অবহেলা-অযত্নে ধ্বংসের মুখে কুমিল্লার শতবর্ষী রামমালা লাইব্রেরি

কুমিল্লার শতবর্ষী রামমালা লাইব্রেরি অবহেলা ও অযত্নে ধ্বংসের মুখে পড়েছে। এখানে সংরক্ষিত রয়েছে হাজারো প্রাচীন পাণ্ডুলিপি ও বিরল গ্রন্থ। তবে যথাযথ সংরক্ষণ উদ্যোগের অভাবে এর অমূল্য সংগ্রহ ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

দেশের অন্যতম প্রাচীন এ গ্রন্থাগারটি ১৯১২ সালে কুমিল্লা শহরের উপকণ্ঠে মহেশাঙ্গনে প্রতিষ্ঠিত হয়।

লাইব্রেরিটিতে সাহিত্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ভূগোল, দর্শন ও ধর্মসহ নানা বিষয়ে প্রায় ১২ হাজার বই সংরক্ষিত রয়েছে। পাশাপাশি মধ্যযুগ ও আধুনিক যুগের শুরুর সময়কাল (প্রায় ১৭০০ থেকে ১৯০০ খ্রিষ্টাব্দ) সম্পর্কিত ৮ হাজারেরও বেশি হাতে লেখা পুঁথি আছে।

একসময় গবেষণার প্রয়োজনে দেশের নানা প্রান্ত থেকে গবেষকরা এ লাইব্রেরিতে আসতেন। কিন্তু বর্তমানে অবহেলা ও অযত্নে গ্রন্থাগারটির অবস্থা অত্যন্ত নাজুক হয়ে পড়েছে।

 

স্থানীয় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আহসানুল কবির দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, রামমালা লাইব্রেরি ও মহেশাঙ্গন একসময় পূর্ববঙ্গের শান্তিনিকেতন হিসেবে পরিচিত ছিল। এখানে বিরল ও অমূল্য বই ও পাণ্ডুলিপির বিশাল সংগ্রহ রয়েছে। এগুলো যেকোনো মূল্যে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, বিশিষ্ট গবেষক ড. রসমোহন চট্টোপাধ্যায়ের মৃত্যুর পর ১৯৮২ সাল থেকেই লাইব্রেরিটির ধীরে ধীরে অবক্ষয় শুরু হয়। পরে ২০২২ সালে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ইন্দুকুমার সিংহের মৃত্যুর পর থেকে এটি কার্যত বন্ধ রয়েছে। ফলে দুর্লভ সংগ্রহগুলো এখন ধুলায় ঢেকে ধ্বংসের পথে যাচ্ছে।

বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও দানবীর মহেশচন্দ্র ভট্টাচার্য ১৯১২ সালে তার মা রামমালা দেবীর স্মৃতিতে এ লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করেন।

তিনি ১৯১৪ সালে বাবা ঈশ্বরচন্দ্র তর্কসিদ্ধান্তের স্মরণে ঈশ্বর পাঠশালা, ১৯১৬ সালে ছাত্রদের
জন্য রামমালা হোস্টেল ও ১৯১৯ সালে ছাত্রীদের জন্য নিবেদিতা বালিকা হোস্টেল প্রতিষ্ঠা করেন।

মহেশচন্দ্র ভট্টাচার্য ১৯৪৪ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি বারাণসীতে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর আগে তিনি তার প্রতিষ্ঠিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য মহেশ চ্যারিটেবল ট্রাস্ট গঠন করেন।

লাইব্রেরির সম্প্রসারণে ড. রসমোহন চট্টোপাধ্যায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। মহেশচন্দ্রের অর্থায়ন ও রাসমোহনের আন্তরিক প্রচেষ্টায় এটি প্রাচীন পাণ্ডুলিপি গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। সেসময় স্থানীয়রা তাদের সংগ্রহের পাণ্ডুলিপি এখানে দান করেছিলেন।

১৯২৬ সালে রামমালা হোস্টেলের শিক্ষার্থীরা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে সংবর্ধনা দেন। এছাড়া মহাত্মা গান্ধী, সুভাষচন্দ্র বসুসহ উপমহাদেশের বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি লাইব্রেরিটি পরিদর্শন করেছেন।

বর্তমানে লাইব্রেরির পাণ্ডুলিপি বিভাগে সনাতন ধর্ম ও দর্শন সম্পর্কিত ৮ হাজারেরও বেশি প্রাচীন হাতে লেখা পুঁথি সংরক্ষিত রয়েছে। এসবের মধ্যে রয়েছে—বেদ, কাব্য, ব্যাকরণ, জ্যোতিষশাস্ত্র, ইতিহাস, পুরাণ, ধর্মগ্রন্থ, রামায়ণ, মহাভারত, সত্যনারায়ণ পাঁচালী, সত্যপীরের পুঁথি, শনির পাঁচালী ইত্যাদি।

সংস্কৃত ও বাংলা ভাষায় লেখা এসব পাণ্ডুলিপি তালপাতা, ভূর্জপত্র ও তুলট কাগজে রচিত। ত্রিপুরা, কুমিল্লা, নোয়াখালী ও সিলেটসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এগুলো সংগ্রহ করা হয়েছে।

 

সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা গেছে, পাণ্ডুলিপিগুলো ধুলা-বালিতে আচ্ছন্ন ও জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে রয়েছে।

মহেশ চ্যারিটেবল ট্রাস্টের চেয়ারম্যান আইনজীবী সরোজেন্দু রায় কানু ডেইলি স্টার বলেন, রামমালা লাইব্রেরির প্রায় ২ হাজার ৫০০ পাণ্ডুলিপি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাইক্রোফিল্ম আকারে সংরক্ষিত আছে বলে শুনেছি। কিন্তু সেগুলো বর্তমানে কোথায় ও কী অবস্থায় রয়েছে? কিংবা সেগুলো নিয়ে কোনো গবেষণা চলছে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য নেই।

রামমালা হোস্টেলের তত্ত্বাবধায়ক কমল চক্রবর্তী বলেন, শুক্রবার ও সরকারি ছুটির দিন ছাড়া প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত যে কেউ লাইব্রেরিতে প্রবেশ করতে পারেন।

সরোজেন্দু রায় বলেন, লাইব্রেরির দেখভালের জন্য একজন গ্রন্থাগারিক নিয়োগের চেষ্টা চলছে। কিন্তু ট্রাস্টের পক্ষে সংস্কার ও উন্নয়নের ব্যয় বহন করা সম্ভব নয়। সরকার যদি এই অমূল্য সম্পদ সংরক্ষণ, উন্নয়ন এবং একটি জাদুঘর নির্মাণে উদ্যোগ নেয়, আমরা তাহলে স্বাগত জানাব।

তিনি আরও বলেন, তবে এটি অবশ্যই কুমিল্লাতেই করতে হবে। কারণ রামমালা লাইব্রেরি কুমিল্লার ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

Related Articles

Latest Posts