বৃহত্তর আঞ্চলিক যোগাযোগ বৃদ্ধির লক্ষ্যে ‘চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোর’ গড়ে তোলার প্রস্তাব দিয়েছে বেইজিং।
আজ শুক্রবার বেইজিংয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মধ্যে বৈঠকে এ প্রস্তাব দেওয়া হয়।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ৪ দিনের চীন সফরের শেষে চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
মালয়েশিয়া ও চীন সফরের উদ্দেশে গত ২১ জুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঢাকা ত্যাগ করেন। প্রথমে মালয়েশিয়া সফর শেষ করে ২২ জুন তিনি চীনে যান।
বিবৃতিতে বলা হয়, তারেক রহমান চীনকে একটি মহান দেশ হিসেবে উল্লেখ করে বলেছেন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র নীতিতে চীন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে রয়েছে এবং চীন বাংলাদেশের জন্য মূল্যবান ও বিশ্বস্ত অংশীদার।
দুই দেশের ভবিষ্যৎ অংশীদারত্বের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও চীনের জনগণের মধ্যকার সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় উন্নীত করায় তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেন।
তারেক রহমান বলেন, প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সুদৃঢ় নেতৃত্বে চীন সার্বিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে ব্যাপক সাফল্য অর্জন করেছে এবং চীনের আধুনিকায়ন বাংলাদেশের জন্য শেখার এক অনন্য উদাহরণ।
তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশ চায় দুই দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বিনিময় জোরদার, বেল্ট অ্যান্ড রোড সহযোগিতা এগিয়ে নেওয়া এবং অর্থনীতি ও বাণিজ্য, যোগাযোগ, কৃষি, প্রযুক্তি, গ্রিন এনার্জি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সহযোগিতা ও বিনিময় বৃদ্ধি, যা বাংলাদেশকে আধুনিকায়ন অর্জনে সহায়তা করবে।’
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্পষ্টভাবে জানান, বাংলাদেশ ‘এক চীন’ নীতির প্রতি দৃঢ়ভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং তাইওয়ানকে চীনা ভূখণ্ডের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বিশ্ববাসীর অভিন্ন ভবিষ্যতের জন্য কমিউনিটি গড়ে তোলার রূপকল্পের জন্য বিশ্ব শান্তি, উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক সমতা ও ন্যায়বিচারতার—এ ৪ বৈশ্বিক উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
‘বাংলাদেশ এগুলোকে সম্পূর্ণ সমর্থন করে এবং আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বিষয়ে চীনের সঙ্গে সমন্বয় ও সহযোগিতা জোরদার করতে এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিজয়ের ফলাফল ও জাতিসংঘ-কেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে প্রস্তুত রয়েছে,’ বলা হয় বিবৃতিতে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীনের কমিউনিস্ট পার্টিকে (সিপিসি) দলের ১০৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে অভিনন্দন জানান।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়ার পর এটিই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর। পররাষ্ট্রনীতি সংক্রান্ত বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সরকার পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে শক্তিশালী সম্পর্ক বজায় রাখলেও এই সফরটি বিএনপির ‘লুক ইস্ট পলিসি’ বা পূর্বমুখী নীতি পুনরুজ্জীবিত করার ইঙ্গিত দেয়।
গতকাল বৃহস্পতিবার তারেক রহমান ও চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেসময় দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা স্মারক ও চুক্তিসহ মোট ১৭টি দলিল সই হয়।
সমঝোতা স্মারকগুলোর একটি ছিল চীনের গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ ‘গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভের’ অধীনে, যা জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার সমান বলে বিবেচিত হয়।
এর আগে, ২০১৬ সালে বাংলাদেশ চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে’ যোগ দিয়েছিল, যার লক্ষ্য ছিল এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপকে সংযুক্ত করা।
এই উদ্যোগের অধীনে চীন বাংলাদেশকে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও উন্নয়নের অন্যান্য খাতে সহযোগিতা করবে।
আজ বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে তারেক রহমান ও শি জিনপিং যৌথভাবে নতুন যুগে অভিন্ন ভবিষ্যতের ‘চীন-বাংলাদেশ কমিউনিটি’ গড়ে তোলার ঘোষণা দেন, যা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও উচ্চতায় নিয়ে যাবে।
চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশের নতুন সরকারের শাসনব্যবস্থাকে সমর্থনের পাশাপাশি বেল্ট অ্যান্ড রোড সহযোগিতা পরিচালনা, উন্নয়ন কৌশলগুলোকে আরও সুসংহত করা এবং উন্নয়নের অভিজ্ঞতা বিনিময়ের জন্য বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত চীন।
এছাড়া, অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাতে সুশৃঙ্খল সহযোগিতার জন্য সঠিক পরিকল্পনা প্রণয়ন, গ্রিন ও লো-কার্বন উন্নয়ন, ডিজিটাল অর্থনীতি, তথ্য প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে সহযোগিতার সম্ভাবনা দেখা এবং আঞ্চলিক পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা, সংস্কৃতি, শিক্ষা বিনিময়ে চীন বাংলাদেশকে সহযোগিতা করবে।
এতে আরও বলা হয়, বৃহত্তর আঞ্চলিক যোগাযোগের জন্য ‘চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোরের’ উন্নয়নকে এগিয়ে নিতে চায় চীন।
প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং উল্লেখ করেন, চীন সবসময়ই বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে এসেছে এবং বাংলাদেশের জনগণের প্রতি সুপ্রতিবেশীসুলভ ও বন্ধুত্বের নীতিতে অবিচল রয়েছে।
চীনা প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘বিশ্বের পরিস্থিতি যতই পরিবর্তন হোক না কেন, চীন-বাংলাদেশ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের সামগ্রিক দিকনির্দেশের প্রতি চীনের প্রতিশ্রুতি কখনো নড়বড়ে হবে না এবং চীন সবসময় বাংলাদেশের নির্ভরযোগ্য ভালো বন্ধু, ভালো প্রতিবেশী ও ভালো অংশীদার হয়ে থাকবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘চীন বাংলাদেশের সঙ্গে রাষ্ট্রীয়কাজের অভিজ্ঞতা বিনিময় বৃদ্ধি, সব স্তরে সম্পর্ক উন্নত করা, কৌশলগত যোগাযোগ গভীর করা, রাজনৈতিক পারস্পরিক বিশ্বাস জোরদার করা এবং দুই দেশের নিজ নিজ মূল স্বার্থ ও প্রধান উদ্বেগের বিষয়গুলোতে একে অপরকে সমর্থন অব্যাহত রাখতে প্রস্তুত।’
‘নিজ দেশের উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে চীন প্রতিবেশী দেশগুলোতে নতুন নতুন সুযোগ ও গতিশীলতা এনে দিতে কাজ অব্যাহত রাখবে,’ বলেন শি জিনপিং।
বিবৃতিতে বলা হয়, জাতিসংঘসহ বহুপাক্ষিক ব্যবস্থায় বাংলাদেশের সঙ্গে যোগাযোগ ও সমন্বয় শক্তিশালী করতে চীন প্রস্তুত, যেন যৌথভাবে একটি সমতাভিত্তিক ও সুশৃঙ্খল বহুমুখী বিশ্ব এবং সার্বজনীনভাবে উপকারী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক বিশ্বায়ন গড়ে তোলা করা যায়। পাশাপাশি দুই দেশের অধিকার, সাধারণ স্বার্থ ও গ্লোবাল সাউথের স্বার্থ আরও ভালোভাবে রক্ষা করা সম্ভব হয়।
বৈঠকে অন্যান্যের মধ্যে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানসহ দুই দেশের ঊর্ধ্বতন নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
