেদনকে আমরা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করি।’

যুদ্ধের সময় আন্তর্জাতিক মানবিক আইন ও জেনেভা কনভেনশন বাস্তবায়নে কাজ করা আন্তর্জাতিক রেডক্রস কমিটি (আইসিআরসি) বলেছে, আন্তর্জাতিক মানবিক আইন লঙ্ঘনের সম্ভাব্য ঘটনা নিয়ে অপরাধমূলক বা অন্য যেকোনো ধরনের তদন্ত যতটা সম্ভব স্বচ্ছ হওয়া উচিত।

বিবিসি ভেরিফাইয়ের শনাক্ত করা ২৫৪টি ঘটনার মধ্যে ১৫৮টি গাজায়, ৪৮টি পশ্চিম তীরে এবং ৩২টি লেবাননে ঘটেছে। বাকি ১৬টি ঘটনা ঘটেছে ইসরায়েলে অথবা আইডিএফের হেফাজতে।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে এ বছরের ১৯ আগস্টের মধ্যে এসব ঘটনা ঘটেছে। এগুলোর মধ্যে ২০০টির বেশি ঘটনায় অন্তত একজন করে মারা যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

এমন একটি প্রাণঘাতী ঘটনা ২০২৪ সালের আগস্টের। গাজার একটি স্কুল ভবনে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ৯৩ জন নিহত হন বলে খবর পাওয়া যায়। নিহতদের মধ্যে ছিলেন ছয় নারী ও ১১ শিশু।

গত তিন বছরে প্রাণহানির অভিযোগের জবাবে আইডিএফ প্রায়ই জানিয়েছে, কোনো ঘটনা তারা ‘খতিয়ে’ দেখছে, ‘পর্যালোচনা’ করছে কিংবা ‘পরীক্ষা করা হচ্ছে’। এরপর অনেক ক্ষেত্রে ওই ঘটনা নিয়ে আর কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

কিছু ঘটনা আইডিএফের পক্ষ থেকে অপরাধমূলক তদন্তের পর্যায়ে নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—পাঁচ বছর বয়সী ফিলিস্তিনি শিশু হিন্দ রাজাবের মৃত্যু এবং রেড ক্রিসেন্টের ১৫ ফিলিস্তিনি চিকিৎসাকর্মীকে হত্যার ঘটনা। অভিযোগ অনুযায়ী, ওই ১৫ জনকে লক্ষ্য করে কাছ থেকে ১০০টির বেশি গুলি ছোড়া হয়েছিল।

যেভাবে তদন্ত করে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী

বিবিসি ভেরিফাই জানায়, আইডিএফের তদন্তের ফলাফল নিয়মিতভাবে প্রকাশ করা হয় না। এমনকি সেনাদের বিরুদ্ধে অপরাধের তদন্ত শুরু হলেও অনেকক্ষেত্রে তার এর ফল জনসমক্ষে আসে না।

যেসব তদন্তের ফল প্রকাশ করা হয়েছে, তার কয়েকটির সঙ্গে গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের কারণে জিম্মিদের মৃত্যুর অভিযোগ জড়িত। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিবিসি ভেরিফাই বা অন্য সংবাদমাধ্যম যোগাযোগ করার পরই আইডিএফ তদন্ত শুরুর ঘোষণা দিয়েছে।

গত আগস্টে গাজায় সংঘটিত পাঁচটি ঘটনা নিয়ে অভ্যন্তরীণ তদন্তের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করে আইডিএফ। বিরল এ প্রতিবেদনে হিন্দ রাজাব ও ১৫ ফিলিস্তিনি চিকিৎসাকর্মীর মৃত্যুর ঘটনাও ছিল। এসব ঘটনায় তদন্ত শুরু করা হয়েছে বলে জানায় আইডিএফ।

অন্য তিনটির মধ্যে ছিল বিমান হামলায় ওয়ার্ল্ড সেন্ট্রাল কিচেনের (ডব্লিউসিকে) ৭ ত্রাণকর্মী এবং গাজায় পৃথক দুটি হামলায় ডক্টরস উইদাউট বর্ডার্সের (এমএসএফ) ৪ ত্রাণকর্মী নিহতের ঘটনা।

আইডিএফ বলেছে, এসব ঘটনায় ফৌজদারি তদন্ত শুরুর মতো যথেষ্ট ভিত্তি বা যৌক্তিকতা তারা পায়নি।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে প্রায় ১৫০টি ঘটনার পর্যালোচনা শেষ করেছে আইডিএফের জেনারেল স্টাফ ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং অ্যান্ড অ্যাসেসমেন্ট মেকানিজম (এফএফএএম)।

‘ব্যতিক্রমী সামরিক অভিযানের ঘটনা’ তদন্ত প্রক্রিয়ায় পর্যালোচনা করা ঘটনাগুলো বর্তমানে আইডিএফের সামরিক প্রসিকিউশন বিভাগের কাছে পাঠানো হয়েছে।

তবে ওই ১৫০টি ঘটনা কোনগুলো, তা জানায়নি আইডিএফ। এর মধ্যে বিবিসি ভেরিফাইয়ের শনাক্ত করা ঘটনাগুলো রয়েছে কি না, সে বিষয়েও প্রশ্নের জবাব দেয়নি তারা।

নির্দিষ্ট করে বিবিসি ভেরিফাইয়ের শনাক্ত করা ৩০০টি তদন্তের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে একাধিকবার জানতে চাইলেও আইডিএফ স্পষ্ট ও বিস্তারিত তথ্য দেয়নি।

এক বিবৃতিতে আইডিএফ বলেছে, ‘আইনি ও সামরিক কার্যক্রম এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও তথ্যের নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিধিনিষেধ বিবেচনায় নিয়ে, সম্ভব হলে তদন্ত ও পর্যালোচনার ফলাফল প্রকাশ করা হয়।’

ইসরায়েলি সেনাবাহিনী আরও জানিয়েছে, কিছু ঘটনা কমান্ড পর্যায়ে পরিচালনাগত পর্যালোচনার মাধ্যমে পরীক্ষা করা হয়। এই পর্যালোচনার উদ্দেশ্য হলো ঘটনার ধারাবাহিকতা নির্ধারণ, ত্রুটি শনাক্ত করা, অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে সামরিক কার্যক্রমের মান উন্নত করা।

আইডিএফের দাবি, যুদ্ধ চলাকালে নির্দেশনা ও প্রত্যাশিত মানদণ্ড লঙ্ঘনের কয়েক ডজন ঘটনায় সংশ্লিষ্ট বা অভিযুক্ত সেনাসদস্যের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে কয়েকজনকে যুদ্ধ বা রিজার্ভ বাহিনীর দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়ার ঘটনাও রয়েছে।

তথ্য অধিকার আইনে ইসরায়েলি মানবাধিকার সংস্থা ইয়েশ দিনের পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত গাজাসংশ্লিষ্ট অন্তত ১ হাজার ৪৫৬টি ঘটনা এফএফএএমের কাছে পাঠানো হয়েছিল। এর মধ্যে ১২টির পর্যালোচনা শেষ করে সামরিক অ্যাডভোকেট জেনারেলের (এমএজি) দপ্তরে পাঠানো হয়। এসবের মধ্যে মাত্র দুটি ঘটনায় তদন্ত শুরু হয়েছিল।

ইয়েশ দিনের গবেষক ড্যান ওয়েন ২০০৬ সাল থেকে আইডিএফের সামরিক তদন্ত পর্যবেক্ষণ করছেন। বিবিসি ভেরিফাইকে তিনি জানান, আইডিএফ অনেক সময় তদন্ত ‘দীর্ঘায়িত’ করার চেষ্টা করে বলে তার ধারণা।

ওয়েন বলেন, ‘তারা প্রক্রিয়াগুলো এত দীর্ঘায়িত করার চেষ্টা করে, যাতে একটা সময় মানুষ ঘটনাগুলো ভুলে যায় কিংবা সেগুলো নিয়ে আর আগ্রহী থাকে না।’

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক আইনের অধ্যাপক জানিনা ডিল বলেন, জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী সশস্ত্র সংঘাতে জড়িত প্রতিটি পক্ষের দায়িত্ব নিজেদের বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে ‘তদন্ত এবং প্রয়োজন হলে বিচার করা’।

তিনি বলেন, ‘এটা একেবারেই মৌলিক ও স্পষ্ট নীতি। আইসিআরসির গৃহীত তদন্তসংক্রান্ত নির্দেশিকায় দ্রুততা, পূর্ণাঙ্গতা ও নিরপেক্ষতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।’

ইসরায়েল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউটের (আইডিআই) সেন্টার ফর সিকিউরিটি অ্যান্ড ডেমোক্রেসির পরিচালক এবং আইডিএফের সাবেক জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এরান শামির-বোরের বলেন, জটিল যুদ্ধক্ষেত্রে অভিযোগ তদন্ত করার ক্ষেত্রে ‘বাস্তব কিছু চ্যালেঞ্জ’ রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘শত্রু এলাকা আপনার নিয়ন্ত্রণে থাকে না এবং সেখানে প্রমাণ সংগ্রহ করা খুব কঠিন হতে পারে। যুদ্ধের ময়দানে অনেক বাহিনী মোতায়েন থাকে এবং তাদের অনেকেই গুলি চালায়।’

তিনি আরও বলেন, ‘যুদ্ধ পরিস্থিতিতে নিজের সেনাসদস্যদের বিরুদ্ধে তদন্ত করা কখনোই জনপ্রিয় সিদ্ধান্ত নয়।’ আইনের শাসন মেনে চলে এমন অন্য দেশেও একই ধরনের সমস্যা দেখা যায় বলে মত দেন শামির-বোরের।

তবে নিজেদের তদন্তের ব্যাপারে আইডিএফের আরও স্বচ্ছ হওয়া ইসরায়েলের জন্যই লাভজনক হবে বলে মনে করেন তিনি। 
অভিযোগের তদন্তে অগ্রগতি সম্পর্কে জনসাধারণকে আরও তথ্য দেওয়ার জন্য তিনি আইডিএফকে উৎসাহিত করেন।

গাজা

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে ইসরায়েলের হামলায় প্রায় ১ হাজার ২০০ জন নিহত হন এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করা হয়। এর পর থেকে আইডিএফ গাজায় ব্যাপক সামরিক অভিযান চালিয়ে আসছে। ইসরায়েলি বাহিনী বলেছে, জিম্মিদের ফিরিয়ে আনা এবং হামাসকে ধ্বংস করাই এসব অভিযানের লক্ষ্য।

হামাসের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ৭৪ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।

গত তিন বছরে বিবিসি ভেরিফাই গাজায় জরুরি চিকিৎসাকর্মী ও ত্রাণ নিতে যাওয়া মানুষের মৃত্যু, হাজার হাজার ভবন ধ্বংস ও ইসরায়েলি সেনাদের বিরুদ্ধে কথিত অসদাচরণের বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

যুদ্ধ শুরুর মাত্র দুই মাসের মাথায়, ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে গাজার একমাত্র ক্যাথলিক গির্জা প্রাঙ্গণে ইসরায়েলি সেনাদের গুলিতে দুই নারী নিহত হন। পরে আইডিএফ জানায়, ঘটনাটি পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

জেরুজালেমের লাতিন প্যাট্রিয়ার্কেটের তথ্য অনুযায়ী, গাজার হলি ফ্যামিলি গির্জা প্রাঙ্গণে স্নাইপারের গুলিতে নিহত হন নাহিদা আন্তন ও তার মেয়ে সামার আন্তন।

ঘটনাটি সম্পর্কে তখন আইডিএফের কাছে জানতে চেয়েছিল বিবিসি ভেরিফাই। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানায়, প্রাথমিক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, গির্জার আশপাশে শনাক্ত করা হামাসের হুমকি মোকাবিলায় সেনারা কাজ করছিলেন। একইসঙ্গে তারা জানিয়েছিল, ঘটনাটি নিয়ে বিস্তারিত পর্যালোচনা চলছে।

প্রায় দুই বছর পর, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে তদন্তের অগ্রগতি জানতে চাইলে বিবিসি ভেরিফাইকে বলা হয়, ঘটনাটি তখনো এফএফএএম পর্যালোচনা করছে।

নাহিদা ও সামার নিহত হওয়ার প্রায় তিন বছর পরও আইডিএফ জানিয়েছে, ঘটনাটির পর্যালোচনা চলছে।

সবশেষ হালনাগাদ তথ্য জানতে চাইলে আইডিএফ বলেছে, ‘জটিল ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক তথ্য সংগ্রহ, বিভিন্ন তথ্য মিলিয়ে দেখা এবং সেগুলোর সত্যতা যাচাই করতে যথেষ্ট সময়ের প্রয়োজন হতে পারে।’

তারা আরও বলেছে, ‘কোনো সময়সীমা পূরণের জন্য আইডিএফ তদন্ত বা পর্যালোচনার প্রক্রিয়া সংক্ষিপ্ত করে না কিংবা বাদ দেয় না।’

স্কুল ভবনে প্রাণঘাতী হামলা

ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর তদন্তাধীন সবচেয়ে প্রাণঘাতী ঘটনাগুলোর একটি হলো ২০২৪ সালের আগস্টে গাজার পূর্বাঞ্চলে একটি স্কুল ভবনে বিমান হামলা।

হামাস পরিচালিত বেসামরিক প্রতিরক্ষা সংস্থা জানিয়েছিল, তাবাইন স্কুল কমপ্লেক্স ও পাশের একটি মসজিদে হামলায় অন্তত ৯৩ জন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে ছিলেন ছয় নারী ও ১১ শিশু।

বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিরা ওই ভবনগুলোতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। ভোরের নামাজের সময় এলাকাটিতে একাধিকবার হামলা চালায় ইসরায়েলি বাহিনী।

বিবিসির যাচাই করা ভিডিওতে হামলার পর ধুলার মেঘ এবং আগুন, ধ্বংসস্তূপ ও মেঝেতে ছড়িয়ে থাকা দেহাবশেষের মধ্যে জরুরি উদ্ধারকর্মীদের কাজ করতে দেখা যায়। দিনের আলোয় তোলা ছবিতে রক্তমাখা মেঝে, ধ্বংসাবশেষ ও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা মানুষের পোশাক দেখা যায়।

বিশেষজ্ঞরা বিবিসি ভেরিফাইকে জানান, ঘটনাস্থলে পাওয়া বোমার ধ্বংসাবশেষের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহ করা জিবিইউ-৩৯ নির্ভুল নিশানার বোমার মিল রয়েছে।

তখন আইডিএফ বলেছিল, স্কুল ভবনের ভেতরে হামাসের একটি কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র ছিল। ওই ঘটনায় তাদের সেনারা ৩১ যোদ্ধাকে হত্যা করেছেন বলেও দাবি করে ইসরায়েলি বাহিনী।

আইডিএফ আরও জানায়, প্রাথমিক পর্যালোচনায় নিহতের সংখ্যা, ব্যবহৃত অস্ত্র এবং হামলার নির্ভুলতা সম্পর্কে পাওয়া তথ্যের সঙ্গে তাদের নিজস্ব তথ্যের মিল পাওয়া যায়নি। বিবিসি ভেরিফাইকে আইডিএফ জানিয়েছে, ঘটনাটি এখনো পর্যালোচনাধীন।

পশ্চিম তীর

ইসরায়েলি সেনাবাহিনী তদন্তনাধীন পশ্চিম তীরের ঘটনাগুলোও খতিয়ে দেখেছে বিবিসি ভেরিফাই। ১৯৬৭ সালের যুদ্ধের পর থেকে ইসরায়েল এ অঞ্চল দখল করে রেখেছে এবং সেখানে বহু বসতি গড়ে তুলেছে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী এসব বসতি অবৈধ।

জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয়বিষয়ক দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ১১ অক্টোবরের পর থেকে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে এক হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।

পশ্চিম তীরে আইডিএফের ৫০টির বেশি তদন্তের ঘটনা পরীক্ষা করেছে বিবিসি ভেরিফাই। এর মধ্যে অন্তত ২৬টি ঘটনায় নারী ও শিশু নিহত-আহতের অভিযোগ রয়েছে।

এমন একটি ঘটনা ঘটে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে, জেনিনের বাইরে। সেসময় ইসরায়েলি অভিযানে ১৬ বছর বয়সী লুজাইন মুসলেহ নিহত হন বলে অভিযোগ ওঠে।

লুজাইনের বাবা জানান, কাফর দান এলাকায় তাদের পাশের একটি বাড়ি সেনারা ঘিরে রেখেছিল। বাড়ির জানালা দিয়ে বাইরে দেখার চেষ্টা করার সময় গুলি এসে লুজাইনের মাথায় লাগে।

আইডিএফ তখন জানিয়েছিল, সেনাদের লক্ষ্য করে অস্ত্রধারীরা গুলি চালিয়েছিল। জবাবে সেনারা তাদের পর্যবেক্ষণ করতে থাকা এক সন্দেহভাজনকে লক্ষ্য করে গুলি চালান। ঘটনাটির বিস্তারিত পর্যালোচনা চলছে বলেও জানায় আইডিএফ।

লেবানন

লেবাননে মানুষের প্রাণহানি ও আহত হওয়ার ঘটনা নিয়ে আইডিএফের প্রায় ৪০টি তদন্তের সন্ধান পেয়েছে বিবিসি ভেরিফাই।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার পর হামাসের সমর্থনে শিয়া মুসলিম সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ ইসরায়েলে রকেট হামলা চালায়। এরপর লেবাননে দুটি বড় সামরিক অভিযান চালায় ইসরায়েল।

লেবাননের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, এসব সংঘাতে ৪ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।

বিবিসি ভেরিফাইয়ের শনাক্ত করা একটি ঘটনা ঘটে ২০২৪ সালের ১০ নভেম্বর। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বাইব্লোস শহরের কাছে ইসরায়েলি ওই হামলায় ২৩ জন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে ৭ শিশু ছিল।

যাচাই করা ভিডিওতে দেখা যায়, ধ্বংস হওয়া ভবনের ধ্বংসস্তূপ ও বাঁকানো ধাতব কাঠামোর ফাঁক দিয়ে ধোঁয়া উঠছে।

ইসরায়েলি সেনাবাহিনী তখন জানিয়েছিল, হিজবুল্লাহর সদস্যরা যে স্থাপনায় অবস্থান ও অস্ত্র মজুত করছিল, সেটিকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। ঘটনাটি পর্যালোচনাধীন বলেও জানায় আইডিএফ।

দীর্ঘায়িত তদন্ত

রিডিং বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক আইনের অধ্যাপক মাইকেল শ্মিট আগে আইডিএফের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছেন। তিনি বলেন, আইন বোঝার ক্ষেত্রে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর আইনি বিভাগকে ‘সর্বোচ্চ মানদণ্ড’ হিসেবে বিবেচনা করা যায়।

তবে তার মতে, আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠলেই পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শুরু করা জরুরি নয়।

শ্মিট বলেন, কোনো তদন্তের বিস্তারিত তথ্য বা তদন্ত না চালানোর সিদ্ধান্ত জনসমক্ষে প্রকাশ করতে না পারার পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে।

তিনি বলেন, ‘উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আপনি সামরিক কার্যক্রমের বিস্তারিত তথ্য বা নির্দিষ্ট যুদ্ধবিধি প্রকাশ করতে চাইবেন না। কারণ, শত্রুপক্ষ সেগুলোর সঙ্গে নিজেদের কৌশল মানিয়ে নিতে পারে।’ তদন্ত হলেও এর অনেক তথ্য গোপন রাখা হতে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

অক্সফোর্ড ইনস্টিটিউট ফর এথিকস, ল অ্যান্ড আর্মড কনফ্লিক্টের (ইএলএসি) সহপরিচালক পদেও রয়েছে অধ্যাপক জানিনা ডিল। তিনি বলেন, ‘সামরিক অভিযান শুরুর তিন বছর পর কিছু তদন্তের কাজ শেষ হয়ে যাওয়া উচিত ছিল।’

তিনি বলেন, প্রাণহানির ঘটনা তদন্তের ক্ষেত্রে ইসরায়েল আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের তদন্তের উদ্যোগকে অগ্রহণযোগ্য প্রমাণ করতে বারবার নিজেদের ‘আইনের শাসন মেনে চলা দেশ’ হিসেবে উপস্থাপন করেছে।

ডিল আরও বলেন, ‘যদি নথিভুক্ত নির্যাতনের ঘটনা তদন্ত না করা হয়, অথবা তদন্ত আটকে থাকে এবং যুক্তিসঙ্গতভাবে মনে হয় যে, সেগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে দীর্ঘসূত্রতায় ফেলা হচ্ছে, তাহলে জবাবদিহি নিশ্চিত করার সক্ষমতা নিয়ে ইসরায়েলের যে দাবি, তা দুর্বল হয়ে পড়বে।’

যেভাবে অনুসন্ধান চালিয়েছে বিবিসি ভেরিফাই

বিবিসি ভেরিফাই ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের ১৯ আগস্ট পর্যন্ত প্রকাশিত বিবিসি নিউজ ও রয়টার্সের ৬১ হাজার প্রতিবেদন সংগ্রহ করে। এসব প্রতিবেদনে গাজা, পশ্চিম তীর বা লেবাননের কথা উল্লেখ ছিল।

এরপর ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে মানুষ হতাহতের ঘটনা এবং আইডিএফের সেগুলো তদন্তের বিভিন্ন প্রতিবেদন খুঁজতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক একটি অনুসন্ধানব্যবস্থা তৈরি করা হয়।

প্রাথমিকভাবে প্রায় ৫ হাজার প্রতিবেদন পাওয়া যায়। বিবিসি ভেরিফাইয়ের সাংবাদিকেরা প্রতিটি প্রতিবেদন হাতে-কলমে যাচাই করেন এবং নির্ধারিত শর্ত পূরণ না করা প্রতিবেদন বাদ দেন।

এরপর ১ হাজার ৩৪৩টি প্রতিবেদন পাওয়া যায়, যেখানে আইডিএফ জানিয়েছিল—তারা সংশ্লিষ্ট ঘটনা খতিয়ে দেখছে। তবে এসব প্রতিবেদনের কয়েকটিতে একই ঘটনার বর্ণনা ছিল।

একই ঘটনা নিয়ে প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদন থাকলে তা বাদ দিতে আরেকটি এআই টুল তৈরি করা হয়। প্রকাশের তারিখ, ঘটনার তারিখ, স্থান ও নিহত বা আহত ব্যক্তির সংখ্যা বিবেচনায় নিয়ে প্রতিবেদনগুলোকে পৃথক ঘটনা হিসেবে ভাগ করা হয়।

এরপর সাংবাদিকেরা আবার যাচাই করে নিশ্চিত হন, প্রতিটি প্রতিবেদন সঠিক ঘটনার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। এভাবে মোট ৩০০টি পৃথক ঘটনার সন্ধান পাওয়া যায়।

প্রতিটি ঘটনার তারিখ, স্থান এবং হতাহত ব্যক্তির সংখ্যা মূল বিবিসি নিউজ বা রয়টার্সের প্রতিবেদনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়।

এরপর প্রতিটি ঘটনার বিবরণ, সংশ্লিষ্ট সংবাদ প্রতিবেদন এবং আইডিএফের আগের বক্তব্যসহ তথ্য ইসরায়েলের সেনাবাহিনীর কাছে পাঠানো হয়। প্রতিটি ঘটনার বিষয়ে মন্তব্য এবং তদন্তের সর্বশেষ অবস্থা জানতে চাওয়া হয়। তবে বিবিসির প্রশ্নের জবাবে—কোনো তদন্তের কাজ শেষ হয়েছে কি না, তা আইডিএফ জানায়নি।

প্রতিটি ঘটনার তদন্ত শেষ হয়েছে কি না, তা জানতে আইডিএফের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত বিবৃতিও খুঁজে দেখা হয়। এ জন্য দুটি এআই-সহায়তাপ্রাপ্ত ওয়েব অনুসন্ধানব্যবস্থা ব্যবহার করা হয়।

তদন্তের ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে অথবা আর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হবে না—এমন বক্তব্যের ভিত্তিতে ২৮টি ঘটনার তদন্ত শেষ হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়।

আরও ১৮টি ঘটনার ক্ষেত্রে তদন্ত শেষ হয়েছে কি না, সে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি। এর মধ্যে এমন কিছু ঘটনাও রয়েছে, যেগুলোর বিষয়ে আইডিএফ প্রাথমিক তথ্য প্রকাশ করলেও তদন্ত শেষ হওয়ার কথা জানায়নি।

আবার কিছু ঘটনায় নিহত বা আহত ব্যক্তিদের যোদ্ধা হিসেবে উল্লেখ করেছে আইডিএফ, তবে তদন্তের সমাপ্তি স্পষ্ট করেনি।

সব মিলিয়ে অন্তত ২৫৪টি ঘটনায় ইসরায়েলি সেনাবাহিনী তদন্তের কথা জানিয়েছিল, কিন্তু আইডিএফের ওয়েবসাইটে সেসব তদন্তের কোনো প্রকাশ্য ফলাফল খুঁজে পাওয়া যায়নি।

বিবিসি ভেরিফাই আরও জানিয়েছে, এটি পূর্ণাঙ্গ অনুসন্ধান নয়। ফলে তাদের অনুসন্ধানে ধরা পড়েনি, এমন আরও অনেক ফল অপ্রকাশিত তদন্ত থাকতে পারে।

Related Articles

Latest Posts