গাজীপুরের বোর্ডবাজার এলাকার ‘ইউনিক ডিজাইনার্স অ্যান্ড ইউনিক ওয়াশিং লিমিটেড’ আর্থিক সংকটসহ বিভিন্ন সমস্যার কারণে স্থায়ীভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। হঠাৎ এই দুটি কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রায় ১ হাজার ৮০০ শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। দীর্ঘদিনের কর্মস্থল হারিয়ে চরম উদ্বেগ, হতাশা আর অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটছে তাদের।
আজ মঙ্গলবার সকাল ৯টায় কারখানাটির শ্রমিক বিল্লাল সোহাগ দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, আমার বাড়ি শেরপুর। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে এই কারখানায় চাকরি করতাম। হঠাৎ কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আমরা পথে বসে গেছি। ছেলেকে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি করিয়েছি, এখন তার পড়াশোনা চালিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। স্ত্রীও অসুস্থ। সামনে কী করব বুঝতে পারছি না। শুনেছি আগামী ২৭ জুলাই আমাদের সব পাওনা পরিশোধ করা হবে। আদৌ তা পাব কি না জানি না।
গাজীপুর শিল্প পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ খলিলুর রহমান জানান, আর্থিক সংকটসহ নানা সমস্যার কারণে কারখানা কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠানটি স্থায়ীভাবে বন্ধ ঘোষণা করেছে। গত ১৬ জুন থেকেই কারখানাটি বন্ধ রয়েছে বলে জানানো হয়।
এদিকে শ্রমিকদের বকেয়া বেতন ও অন্যান্য আইনানুগ পাওনা পরিশোধের বিষয়ে মালিকপক্ষের সঙ্গে একটি ত্রিপক্ষীয় আপস-মীমাংসা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। গত রোববার (২১ জুন) সকালে গাজীপুর ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ-২-এর পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ-২-এর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইন।
বৈঠকে শিল্প পুলিশ, কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (ডাইফ) এবং শ্রম অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। মালিকপক্ষের পক্ষে অংশ নেন প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদ আহমেদ। এ ছাড়া বিভিন্ন শ্রমিক ফেডারেশনের নেতৃবৃন্দ ও শ্রমিক প্রতিনিধিরাও সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ খলিলুর রহমান বলেন, কারখানা বন্ধের ফলে শ্রমিকদের সার্ভিস বেনিফিট, বকেয়া বেতন ও অন্যান্য পাওনা পরিশোধের বিষয়ে উভয় পক্ষের সম্মতিতে কয়েকটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, শ্রমিকদের এপ্রিল মাসের অবশিষ্ট ১৫ দিনের এবং মে মাসের ১৮ দিনের বকেয়া বেতন পরিশোধ করা হবে। একই সঙ্গে কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও সব বকেয়া বেতন দেওয়া হবে।
চাকরি অবসানের কারণে শ্রমিকদের ৩০ দিনের বেসিক (মূল) বেতনের সমপরিমাণ অর্থ নোটিশ পে হিসেবে দেওয়া হবে। চাকরির প্রতি বছরের জন্য ২০ দিনের বেসিক বেতন হারে সার্ভিস বেনিফিট দেওয়া হবে।
এছাড়া প্রমাণ সাপেক্ষে মাতৃত্বকালীন সুবিধা, অর্জিত ছুটির অর্থ, পদত্যাগকারী শ্রমিকদের রিজাইন বেনিফিট এবং বিভিন্ন তহবিলে জমাকৃত অর্থ পরিশোধ করা হবে।
বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আগামী ২৭ জুলাই শ্রমিকদের সব পাওনা একযোগে পরিশোধ করার কথা রয়েছে।
তবে এই চুক্তির বিষয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন শ্রমিক নেতারা। বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড শিল্প শ্রমিক ফেডারেশনের গাজীপুর মহানগর সভাপতি শফিউল আলম দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ঈদের আগে বেতন-ভাতা ও বোনাস নিয়ে যে সংকট তৈরি হয়েছিল, তা ত্রিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা হয়। কিন্তু এরপরও মালিকপক্ষ কারখানা চালু না করে স্থায়ীভাবে বন্ধের পথ বেছে নিল। এতে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা শত শত শ্রমিক একসঙ্গে বেকার হয়ে পড়লেন এবং তাদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে গেল।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, ২১ জুনের এই চুক্তিটি মোটেও শ্রমিকবান্ধব হয়নি। শ্রম আইন অনুযায়ী শ্রমিকদের প্রাপ্য সুবিধা ও ক্ষতিপূরণ এখানে পুরোপুরি নিশ্চিত করা হয়নি। ফলে শত শত শ্রমিক তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
