সাফ নারী চ্যাম্পিয়নশিপে টানা তৃতীয়বারের মতো ফাইনালে উঠেছে বাংলাদেশ। তবে এবারের যাত্রা আগের দুই আসরের মতো দাপুটে ছিল না। মাঠের পারফরম্যান্স নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, সমর্থকদের প্রত্যাশাও পূরণ করতে পারেনি লাল-সবুজের মেয়েরা। তবুও প্রধান কোচ পিটার বাটলারের চোখে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় একটাই, ফাইনালে পৌঁছানো।
নেপালকে কঠিন লড়াইয়ে হারিয়ে ফাইনাল নিশ্চিত করার পর বাটলার স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন, ফুটবলে সবসময় সুন্দর খেলা নয়, ফলটাই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়।
সংবাদমাধ্যমকে তিনি বলেন, ‘আমরা ফাইনালে উঠেছি। ফুটবলে কখন কী হবে, তা বলা যায় না। অনেক সময় আপনি দুর্দান্ত ফাইনাল খেলেও হারতে পারেন। আবার খারাপ খেলেও জিততে পারেন। আমি প্রায়ই বলি, বিষয়টা আপনি কীভাবে খেললেন সেটা নয়, বরং কীভাবে কাজটা সম্পন্ন করলেন সেটাই আসল।’
নেপালকে হারানোর পর বাংলাদেশ দলের মধ্যে আত্মবিশ্বাস ফিরে এসেছে বলেই মনে হচ্ছে। ভারতের বিপক্ষে ৩-০ গোলের হতাশাজনক হারের পর যে চাপ তৈরি হয়েছিল, সেমিফাইনাল জয়ের পর তার অনেকটাই কেটে গেছে। এখন ইতিহাস গড়ে টানা তৃতীয় সাফ শিরোপা জয়ের স্বপ্ন থেকে মাত্র এক ধাপ দূরে দাঁড়িয়ে আছে মারিয়া মান্দাদের দল।
বাংলাদেশ নিজেরাই নিজেদের জন্য প্রত্যাশার মান অনেক উঁচুতে তুলে দিয়েছে। টানা দুইবার সাফ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পাশাপাশি এএফসি নারী এশিয়ান কাপে জায়গা করে নিয়ে চীন, উত্তর কোরিয়া ও উজবেকিস্তানের মতো দলের বিপক্ষেও লড়াকু পারফরম্যান্স দেখিয়েছে তারা।
কিন্তু গোয়ায় অনুষ্ঠিত এবারের আসরে সেই মানের ধারেকাছেও যেতে পারেনি দলটি। বিশেষ করে রক্ষণভাগ ও মাঝমাঠে ভুগতে হয়েছে বাংলাদেশকে। আগের মতো বেঞ্চে পর্যাপ্ত বিকল্প না থাকায় বাটলারও কৌশলগত পরিবর্তনের সুযোগ কম পেয়েছেন।
মাঝমাঠে এই সমস্যাটা সবচেয়ে বেশি চোখে পড়েছে। মারিয়া মান্দা ও মনিকা চাকমা একসঙ্গে খেললে বাংলাদেশ বরাবরই ছন্দে থাকে। অতীতে উমেহলা মারমা, স্বপ্না রানী কিংবা মুনকি আক্তারের মতো খেলোয়াড়দের সহায়তায় মাঝমাঠে আধিপত্যও দেখিয়েছে দলটি। কিন্তু এবার প্রায় একাই দায়িত্ব টানতে হচ্ছে মারিয়াকে। চোটের কারণে মনিকা পুরোপুরি ফিট নন, আর স্বপ্না ও মুনকি স্কোয়াডেই নেই।
গুরুত্বপূর্ণ উইঙ্গার ঋতুপর্ণা চাকমাও নিজের সেরা ছন্দে নেই। যদিও তার একটি গুরুত্বপূর্ণ গোলই বাংলাদেশকে সেমিফাইনালে তুলতে বড় ভূমিকা রেখেছে।
তবে বাটলারের মতে, বর্তমান সময়টা আসলে নতুন প্রজন্ম গড়ে তোলার একটি পর্যায়। ৫৯ বছর বয়সী এই কোচ বলেন, ‘কিছু খেলোয়াড় তাদের ক্যারিয়ারের শেষ দিকে, আবার কিছু নতুন করে শুরু করছে। প্রতিপক্ষের তুলনায় আমাদের দলে অনেক কম বয়সী খেলোয়াড় রয়েছে। এই দলে অনেক ১৮ বছর বয়সী ফুটবলার আছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে চাই। আমি শুধু অভিজ্ঞদের ওপর নির্ভর করছি না, বরং তরুণদের সুযোগ দিচ্ছি যাতে ভবিষ্যতের জন্য শক্তিশালী একটি দল তৈরি হয়।’
২০২৫ সালের শুরুতে দলীয় অস্থিরতার পর কয়েকজন সিনিয়র খেলোয়াড়কে বাদ দিয়েছিলেন বাটলার। পাশাপাশি ফর্মহীনতার কারণে স্কোয়াডে জায়গা হয়নি স্বপ্না রানী ও মুনকি আক্তারেরও। ফলে নিজের সেরা একাদশ খুঁজে পেতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে তাকে।
চোটও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মনিকা চাকমা, শিউলি আজিম ও শামসুন্নাহার জুনিয়রের শারীরিক সমস্যা, সঙ্গে ঋতুপর্ণার ফর্মহীনতা মিলিয়ে বিকল্পের সংখ্যা অনেক কমে গেছে।
নেপালের বিপক্ষে সেমিফাইনাল ম্যাচেই সেই সমস্যার প্রতিফলন দেখা গেছে। বাটলার শুরুর একাদশে তিনটি পরিবর্তন আনলেও প্রথম ৪০ মিনিটের মধ্যেই তাদের মধ্যে দুজনকে বদলি করতে হয়। দ্বিতীয়ার্ধে বদলি হিসেবে নামা মনিকা আবার নতুন করে চোট পাওয়ায় আরও একটি পরিবর্তন করতে বাধ্য হন তিনি।
রক্ষণভাগেও গভীরতার অভাব স্পষ্ট। শামসুন্নাহার সিনিয়র, আফঈদা খন্দকার, কোহাতি কিসকু কিংবা সুরভী আক্তার আরফিনের বিকল্প প্রায় নেই বললেই চলে। ভারতের বিপক্ষে আফঈদার জায়গায় খেলা সুরমা জান্নাতের দেওয়া পেনাল্টিই সেই সংকটের বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছে।
আফঈদাকে ভারতের বিপক্ষে একাদশের বাইরে রাখার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বাটলার বলেন, ‘আমি কোনো দানব নই। কাউকে বিনা কারণে বাদ দিই না। এর পেছনে সবসময় একটা কারণ থাকে। অনেক সময় কম খেললে একজন খেলোয়াড় আরও ভালোভাবে ফিরে আসে।’
এখন বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ভারত। ৬ জুনের ফাইনালে স্বাগতিকরা স্পষ্টতই ফেবারিট, বিশেষ করে গ্রুপপর্বে তারা বাংলাদেশকে ৩-০ গোলে হারিয়েছে।
