মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবিতে তিস্তাপাড়ে মশাল মিছিল

ভূ-রাজনৈতিক জটিলতার অজুহাত না দেখিয়ে নিজস্ব অর্থায়নে দ্রুত তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবিতে রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার চর মহিপুরে গণসমাবেশ ও মশাল প্রজ্বালন কর্মসূচি পালন করেছে ‘তিস্তা বাঁচাও, নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদ’।

গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় সমাবেশে অংশ নেন তিস্তা অববাহিকার বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা কয়েক হাজার মানুষ। পরে সমাবেশ থেকে একটি বিশাল মশাল মিছিল বের করা হয়। মিছিলে ‘তিস্তা বাঁচাও, মানুষ বাঁচাও’, ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা চাই’, ‘ আশ্বাস নয়, বাস্তবায়ন চাই’– স্লোগান দেন অংশগ্রহণকারীরা।

সমাবেশে বক্তব্য দেন সংগঠনের সভাপতি অধ্যক্ষ নজরুল ইসলাম হক্কানী, সাধারণ সম্পাদক শফিয়ার রহমান এবং নদীভাঙন ও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত স্থানীয় বাসিন্দারা।

বক্তারা বলেন, তিস্তা এখন শুধু একটি নদীর নাম নয়, এটি উত্তরাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, সংগ্রাম ও প্রত্যাশার প্রতীক। বর্ষা মৌসুমে উজান থেকে নেমে আসা ঢল ও অতিবৃষ্টির কারণে এই নদী ভয়ংকর রূপ ধারণ করে।

তারা বলেন, নদীভাঙনে প্রতিবছর শত শত পরিবার গৃহহারা হয়, বিলীন হয়ে যায় আবাদি জমি, রাস্তা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বসতভিটা। আবার শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় কৃষি উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। একদিকে বন্যা, অন্যদিকে পানির অভাব। দ্বিমুখী সংকটের মধ্যেই বছরের পর বছর জীবনযাপন করছে তিস্তা অববাহিকার মানুষ।

তারা আরও বলেন, রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী ও গাইবান্ধাসহ উত্তরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ জনপদের জীবন-জীবিকার সঙ্গে জড়িয়ে আছে তিস্তা নদী। প্রায় দুই কোটি মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই নদীর ওপর নির্ভরশীল। অথচ নদীটির দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধারে কার্যকর কোনো উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়নি।

সমাবেশে অংশ নেওয়া নদীপাড়ের বাসিন্দারা বলেন, চলতি অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে তিস্তা মহাপরিকল্পনার বিষয়টি আলোচনায় এলেও প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য কোনো নির্দিষ্ট অর্থ বরাদ্দ কিংবা সময়বদ্ধ কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়নি। এতে নতুন করে হতাশা তৈরি হয়েছে। আর কোনো প্রতিশ্রুতি নয়—এবার দৃশ্যমান কাজ দেখতে চান তারা।

চর মহিপুর এলাকার নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক বক্তার আলী (৬৫) বলেন, ‘আশ্বাস শুনতে শুনতে ক্লান্ত হয়ে গিয়েছি। সবাই খালি আশ্বাস দেয়। কেউ সত্য বলেনি। তারা আমাদের নিয়ে রাজনীতি করছে। আমাদের খেলার পুতুল বানিয়ে ফেলেছে।’

তিনি বলেন, ‘এ মাসে ও মাসে তিস্তার কাজ শুরু হবে, এগুলো বলে তারা আমাদের সান্ত্বনা দিয়েছে শুধু। আসলে তিস্তা নিয়ে এখনো কোনো কাজই হয়নি। সব সরকারই আমাদের সঙ্গে তামাশা করেছে। আমরা এসব আশ্বাস আর শুনতে চাই না। তিস্তা নদী আগের মতো দেখতে চাই।’

আরেক কৃষক গোলজার রহমান (৬০) বলেন, ‘তিস্তা নদী ভাঙতে ভাঙতে আমরা শেষ হয়ে গিয়েছি। যে জমিজমা বাকি আছে, তাও হুমকিতে। শুনে আসছি, তিস্তা নদীর কাজ শুরু হবে, কিন্তু এখনো হলো না। সরকার বাজেটও দেয়নি। আমাদের মৃত্যু ছাড়া আর উপায় নেই।’

তিনি বলেন, ‘তিস্তা নদী মরে যেতে বসেছে। আমরাও মরে যেতে বসেছি। তিস্তা না বাঁচলে আমরাও বাঁচব না। আমাদের বাঁচান, আমাদের তিস্তাকে বাঁচান।’

সংগ্রাম পরিষদের নেতারা বলেন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবি নতুন নয়। গত কয়েক দশক ধরে বিভিন্ন সরকার প্রকল্পটি বাস্তবায়নের আশ্বাস দিলেও তা আলোর মুখ দেখেনি। ফলে নদীভাঙন, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, কৃষি সেচ, নাব্যতা রক্ষা, নদী পুনরুদ্ধার ও পরিবেশ সংরক্ষণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে।

সংগঠনের সভাপতি অধ্যক্ষ নজরুল ইসলাম হক্কানী বলেন, ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে আর বিলম্ব করার সুযোগ নেই। উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা, কৃষি, পরিবেশ ও অর্থনীতির স্বার্থে দ্রুত প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে। জাতীয় বাজেটে প্রকল্পটির জন্য সুস্পষ্ট অর্থ বরাদ্দ এবং সময়বদ্ধ রোডম্যাপ ঘোষণা করতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘গত বছর তিস্তাপাড়ের লাগাতার আন্দোলনে ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত হয়ে বর্তমান সরকার প্রধান তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের আশ্বাস দিয়েছিলেন। সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন দেখতে এখনো অপেক্ষায় রয়েছে তিস্তাপাড়ের লাখো মানুষ।’

Related Articles

Latest Posts