সাম্প্রতিক সময়ে ইরানকে পাশ কাটিয়ে হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রায় ৭০টি বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচলে সহায়তা করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মার্কিন কর্মকর্তার বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমস।
ওই কর্মকর্তা বলেন, গত তিন সপ্তাহে মার্কিন সামরিক বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ড (সেন্টকম) পারস্য উপসাগরে প্রবেশ ও সেখান থেকে বের হওয়া ৭০টি জাহাজকে হরমুজ প্রণালি অতিক্রমে সহায়তা করেছে।
মার্কিন কর্মকর্তারা জানান, নজরদারি এড়াতে অধিকাংশ জাহাজই চলাচলের সময় তাদের ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রেখেছিল। এ ধরনের যাত্রাকে বলা হয় ‘ডার্ক প্যাসেজ’।
কর্মকর্তারা কী ধরনের জাহাজ চলাচল করেছে বা কোন রুট ব্যবহার করা হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানাননি।
তবে একজন কর্মকর্তা ইঙ্গিত দেন, অন্তত একটি রুট ইরানের উপকূলের কাছাকাছি নয়।
মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, ইরানের অনুমতি ছাড়া দেশটির উপকূলসংলগ্ন এলাকায় চলাচলকারী জাহাজগুলো ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঝুঁকিতে থাকে।
শিপিং বিশ্লেষকদের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্রের নির্দেশনায় চলাচল করা জাহাজগুলো সম্ভবত ওমানের কাছাকাছি রুট ব্যবহার করছে।
নিউইয়র্ক টাইমস জানায়, ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার আগে প্রতিদিন ১০০টিরও বেশি বাণিজ্যিক জাহাজ এই প্রণালি ব্যবহার করত। সেই হিসাবে গত তিন সপ্তাহে গড়ে প্রতিদিন তিনটি যুক্তরাষ্ট্র-সমন্বিত যাত্রা বড় ধরনের পুনরুদ্ধারের ইঙ্গিত দেয় না।
এছাড়া ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রেখে এসব যাত্রা সম্পন্ন হওয়ায় প্রকৃত সংখ্যা স্বাধীনভাবে যাচাই করা কঠিন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, মার্কিন সহায়তায় জাহাজ চলাচল শুরু হওয়ায় বোঝা যাচ্ছে কিছু জাহাজমালিক আবার পারস্য উপসাগরে যেতে রাজি হচ্ছেন। এর আগে সংঘাতের কারণে অনেক জাহাজ সপ্তাহের পর সপ্তাহ আটকে থেকে বড় আর্থিক ক্ষতিতে পড়েছিল।
যেসব জাহাজমালিক ইরানকে অনুমতি ফি বা টোল দিতে রাজি নন, তাদের জন্য মার্কিন-সমন্বিত এই রুটটি একটি ভালো বিকল্প।
গত সপ্তাহে মার্কিন কর্মকর্তারা বলেছিলেন, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি চুক্তির কাছাকাছি পৌঁছেছে, যা প্রণালিটি পুনরায় খুলে দিতে পারে। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেলের ২০ শতাংশ এবং উল্লেখযোগ্য পরিমাণ প্রাকৃতিক গ্যাস এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হতো।
তবে রোববার মার্কিন কর্মকর্তারা জানান, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্ভাব্য চুক্তির শর্ত আরও কঠোর করেছেন।
মে-র শুরুতে ট্রাম্প ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ নামে একটি বড় সামরিক অভিযান ঘোষণা করেছিলেন, যার লক্ষ্য ছিল জাহাজগুলোকে নিরাপদে প্রণালি অতিক্রমে সহায়তা করা। তবে সৌদি আরবের আপত্তিসহ বিভিন্ন কারণে দ্রুতই সেই পরিকল্পনা স্থগিত করা হয়।
এরপর থেকে সেন্টকম জাহাজগুলোকে এই রুট ব্যবহার করতে উৎসাহ দিলেও সরাসরি নৌ-নিরাপত্তা বহর দিচ্ছে না।
শনিবার এক বিবৃতিতে সেন্টকমের মুখপাত্র ক্যাপ্টেন টিম হকিন্স বলেন, মার্কিন বাহিনী সরাসরি নিরাপত্তা বহর দিচ্ছে না। তবে হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদ ও অবাধে চলাচল করতে আগ্রহী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর সঙ্গে আমরা নিয়মিত যোগাযোগ ও সমন্বয় করছি।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের নির্দেশিত রুট ব্যবহারকারী জাহাজগুলো এখনো ইরানের হামলার ঝুঁকিতে রয়েছে। কারণ তেহরান এই জলপথকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণাধীন বলে দাবি করে।
যেসব জাহাজমালিক ইরানকে অনুমতি ফি বা টোল দিতে রাজি নন, তাদের জন্য মার্কিন-সমন্বিত এই রুটটি একটি ভালো বিকল্প।
প্রতিবেদনে বলা হয়, এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দর ব্যবহারকারী জাহাজগুলোর বিরুদ্ধে অবরোধ কার্যক্রম শুরু করে।
সেন্টকমের তথ্য অনুযায়ী, ওমান উপসাগরে পরিচালিত ওই অভিযানে এখন পর্যন্ত ১১৬টি জাহাজকে অন্য পথে পাঠানো হয়েছে। এর ফলে ইরানের তেল রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে ব্যাহত হয়েছে।
তবে হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের প্রভাব এখনো শক্তিশালী। অনেক জাহাজ এখনো ইরানের উপকূলঘেঁষা রুট ব্যবহার করছে, যা ইঙ্গিত দেয় যে বিভিন্ন জাহাজমালিক ও সরকার তেহরানের সঙ্গে সমন্বয় করেই যাত্রা পরিচালনা করছে।
সামুদ্রিক তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ক্লেপলারের তথ্য অনুযায়ী, ১ মার্চ থেকে ১৯ মে পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি দিয়ে মোট ৮৯৫টি যাত্রার মধ্যে অর্ধেকের কিছু বেশি ইরান-নিয়ন্ত্রিত রুট ব্যবহার করেছে। আর প্রায় ৪০ শতাংশ যাত্রা হয়েছে অজানা বা ‘ডার্ক’ রুটে।
