মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গতকাল মঙ্গলবার বলেছেন, ইরান ‘অনির্দিষ্টকালের’ জন্য তাদের পারমাণবিক স্থাপনা পরিদর্শনের সুযোগ দিতে সম্মত হয়েছে। অন্যদিকে তেহরান জানিয়েছে, তারা আলোচনায় এ ধরনের কোনো ছাড় দেয়নি।
সুইজারল্যান্ডে প্রথম দফার বৈঠক শেষে দুই পক্ষ থেকে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে ইরানের অবরুদ্ধ অর্থ ছাড়, হরমুজ প্রণালির কর্তৃত্ব এবং লেবাননে ইসরায়েলের যুদ্ধ বন্ধ নিয়ে তারা একমত হতে পারছে না।
গত সপ্তাহে যুদ্ধ বন্ধের উদ্দেশ্যে যে সমঝোতা স্মারক সই হয়েছিল, এই বিষয়গুলোই ছিল তার মূল ভিত্তি। এখন দুই পক্ষের পরস্পরবিরোধী দাবি ওই স্মারকের বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। বার্তাসংস্থা রয়টার্সের খবরে এমনটি বলা হয়েছে।
এসবের পরও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন ইরানের সঙ্গে আলোচনা ভালোভাবেই এগোচ্ছে। পেনসিলভানিয়ার এক জনসভায় তিনি বলেন, আমাদের সম্পর্ক বেশ ভালোই যাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিশ্বকাপ ফুটবল দলের ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেছে, যার ফলে দলটি তাদের পরবর্তী ম্যাচের একদিনের পরিবর্তে দুই দিন আগে মেক্সিকোর টিজুয়ানা থেকে সিয়াটলে যাওয়ার অনুমতি পেয়েছে।
যুদ্ধের প্রতি দেশের মানুষের সমর্থন কমে যাওয়ার লক্ষণ হিসেবে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার সূচক নিচে নেমে গেছে। অন্যদিকে, রিপাবলিকান নিয়ন্ত্রিত সিনেট প্রেসিডেন্টের সিদ্ধান্ত অমান্য করে যুদ্ধ বন্ধের পক্ষে ভোট দিয়েছে। এটি মূলত একটি প্রতীকী প্রতিবাদ, যা দলটির অভ্যন্তরীণ কোন্দলকে সামনে নিয়ে এসেছে।
রয়টার্স/ইপসোসের একটি জরিপে দেখা গেছে, ৩৫ শতাংশ আমেরিকান মনে করেন যুদ্ধের আগের তুলনায় ইরানের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র এখন আরও দুর্বল অবস্থানে আছে। বিপরীতে, মাত্র ২৩ শতাংশ মানুষ মনে করেন, দেশটির অবস্থান আগের চেয়ে শক্তিশালী হয়েছে।
এদিকে সিনেটে ৫০-৪৮ ভোটে একটি প্রস্তাব অনুমোদিত হয়েছে, যা চলতি মাসের শুরুর দিকে প্রতিনিধি সভায় পাস হয়েছিল। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই অজনপ্রিয় যুদ্ধ নিয়ে খোদ ট্রাম্পের দলের কিছু নেতার মধ্যেও যে গভীর উদ্বেগ জন্মেছে, এই ভোটাভুটি তারই বহিঃপ্রকাশ।
ইতিহাসে এই প্রথম মার্কিন কংগ্রেসের উভয় কক্ষ (সিনেট ও প্রতিনিধি সভা) ওয়ার পাওয়ারস অ্যাক্ট বা যুদ্ধকালীন ক্ষমতা আইনের অধীনে প্রেসিডেন্টকে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সেনা সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়ে কোনো প্রস্তাব পাস করল। তবে এই ভোটাভুটি যুদ্ধের ওপর ঠিক কী প্রভাব ফেলবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
নাবিকদের উদ্ধার
দীর্ঘস্থায়ী শান্তির সম্ভাবনা এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত না হলেও ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে প্রাথমিক চুক্তির ফলে হরমুজ প্রণালি দিয়ে পুনরায় জাহাজ চলাচল শুরু হয়েছে। বিশ্বের মোট জ্বালানি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়েই পরিবাহিত হয়।
গতকাল তেলের দাম গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগের পর্যায়ে নেমে এসেছে। এদিকে, জাতিসংঘের জাহাজ চলাচল বিষয়ক সংস্থা জানিয়েছে, হরমুজে আটকে পড়া ১১ হাজার নাবিককে সরিয়ে নেওয়ার কাজ শুরু করেছে তারা।
সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, ইরান আগামী ৬০ দিনের জন্য এই পথে অবাধে জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেবে। তবে তেহরান ইঙ্গিত দিয়েছে যে, এই সময়সীমা পার হওয়ার পর তারা জাহাজ চলাচলের ওপর শুল্ক বা অন্যান্য ফি আরোপ করতে পারে।
হরমুজ প্রণালির একপাশে ইরান এবং অন্যপাশে ওমান। এই দুই দেশ গতকাল একটি যৌথ বিবৃতি দিয়েছে। সেখানে তারা এই জলপথে নিজেদের সার্বভৌম অধিকারের বিষয়ে জোর দিয়েছে এবং জানিয়েছে, জাহাজ চলাচল ব্যবস্থাপনা এবং এর আনুষঙ্গিক খরচ নিয়ে তারা একত্রে কাজ করবে।
ওমান জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতে ইচ্ছুক জাহাজগুলোর জন্য একটি অস্থায়ী সামুদ্রিক পথ বা করিডোর তৈরি করতে তারা আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার (আইএমও) সঙ্গে সমন্বয় করেছে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বর্তমানে পারস্য উপসাগরীয় মিত্র দেশগুলো সফর করছেন। দেশগুলো ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য সই হওয়া সমঝোতা স্মারক নিয়ে কিছুটা চিন্তিত। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, চূড়ান্ত চুক্তির অংশ হিসেবে ইরানকে এই প্রণালিতে কোনোভাবেই শুল্ক বা টোল আদায়ের অনুমতি দেওয়া হবে না।
সমঝোতা স্মারকে লেবাননসহ সব ফ্রন্টে যুদ্ধ অবিলম্বে বন্ধ করার কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া ইরানের ওপর থেকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, বিদেশে আটকে থাকা ইরানের সম্পদ ফেরত দেওয়া এবং দেশটির পুনর্গঠনের জন্য ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি বিনিয়োগ তহবিল গঠনের রূপরেখাও এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
পারমাণবিক কেন্দ্র পরিদর্শন এবং অবরুদ্ধ সম্পদ ছাড় নিয়ে মতভেদ
বর্তমান রূপরেখা চুক্তিতে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর কোনো সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়নি। বিষয়টি নিয়ে আগামী ৬০ দিনের আলোচনায় বিস্তারিত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প দাবি করেছেন যে, ইরান তাদের ক্ষতিগ্রস্ত পারমাণবিক কেন্দ্রগুলোতে আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের ‘অনির্দিষ্টকালের’ জন্য প্রবেশের সুযোগ দিতে সম্মত হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমনটি জানান তিনি।
তবে ইরান আলোচনায় পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কোনো কথা হওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেছে। তারা জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার পরিদর্শকদের আমন্ত্রণ জানানোর বিষয়ে কোনো সম্মতি দেওয়া হয়নি।
বিদেশের ব্যাংকগুলোতে আটকে থাকা অর্থ ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার বিষয়েও দুই দেশের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে।
ট্রাম্পের ভাষ্যমতে, অবরুদ্ধ সম্পদ থেকে পাওয়া অর্থ কেবল যুক্তরাষ্ট্র থেকে খাদ্য ও ওষুধ কেনার কাজে ব্যয় করতে হবে। অন্যদিকে, জেনেভায় জাতিসংঘে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত আলী বাহরাইনি স্পষ্ট করেন, এই অর্থ খরচের সিদ্ধান্ত নেবে তেহরান।
ওয়াশিংটন এরইমধ্যে ৬০ দিনের জন্য ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে রাজি হয়েছে। এর ফলে তেহরান তেল ও সংশ্লিষ্ট পণ্য বিক্রি করে তাদের অর্থ নেওয়ার সুযোগ পাবে।
লেবাননে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরায়েলের যুদ্ধটিও একটি বড় অমীমাংসিত বিষয় হিসেবে রয়ে গেছে।
রাষ্ট্রদূত বাহরাইনি জানান, চুক্তি অনুযায়ী ইসরায়েলকে লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহার করতে হবে। বিপরীতে, ইসরায়েল দক্ষিণ লেবাননে একটি নিরাপত্তা অঞ্চল বজায় রাখার এবং সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলায় অভিযান অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছে।
গতকাল ওয়াশিংটনে ইসরায়েল ও লেবানন নতুন করে আলোচনায় বসলেও দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি গুলিবর্ষণে দুইজন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দেওয়া এই তথ্যের পরিপ্রেক্ষিতে হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ এনেছে, যা গত রোববার থেকে মোটামুটি কার্যকর ছিল।
