জেন্ডার বাজেট বাড়লেও নারীর ক্ষমতায়নে বরাদ্দ কম

২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য সরকার ৩ লাখ ২৬ হাজার ৫৯ কোটি ৮০ লাখ টাকার জেন্ডার-সংবেদনশীল বাজেট প্রস্তাব করেছে। এটি মোট জাতীয় বাজেটের ৩৪ দশমিক ৮ শতাংশ এবং দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৪ দশমিক ৮ শতাংশের সমান। অর্থ বিভাগের জেন্ডার বাজেটিং কাঠামোর আওতায় ৬১টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের ব্যয় বিশ্লেষণ করে এই হিসাব করা হয়েছে।

গত অর্থবছরে জেন্ডার-সংশ্লিষ্ট ব্যয় ছিল ২ লাখ ৬৪ হাজার ৭১৮ কোটি ৬০ লাখ টাকা, যা মোট বাজেটের ৩৩ দশমিক ৫ শতাংশ এবং জিডিপির ৪ দশমিক ২ শতাংশ ছিল। ফলে চলতি প্রস্তাবিত বাজেটে জেন্ডার বরাদ্দের পরিমাণ বেড়েছে।

তবে অর্থনীতিবিদ ও জেন্ডার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কাগজে-কলমে বরাদ্দ বাড়লেও নারীর ক্ষমতায়নের জন্য সরাসরি দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর তহবিল এখনো দুর্বল রয়ে গেছে। ফলে বাজেটের আকার বড় হলেও বাস্তব সুফল কতটা মিলবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জন্য ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৫ হাজার ১৯৬ কোটি টাকা বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের ৫ হাজার ৩৭১ কোটি টাকার চেয়ে কম।

মন্ত্রণালয়টির মোট ব্যয়ের ৯৪ দশমিক ৭ শতাংশকে জেন্ডার-সংশ্লিষ্ট ব্যয় হিসেবে ধরা হলেও এর প্রায় ৯২ শতাংশই কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও প্রশাসনিক খাতে ব্যয় হবে। ফলে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের জন্য অবশিষ্ট থাকবে মাত্র ৪২৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এর মধ্যেও মাত্র ৫৭ দশমিক ৪ শতাংশ অর্থ সরাসরি জেন্ডারভিত্তিক কর্মসূচিতে ব্যয় হবে।

কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা

অর্থ বিভাগের জেন্ডার বাজেট প্রতিবেদনে ব্যয়কে চারটি কৌশলগত থিমে ভাগ করা হয়েছে।

নারীর ক্ষমতায়ন ও সামাজিক মর্যাদাসংক্রান্ত প্রথম থিমে বরাদ্দ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৩ হাজার ৭৬ কোটি ৯০ লাখ টাকা, যা মোট জেন্ডার বাজেটের ২৫ দশমিক ৫ শতাংশ।

অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ ও সমতার ওপর ভিত্তি করে গঠিত দ্বিতীয় থিমে সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এ খাতে বরাদ্দ ১ লাখ ৩ হাজার ৭৩৮ কোটি ৭০ লাখ টাকা, যা মোট জেন্ডার বাজেটের ৩১ দশমিক ৮ শতাংশ।

নারীদের সরকারি সেবায় প্রবেশাধিকারসংক্রান্ত তৃতীয় থিমে বরাদ্দ কমে ৩৪ হাজার ৪৩৯ কোটি ২০ লাখ টাকায় নেমেছে।

অন্যদিকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নারীর সামগ্রিক কল্যাণসংক্রান্ত চতুর্থ থিম সবচেয়ে বড় খাত হিসেবে রয়ে গেছে। এতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ লাখ ৪ হাজার ৮০৪ কোটি ৯০ লাখ টাকা, যা মোট জেন্ডার বাজেটের ৩২ দশমিক ১ শতাংশ।

দীর্ঘমেয়াদি মানবসম্পদ উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় ও বিভাগে জেন্ডার বরাদ্দের অনুপাত কমেছে।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জেন্ডার-সংশ্লিষ্ট ব্যয়ের হার ৬৭ শতাংশ থেকে কমে ৫৯ দশমিক ৩ শতাংশ হয়েছে।  মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগে তা ৪৮ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে কমে ৪৬ দশমিক ৪ শতাংশে নেমেছে।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগে জেন্ডার বরাদ্দের হার ৩৬ দশমিক ৯ শতাংশ থেকে প্রায় ৩৩ শতাংশে নেমেছে। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে এ হার ৪৫ দশমিক ২ শতাংশ থেকে কমে ৪০ দশমিক ৮ শতাংশ হয়েছে।

‘জেন্ডার বাজেট নারীদের জন্য আলাদা তহবিল নয়’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সায়েমা হক বিদিশা বলেন, জেন্ডার বাজেট মানে নারীদের জন্য আলাদা কোনো তহবিল নয়। এটি হলো সরকারের বর্তমান খরচের একটি হিসাব মাত্র।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, পরিচালন ব্যয়ের ক্ষেত্রে নারী কর্মীর অনুপাত বিবেচনা করা হয়। আর উন্নয়ন প্রকল্পগুলোকে অর্থ মন্ত্রণালয় শূন্য থেকে ১০০ নম্বরের মধ্যে মূল্যায়ন করে। পরে রিকারেন্ট, ক্যাপিটাল, জেন্ডার অ্যান্ড পোভার্টি (আরসিজিপি) মডেলের মাধ্যমে চূড়ান্ত হিসাব নির্ধারণ করা হয়।

তিনি বলেন, বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণকারী মন্ত্রণালয়গুলো বিপুল অর্থ বরাদ্দ পেলেও তাদের প্রকল্পে প্রায়ই নারীকেন্দ্রিক কার্যক্রম থাকে না। ফলে সামগ্রিক জেন্ডার বাজেট বড় দেখালেও নারী-সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো তুলনামূলকভাবে কম অর্থ পায়। নারীর ক্ষমতায়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রণালয় যদি উন্নয়নমূলক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত অর্থ না পায়, তাহলে বাস্তব অগ্রগতি অর্জন কঠিন হয়ে পড়ে।

অধ্যাপক বিদিশার মতে, শুধু নারী-সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না; একই সঙ্গে একনেক অনুমোদিত বড় অবকাঠামো প্রকল্পগুলোতেও জেন্ডার উপাদান বাধ্যতামূলকভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

তিনি স্কুলে পৃথক স্যানিটেশন ব্যবস্থা, মাসিক স্বাস্থ্যবিধি সুবিধা, ছাত্রীদের নিরাপদ পরিবহন ও নারীবান্ধব অবকাঠামো নির্মাণের মতো উদ্যোগের উদাহরণ তুলে ধরেন।

তার ভাষায়, জেন্ডার বাজেটের কার্যকারিতা এর আকার দিয়ে নয়, বরং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা-৫ অনুযায়ী নারী-পুরুষের প্রকৃত সমতা কতটা নিশ্চিত করতে পারছে, তা দিয়ে বিচার করা উচিত।

জীবনযাত্রার ব্যয় মোকাবিলা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে বাজেটে কয়েকটি সামাজিক সুরক্ষা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এর মধ্যে সবচেয়ে বড় কর্মসূচি হলো ‘ফ্যামিলি কার্ড’ প্রকল্প, যার জন্য ১৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর আওতায় ৪১ লাখ নারীপ্রধান পরিবার প্রতি মাসে সর্বোচ্চ ২ হাজার ৫০০ টাকা আর্থিক সহায়তা পাবে।

এ ছাড়া মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচির আওতায় ১৮ লাখ ৯৫ হাজার মা ও শিশু প্রতি মাসে ৮৫০ টাকা করে সহায়তা পাবেন।

বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘের পরিচালক শাহনাজ সুমি বলেন, ভাতা তাৎক্ষণিক সহায়তা দিলেও তা নারীর দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করে না। এ জন্য কল্যাণভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তে অধিকারভিত্তিক নীতি প্রয়োজন।

তবে অধ্যাপক বিদিশা মনে করেন, নারীদের হাতে সরাসরি অর্থ পৌঁছানো বা তাদের নিজস্ব ব্যাংক হিসাবে অর্থ স্থানান্তর পারিবারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের অবস্থান শক্তিশালী করতে পারে।

নারী উদ্যোক্তা ও কর্মসংস্থান 

নারীদের করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪ লাখ ২৫ হাজার টাকা করা হয়েছে। নারী উদ্যোক্তা ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য করমুক্ত টার্নওভারের সীমাও ৫০ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭০ লাখ টাকা করা হয়েছে।

তবে অধ্যাপক বিদিশা বলেন, গ্রামীণ নারী উদ্যোক্তারা এখনো তথ্যের অভাবে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতের বিভিন্ন প্রণোদনা ও সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

তিনি ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারগুলোতে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ বিনিয়োগ সহায়তা ডেস্ক স্থাপনের পরামর্শ দেন। তার মতে, এসব ডেস্কে নারী কর্মী থাকলে সেবাগ্রহণ সহজ হবে ও আস্থা বাড়বে।

নারীদের কর্মসংস্থানে অংশগ্রহণ বাড়াতে প্রথম ধাপে ২০টি আধুনিক ডে-কেয়ার সেন্টার (শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র) স্থাপনের প্রস্তাব করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে আরও ৬০টি কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।

এ ছাড়া নারীদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে নারী পরিচালিত ‘পিংক বাস সার্ভিস’ চালুর প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

অধ্যাপক বিদিশা এসব উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও বলেন, শিশুর যত্ন ও নিরাপত্তা এখনো নারীদের শ্রমবাজারে প্রবেশ ও টিকে থাকার সবচেয়ে বড় দুটি বাধা। তাই বিচ্ছিন্ন সরকারি উদ্যোগের পরিবর্তে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের ভিত্তিতে সম্প্রদায়ভিত্তিক ডে-কেয়ার ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।

বাজেটে দেশব্যাপী ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনাও রয়েছে, যার ৮০ শতাংশ পদ নারীদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে। এতে নারীদের আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের সুযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ফওজিয়া মোসলেম বলেন, জেন্ডার বাজেট কার্যকর করতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় ও স্বাধীন পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি।

তার মতে, বাল্যবিয়ে ও নারীর প্রতি সহিংসতা রোধের অনেক উদ্যোগ সমন্বয়ের অভাব, আইনি দুর্বলতা ও জবাবদিহিতার ঘাটতির কারণে কাঙ্ক্ষিত ফল দেয় না।

তিনি বলেন, এই জেন্ডার বাজেট বাস্তবে নারী-পুরুষ বৈষম্য কতটা কমাতে পারে, তা এখন দেখার বিষয়। বাজেট বাস্তবায়নের ফলাফল মূল্যায়নে মন্ত্রণালয়ের বাইরের বিশেষজ্ঞদেরও যুক্ত করা প্রয়োজন।

 

Related Articles

Latest Posts