স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমকে ঘিরে সৃষ্ট বিতর্কে বিএনপির বেশ কয়েকজন সংসদ সদস্য হতাশা প্রকাশ করেছেন। তারা বলছেন, বিষয়টি দলের ভেতরে অস্বস্তি সৃষ্টি করেছে এবং সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করেছে।
তিনজন মন্ত্রী এবং দুইজন প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, বর্তমান সরকারের মেয়াদের প্রায় চার মাস অতিবাহিত হওয়ার পর এই প্রথমবারের মতো তারা উচ্চপদে আসীন কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগে বিব্রত বোধ করছেন।
গতকাল এই প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে ক্ষমতাসীন দলের ১৩ জন সংসদ সদস্য, তিনজন মন্ত্রী, দুইজন প্রতিমন্ত্রী এবং বিএনপির স্থায়ী কমিটির ছয়জন সদস্য জানান, বিষয়টি সরকারের সমালোচনা করার বড় সুযোগ করে দিয়েছে বিরোধীদের।
নিজের নির্বাচনী এলাকায় নবগঠিত তিনটি ইউনিয়নের নাম শাহে আলমের পারিবারিক পদবি এবং তার দুই ছেলের নামের সঙ্গে মিলে যাওয়ার ঘটনায় সংসদে প্রশ্ন ওঠার পর বিতর্কের সূত্রপাত হয়।
গত সোমবার সংসদে এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে প্রতিমন্ত্রী দাবি করেন, দুটি ইউনিয়নের নাম তার ছেলেদের নামের সঙ্গে মিলে যাওয়ার বিষয়টি ‘মিরাকল’।
এই প্রতিবেদনে উদ্ধৃত মন্ত্রিসভার সদস্য, সংসদ সদস্য এবং দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা তাদের নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি।
তারা জানান, বিষয়টি এমন একজন বর্তমান প্রতিমন্ত্রীকে নিয়ে যার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর ‘ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক’ রয়েছে। তিনজন মন্ত্রীর মতে, এই বিতর্ক উপেক্ষা করা এখন সরকারের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং এটি মন্ত্রিসভার ভেতরেও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
চট্টগ্রাম বিভাগের একজন মন্ত্রী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমাদের প্রধানমন্ত্রী যেখানে নিজের মায়ের নামেও কোনো প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করতে চান না, সেখানে ব্যক্তিগত সংশ্লিষ্টতা রয়েছে— এমন বিষয়ে মন্ত্রীদের অনেক বেশি সাবধান থাকা উচিত। সংসদে বিদ্রূপের সুরে কথা না বলে শাহে আলমের উচিত ছিল বিষয়টি যথাযথভাবে ব্যাখ্যা করা।’
তিনি আরও বলেন, ‘তিনি এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে আছেন, যেখানে আমাদের দলের দ্বিতীয় শীর্ষ নেতাও (বিএনপি মহাসচিব এবং এলজিআরডিমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর) আছেন। তার প্রতিটি কাজ অন্য সব মন্ত্রী এবং সরকারের সঙ্গে জড়িয়ে যায়। ইউনিয়নগুলোর নামকরণ নিয়ে তিনি যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন, তাতে শুধু সাধারণ মানুষই নয়, বরং আমাদের মন্ত্রিসভার সদস্যরাও সন্তুষ্ট নন।’
উত্তরাঞ্চলের একজন মন্ত্রী বলেন, ‘নিজের এলাকার প্রতি সবারই টান থাকে এবং সবাই চান সেখানে উন্নয়ন হোক যেন সরকারের কাজের প্রতিফলন ঘটে। তবে ইউনিয়নের নাম দিয়ে জনগণের কী লাভ? প্রধানমন্ত্রী যেখানে সরকারের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করছেন, সেখানে এই ধরনের বিতর্ক নেতিবাচক প্রভাব তৈরি করতে পারে।’
ঢাকা বিভাগের আরেকজন মন্ত্রী বলেন, ‘আমরা যদি মেনেও নেই যে নামগুলো অলৌকিকভাবে বা কাকতালীয়ভাবে মিলে গেছে, তবুও আমার প্রশ্ন হলো—নামগুলো চূড়ান্ত করার আগে তিনি কেন তা থামালেন না? আমরা কেন বিরোধীদের এমন সুযোগ করে দেব?’
বিষয়টি সরকারের উচ্চপর্যায়ে পৌঁছেছে কি না, জানতে চাইলে ওই মন্ত্রী বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী এই বিষয়টি জানেন। এখন এটি সম্পূর্ণ উনার বিষয় যে তিনি কী ব্যবস্থা নেবেন। এ বিষয়ে আমাদের কোনো মন্তব্য বা পরামর্শ নেই।’
কয়েকজন সংসদ সদস্য জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ সভায় দলীয় সদস্যদের বারবার এই নির্দেশনা দিয়েছেন যেন তারা এমন কোনো কাজে লিপ্ত না হন যা সরকার বা দলের ওপর জনগণের আস্থা ক্ষুণ্ণ করতে পারে। শাহে আলমের কাজ সেই নির্দেশনার পরিপন্থী বলেই মনে করছেন তারা।
গতকাল বৃহস্পতিবার সংসদ অধিবেশনের বিরতির সময় নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন সংসদ সদস্য বলেন, প্রতিমন্ত্রীর আচরণে সংসদ সদস্যরা হতাশ।
তিনি বলেন, ‘তার কর্মকাণ্ডে আমরা এমপিরা বিরক্ত। তিনি যে ব্যাখ্যা দিচ্ছেন, তা অত্যন্ত দুর্বল এবং আমাদের অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে ফেলে দিচ্ছে। তিনি সবকিছু নিজের ইচ্ছামতো করছেন। সব প্রকল্প তিনি নিজের নির্বাচনী এলাকায় নিয়ে যাচ্ছেন, যা মোটেও ঠিক নয়।’
ওই সংসদ সদস্য আরও যোগ করেন, ‘হয়তো কেউ তাকে মদদ দিচ্ছে, আর সেই কারণেই তিনি এ ধরনের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন। আমরাও খুব বেশি কিছু বলতে পারছি না, কারণ আমরা সেই অবস্থানে নেই।’
চট্টগ্রাম বিভাগের আরেক সংসদ সদস্য বলেন, ‘সংসদ অধিবেশনের বিরতির সময় কয়েকজন সংসদ সদস্য বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছেন। প্রধানমন্ত্রী যখন সরকারের একটি নতুন ভাবমূর্তি তৈরির চেষ্টা করছেন, তখন একজন প্রতিমন্ত্রীর এমন কর্মকাণ্ড সত্যিই হতাশাজনক।’
উত্তরাঞ্চলের সরকারি দলের একজন এমপি বলেন, ‘আমাদের এমনকি তৃণমূল পর্যায়ের নেতাদের প্রশ্নের মুখেও পড়তে হচ্ছে। অথচ প্রতিমন্ত্রীর হাবভাব দেখে মনে হয় তিনি কাউকে পরোয়াই করছেন না।’
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের এক এমপি মনে করেন, সরকারের এখনই পদক্ষেপ নেওয়া দরকার, নাহলে অন্যরাও এমন কাজ করার সুযোগ পাবে এবং একটি বাজে নজির তৈরি হবে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির স্থায়ী কমিটির চারজন সদস্য জানিয়েছেন, এই বিতর্ক এখন স্থায়ী কমিটি পর্যন্ত গড়িয়েছে। একজন সদস্য জানান, এই ঘটনায় তৈরি হওয়া অস্বস্তি সম্পর্কে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব পুরোপুরি অবগত।
স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য বলেন, ‘দীর্ঘ ১৭ বছরের সংগ্রামের পর আমরা নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছি। অনেক নির্যাতিত বিএনপি নেতা সরকারে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাননি। অথচ কেউ সেই সুযোগ পেয়ে যদি সরকার ও দলের ভাবমূর্তি ঝুঁকির মুখে ফেলেন, তবে তা মেনে নেওয়া যায় না।’
অন্য এক সদস্য বলেন, ‘সম্প্রতি তাকে নিয়ে পত্রিকায় বেশ কিছু খবর এসেছে যেখানে বলা হয়েছে যে তার নির্বাচনী এলাকা সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ পেয়েছে। এমনকি তার এক সন্তান ওই কাজের ঠিকাদারিও পেয়েছেন। মানুষ এসব দেখছে এবং সরকার ও বিএনপিকে দোষারোপ করছে। এখন দেখার বিষয় প্রধানমন্ত্রী তার বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেন।’
গতকাল রাতে এই প্রতিবেদক মন্তব্যের জন্য শাহে আলমের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেন এবং ক্ষুদে বার্তা পাঠান, কিন্তু তিনি সাড়া দেননি।
দলীয় সূত্র জানায়, নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্নার জন্য বগুড়া-২ আসন ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে বিএনপি সরে আসার পর শাহে আলম সেখান থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। দল আগে ঘোষণা করেছিল যে সেখানে তারা কোনো প্রার্থী দেবে না। পরে শাহে আলম মনোনয়ন পান, নির্বাচনে জয়ী হন এবং প্রতিমন্ত্রীর পদ পান।
