উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে গিয়েছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) অন্তত ২৪ শিক্ষক। কিন্তু পড়াশোনা শেষে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেননি, ফেরতও দেননি শিক্ষাছুটিকালে পাওয়া বেতন-ভাতা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের নথি অনুযায়ী, ২০১০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বিদেশে যাওয়া এসব শিক্ষকের কাছে জাবির পাওনা দাঁড়িয়েছে ৩ কোটি ১৫ লাখ টাকার বেশি। বিষয়টি তদন্তে কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
এসব শিক্ষক মাস্টার্স, পিএইচডি বা পোস্ট-ডক্টরাল গবেষণার জন্য যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে গিয়েছিলেন।
জাবি শিক্ষক নিয়োগ ও কর্মসংস্থান বিধিমালা অনুযায়ী, বিদেশে উচ্চশিক্ষা শেষে শিক্ষকদের ৩০ দিনের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে পুনরায় নিজ নিজ পদে যোগ দিতে হয়। পাশাপাশি বিদেশে অবস্থানের সময়ের অতিরিক্ত অন্তত তিন বছর বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি করতে হয়।
নিয়ম অনুযায়ী, কেউ যদি এ শর্ত পূরণ করতে ব্যর্থ হন, তাহলে শিক্ষাছুটিকালে পাওয়া সব বেতন-ভাতা প্রচলিত ব্যাংক হারে সুদসহ এককালীন পরিশোধ করতে হয়।
জাবির টিচিং সেকশনের সহকারী রেজিস্ট্রার মো. রেজাউল কবির গত ১৪ জুন দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, এই শিক্ষকদের মধ্যে কয়েকজনকে অবসরে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। বাকিদের মধ্যে অধিকাংশকে তাদের আবেদনের ভিত্তিতে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। কয়েকজনকে আবার বরখাস্তও করা হয়েছে। তাদের শিক্ষাছুটিতে যাওয়ার তারিখ থেকেই এসব সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার অফিসের সূত্র জানায়, অধিকাংশ শিক্ষককে সিন্ডিকেটের অনুমোদনের পর অব্যাহতি দেওয়া হয়। আর প্রশাসনের একাধিক নোটিশ ও ব্যাখ্যা চাওয়ার পরও সাড়া না দেওয়ায় কয়েকজনকে বরখাস্ত করা হয়।
রেজাউল কবির বলেন, বকেয়া অর্থ ফেরত ও ব্যাখ্যা চেয়ে শিক্ষকদের স্থায়ী ঠিকানায় অন্তত তিনটি করে চিঠি পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি ইমেইলও করা হয়েছে। কিন্তু অনেকেই কোনো জবাব দেননি।
সম্প্রতি বিষয়টি নিয়ে সক্রিয় হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
জাবির কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক এম আবদুর রব জানান, গত ২১ মে অনুষ্ঠিত সিন্ডিকেট সভায় শিক্ষাছুটি-সংক্রান্ত অনিয়ম খতিয়ে দেখতে উপ-উপাচার্যের (একাডেমিক) নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) অধ্যাপক মো. শামসুল আলম বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। আমরা প্রতিটি ঘটনা খতিয়ে দেখব এবং বিধিমালা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।
পাওনা টাকা এখনও অপরিশোধিত
২০২৬ সালের ১৯ মে পর্যন্ত জাবির পাওনা ৩ কোটি ১৫ লাখ টাকারও বেশি। এর অর্ধেকের বেশি বকেয়া রয়েছে মাত্র ছয়জন সাবেক শিক্ষকের কাছে।
তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বকেয়া রয়েছে দর্শন বিভাগের সাবেক সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ ফয়সাল জামালের। বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে তার দেনা ৪৮ লাখ ৮৬ হাজার ১৮০ টাকা।
জাবির নথি অনুযায়ী, ফয়সাল ২০১৫ সালে মাস্টার্স ডিগ্রির জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যান। পরে পিএইচডি সম্পন্ন করার জন্য তার শিক্ষাছুটি ২০২১ সালের ১১ নভেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক ও কর্মকর্তা জানান, তিনি ২০২২ সালের জুনে দেশে ফিরে স্বেচ্ছা অবসরের আবেদন করেন এবং কিছুদিন পর আবার যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান।
২০২২ সালের ২০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত সিন্ডিকেট সভায় সিদ্ধান্ত হয়, সব বকেয়া পরিশোধ না করা পর্যন্ত তার পদত্যাগপত্র গ্রহণ করা হবে না।
যোগাযোগ করা হলে ফয়সাল বলেন, পড়াশোনা শেষ করে আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিয়েছিলাম এবং কিছুদিন কাজও করেছি। পরে স্বেচ্ছা অবসরের আবেদন করি। আমি কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করেছিলাম, আমার পেনশন ও গ্র্যাচুইটির সঙ্গে বকেয়া সমন্বয় করে বাকি অর্থ পরিশোধের সুযোগ দেওয়া হোক। কিন্তু তারা আগে পুরো টাকা পরিশোধ করতে বলেছে। এককালীন এত বড় অঙ্কের অর্থ দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়।
তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছেন হিসাববিজ্ঞান ও তথ্যব্যবস্থা বিভাগের সাবেক সহযোগী অধ্যাপক প্রবাল দত্ত। ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে তাকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে তার বকেয়া ৪৮ লাখ ৫২ হাজার ১৭ টাকা।
বর্তমানে ফিনল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব ভাসায় ডক্টরাল গবেষক হিসেবে কর্মরত প্রবাল ইমেলের মাধ্যমে বলেন, ব্যক্তিগত কারণে তিনি জাবিতে আর যোগ দেননি।
তিনি বলেন, আমি জুলাইয়ের দ্বিতীয় সপ্তাহে বাংলাদেশে ফিরব এবং শিক্ষাছুটিকালে পাওয়া অর্থ পরিশোধ করব।
পরিসংখ্যান ও ডেটা সায়েন্স বিভাগের সাবেক সহযোগী অধ্যাপক মো. তারেক ফেরদৌস খানের কাছে জাবির পাওনা ৪৪ লাখ ৯ হাজার ৩২৬ টাকা। ২০১৭ সালের অক্টোবরে তিনি পদত্যাগ করেন।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সাউথ ক্যারোলাইনার ক্লেমসন ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষকতা করা তারেক ইমেলে বলেন, এখনও পুরো টাকার ব্যবস্থা করতে পারিনি। তবে যত দ্রুত সম্ভব বকেয়া পরিশোধের চেষ্টা করছি।
একই বিভাগের আরেক সাবেক সহযোগী অধ্যাপক আজিজুর রহমানের কাছে জাবির পাওনা ৪৪ লাখ ৫২ হাজার ৫৭১ টাকা। ২০১৮ সালের ৩০ আগস্ট থেকে তাকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
এই প্রতিবেদকের ইমেলের জবাবে আজিজ বলেন, তিনি তার পরিস্থিতি রেজিস্ট্রার অফিসকে জানিয়েছেন এবং বকেয়া পরিশোধের জন্য একটি যৌক্তিক সময়সীমা নির্ধারণের অনুরোধ করেছেন।
তিনি বলেন, আমি বিষয়টি সমাধানে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। পুরো অর্থের ব্যবস্থা করতে পারলে বাংলাদেশে এসে বকেয়া পরিশোধ করব।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক সহকারী অধ্যাপক নওরীন তাবাসসুমের ঘটনাও উল্লেখযোগ্য।
কানাডার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স করার জন্য তিনি ২০১২ সালের ৬ সেপ্টেম্বর থেকে ২০১৩ সালের ৩০ আগস্ট পর্যন্ত শিক্ষাছুটিতে ছিলেন। পরে ম্যাকমাস্টার ইউনিভার্সিটিতে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে পিএইচডি করার জন্য ২০১৮ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ছুটি বাড়ানো হয়।
এরপর তাকে ২০২০ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বেতনহীন বিশেষ ছুটি দেওয়া হয়।
তবে ছুটির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও তিনি জাবিতে ফেরেননি। কম্পট্রোলার অফিসের নথি অনুযায়ী, ২০১২ সালের ৬ সেপ্টেম্বর থেকেই তাকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
২০২১ সালে তার জামিনদার আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ অবসরে গেলে তার গ্র্যাচুইটি তহবিল থেকে ১৩ লাখ ৮৭ হাজার ৯২৫ টাকা আটকে রাখা হয়। এরপরও নওরীনের কাছে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাওনা রয়েছে ১৬ লাখ ১২ হাজার ৭২৫ টাকা।
জাবির কম্পট্রোলার মো. মোসানুল কবির বলেন, নওরীন বকেয়া পরিশোধ না করায় বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী তার জামিনদারের গ্র্যাচুইটির একটি অংশ আটকে রাখা হয়েছে। তিনি বকেয়া পরিশোধ করলে ওই অর্থ অধ্যাপক আজাদকে ফেরত দেওয়া হবে।
অধ্যাপক আজাদ বলেন, আমি একাধিকবার নওরীনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছি, কিন্তু তিনি সব যোগাযোগের পথ বন্ধ করে দিয়েছেন।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানায়, তার স্থায়ী ঠিকানা ও ইমেলে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। এই প্রতিবেদকের পাঠানো ইমেলেরও তিনি জবাব দেননি।
জাবির আরেক সাবেক সহকারী অধ্যাপক এ কে এম ফজলুর রহমানের কাছে বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবি অনুযায়ী বকেয়া ১২ লাখ ৪৭ হাজার ৫২২ টাকা। গণিতের এই শিক্ষককে ২০০৭ সালের ১১ আগস্ট থেকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব আলাবামা অ্যাট বার্মিংহামে বায়োস্ট্যাটিস্টিকসের সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত ফজলুর রহমান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উল্লেখ করা অঙ্কটি সঠিক নয়।
ইমেইলে তিনি জানান, প্রকৃত বকেয়ার তুলনায় এই অঙ্ক প্রায় তিন গুণ বেশি দেখানো হয়েছে। ২০১৮ সালের ২০ ডিসেম্বর আমি কম্পট্রোলার অফিসে একটি চিঠি দিয়েছিলাম, যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে থাকা আমার সব তহবিলের বিস্তারিত হিসাব চেয়েছিলাম। সেই তথ্য পেলেই পরবর্তী পদক্ষেপ নেব।
এ বিষয়ে কম্পট্রোলার অফিসের কর্মকর্তারা বলেন, বিধি অনুযায়ী প্রচলিত ব্যাংক হারে সুদ যুক্ত হওয়ায় সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বকেয়ার পরিমাণ বেড়েছে।
করণীয় কী
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, যেসব শিক্ষক বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে আসেননি এবং পাওনা পরিশোধ করেননি, তারা শিক্ষক হিসেবে নিজেদের অবস্থানের অপব্যবহার করেছেন। এটি প্রতারণার শামিল।
তিনি বলেন, তারা রাষ্ট্রের সম্পদের অপচয় করেছেন। নিঃসন্দেহে এটি দুর্নীতির আওতায় পড়ে।
তার মতে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উচিত তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া। বর্তমানে কেউ বিদেশে অবস্থান করলে প্রচলিত আইনের আওতায় অনুপস্থিতিতেও তাদের বিচার করা যেতে পারে।
জাবির জীববিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক মোহাম্মদ মাফরুহী সাত্তার বলেন, শিক্ষকদের বকেয়া অর্থ পরিশোধ না করা অত্যন্ত অনৈতিক।
তিনি বলেন, আমরা অনেক সময় শিক্ষকদের জন্য উপযুক্ত কর্মপরিবেশ তৈরি করতে পারি না। ফলে উচ্চশিক্ষা শেষে কেউ কেউ আর ফিরে আসতে চান না।
জাবির সাবেক শিক্ষক আনু মুহাম্মদ বলেন, বিদেশে অবস্থানকালে শিক্ষাছুটির সুবিধা পাওয়া শিক্ষকদের দায়িত্ব হলো দেশে ফিরে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক উন্নয়নে অবদান রাখা।
তিনি বলেন, কোনো কারণে যদি তারা ফিরতে না পারেন, তাহলে অন্তত জনগণের অর্থ ফেরত দেওয়া উচিত। তা না করা অনৈতিক।
