পদ্মা রেলসেতুর নিচের মাটি কাটা নিয়ে যা জানা গেল

নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার আলীগঞ্জে পদ্মা রেল-সংযোগ সেতুর পিলারের নিচে অন্তত ১৫ ফুট গভীর করে মাটি কেটে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। গত কয়েকদিন ধরেই এ কার্যক্রম চলছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

মাটি কেটে নেওয়ার ঘটনায় স্থানীয়দের বাধা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার পর নড়েচড়ে বসেছে স্থানীয় প্রশাসন।

রেল মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের দাবি, প্রকল্পের অংশ হিসেবে চায়নার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মাটি কাটা হচ্ছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রকল্পের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হিসেবে এ কাজের তদারকি করছে।

জেলা প্রশাসন বলছে, মাটি কাটার বিষয়ে আগে জানানো হয়নি। যদিও যেকোনো প্রকল্পের কাজ করতে গেলে স্থানীয় প্রশাসনকে অবহিত করাই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।

প্রকল্পের কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করার আগ পর্যন্ত মাটি কাটার এ কার্যক্রম আপাতত বন্ধ করে দিয়েছেন তারা।

প্রশাসনের ভাষ্য, গত শনিবার নারায়ণগঞ্জ সদরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এসএম ফয়েজ উদ্দিনের নির্দেশে ফতুল্লা সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) আসাদুজ্জামান নূর ও অন্যান্য প্রশাসনিক কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে মাটি কাটার কাজ বন্ধ করে দেন।

স্থানীয়রা বলছেন, গতকাল সোমবার রাত ও আজ সকালেও পিলারের নিচে মাটি কাটা হয়েছে। কেটে নেওয়া মাটি স্থানীয় ইটভাটায় বিক্রির অভিযোগও তুলেছেন স্থানীয়রা। মাটি কাটার কাজে স্থানীয় বিএনপির নেতারা জড়িত আছেন বলে অভিযোগ তাদের।

ফতুল্লা থানা বিএনপির সভাপতি শহিদুল ইসলাম টিটু এ অভিযোগ অস্বীকার করে দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘এ কাজ প্রকল্পের অংশ হিসেবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজনই করছেন। দলীয় লোকজনের এ কাজে কোনো সম্পৃক্ততা নেই।’

সোমবার ও মঙ্গলবার সরেজমিনে দেখা যায়, পদ্মা রেল-সংযোগ সেতুর ৮৪ থেকে ৯১ নম্বর পিলারের পাশের অন্তত ১৫ ফুট জায়গায় মাটি কাটা হয়েছে। সেতুটির এই অংশের পাশে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ (পঞ্চবটি-পোস্তগোলা) পুরাতন সড়ক।

কেটে নেওয়ায় সেতুর নিচে পিলারের অংশের মাটি নিচু হয়ে গেছে। এসব জায়গায় বড় গর্ত তৈরি হওয়ায় সেখানে বৃষ্টির পানিও জমেছে। এতে সেতুর পিলার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে শঙ্কার কথা জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

অর্ধচন্দ্রাকৃতির এই সেতুর আরেক অংশ ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ পুরাতন সড়কের পশ্চিম পাশে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে। তবে সেখানে মাটি কাটা হয়নি।

ওই জায়গাটিও সড়কের সমান্তরাল উচ্চতায়। সেতুর আশেপাশে বেশকিছু নির্মাণ সামগ্রী বিক্রির মোকাম ও ইটভাটা রয়েছে।

গত দুদিনে স্থানীয় বাসিন্দা, প্রশাসন ও পদ্মা সেতু রেল-সংযোগ প্রকল্পের অন্তত ২০ জনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এক বছর আগেও এই সংযোগ সেতুর পিলারের মাটি কাটার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সেসময় স্থানীয়দের বাধার মুখে তা বন্ধ করা হয়।

মাসখানেক আগে নতুন করে মাটি কাটার কাজ শুরু হয়। স্থানীয়রা বাধা দিলেও সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে মাটি কাটা শুরু হয়।

রেলসেতুর পাশে একটি সিমেন্ট কারখানায় কাজ করেন বগুড়া জেলার বাসিন্দা মো. আমিনুর। গত একমাসের বেশি সময় ধরে রেল সংযোগ সেতুর নিচে পিলার ঘেঁষে মাটি কাটতে দেখছেন তিনি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় এক ব্যবসায়ী দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘সেতুর নিচে মাটি কাটা হলে পিলার দুর্বল হয়ে যেতে পারে ভেবে লোকজন প্রথমেই বাধা দিয়েছিল। কোরবানির ঈদের আগে আবার কাজ ধরলে এলাকাবাসী পুনরায় বাধা দেয়। সেসময় সেনাবাহিনী ও রেল-পুলিশ ইমরান নামে একজনকে আটক করে নিয়ে যায়। পরে মুচলেকায় তাকে ছাড়া হয়।’

ইমরান ও তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে এ বিষয়ে তারা গণমাধ্যমে কথা বলতে চাননি। তাদের পরিবারের এক সদস্য দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘এলাকার লোকজন ব্রিজটি ঝুঁকিতে পড়বে ভেবে বাধা দিয়েছিল। কিন্তু আমরা ঝামেলায় পড়েছি। আবার কথা বলে ঝামেলায় পড়তে চাই না।’

আলীগঞ্জের বাসিন্দা মোসলেহ উদ্দিন সজল বলেন, ‘পিলারের নিচে মাটি কাটলে ঝুঁকি তৈরি হবে। সরকারি লোকজন এ কাজ করলে আমাদের কিছু বলার থাকে না।’

যোগাযোগ করা হলে রেল সংযোগ প্রকল্পের কর্মকর্তা রেলওয়ের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (ট্র্যাক অ্যান্ড ওয়ার্কস) আবু ইউসুফ মোহাম্মদ শামীম বলেন, ‘এ প্রকল্প এলাকাটিতে নিচু জমি ও জলাশয় ছিল। প্রকল্পের কাজের সময় নিজ উদ্যোগে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মাটি-বালু ফেলে ভরাট করেছিল। এজন্য তাকে কোনো পেমেন্টও করা হয়নি। চুক্তি অনুযায়ী বলা আছে, প্রকল্প সাইটটিকে রি-স্টোরেশন করতে হবে। মানে, আগে যেমন ছিল এলাকাটিকে তেমনই রাখতে হবে। তার অংশ হিসেবে মাটি কাটা হচ্ছে। অবশ্যই সেফটি নিশ্চিত করেই এ কাজটি করতে হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের কনসালট্যান্ট বাংলাদেশ আর্মি। তাদের তত্ত্বাবধানেই ওইদিকের সাইটটি আগের মতো করা হচ্ছে। আগে কেমন ছিল তার ডেটা আমাদের কাছে আছে। সে অনুসারেই কাজ করার কথা। ঠিকাদার যেন বেশি কিছু না করে, সেজন্য আর্মি তত্ত্বাবধানে আছে।’

প্রকৌশলী শামীম আরও বলেন, ‘কাজটি পেয়েছে প্রকল্পের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না রেলওয়ে গ্রুপ লিমিটেড। কিন্তু তারা হয়তো মাটি কাটার কাজটি অন্য কাউকে দিয়ে করাচ্ছে।’

২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত এ প্রকল্পের মেয়াদ রয়েছে বলেও জানান তিনি।

জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘রেল সেতুর পিলারের নিচে মাটি কাটার বিষয়টি নজরে আসার পরই ইউএনও ও এসিল্যান্ডকে সেখানে পাঠানো হয়। স্থানীয়ভাবে যেকোনো প্রকল্পের কাজ করার সময় স্থানীয় প্রশাসনকে জানানো নিয়ম। কিন্তু এ ক্ষেত্রে তা তারা করেননি।’

তিনি বলেন, ‘আমরা জেনেছি এটি তাদের প্রকল্পের অংশ। আমরা তাদের কাছে কাগজপত্র চেয়েছি। আপাতত কাজটি বন্ধ রয়েছে।’

মঙ্গলবার দুপুরে আবারও প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনে যান ইউএনও ফয়েজ উদ্দিন।

এ সময় তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি দেখেই এসিল্যান্ডকে পাঠাই এবং কাজটি বন্ধ দেই। পরে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজন কিছু কাগজপত্র দেখান, কিন্তু তাতে আমরা স্থানীয় প্রশাসন সন্তুষ্ট হইনি। আমরা বিষয়টি মন্ত্রণালয়কে অবহিত করেছি, শিগগির এ নিয়ে সিদ্ধান্ত আসবে।’

Related Articles

Latest Posts