মিয়ানমার সীমান্ত: যেভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে নাফ নদ-নির্ভর সাধারণ মানুষের জীবিকা

মিয়ানমার সীমান্তে গোলাগুলি ও সহিংসতার কারণে সীমান্ত সংলগ্ন স্থানীয়দের নাফ নদকেন্দ্রিক জীবিকা নির্বাহ করা দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে। চরম আতঙ্কের মধ্যে সেখানে দৈনন্দিন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চালাতে হচ্ছে।

একদিকে মিয়ানমারের সীমান্তের ওপার থেকে আসা গুলি, অন্যদিকে বাংলাদেশের জলসীমার ভেতরে রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীর কারণে জীবন-জীবিকা টিকিয়ে রাখা এক জুয়ায় পরিণত হয়েছে।

কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্যং ইউনিয়নের লম্বাবিল এলাকার বাসিন্দা মো. শাহাবুদ্দিন মাছের ব্যবসা করেন। নাফ নদ বরাবর বেড়িবাঁধ দিয়ে ঘেরা বিস্তীর্ণ নিচু এলাকা লম্বাবিলে অসংখ্য মাছের ঘের। শুষ্ক মৌসুমে এসব ঘেরে লবণ চাষ হয়। বেড়িবাঁধের বাইরে নাফ নদের তীর পর্যন্ত বাংলাদেশের ভূখণ্ড বিস্তৃত।

শাহাবুদ্দিন এই ঘেরে উৎপাদিত চিংড়ি ও অন্যান্য মাছ কেনাবেচা করেন। তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘আমরা সারাক্ষণ আতঙ্কের মধ্যে থাকি। মাছ কিনতে সবসময় আমাদের নাফ নদের পাড় ধরে চলাচল করতে হয়।’

তিনি বলেন, ‘রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠী ও আরাকান আর্মির মধ্যে যেকোনো সময় সংঘর্ষ বেঁধে যেতে পারে। হঠাৎ গোলাগুলি শুরু হলে গুলি চলে আসে বাংলাদেশের সীমানায়। ওপার থেকে আসা গুলিতে এখানকার বেশ কয়েকজন আহত ও নিহত হয়েছেন। এ কারণেই আমরা সবসময় ভয়ে থাকি।’

তিনি আরও বলেন, ‘সম্প্রতি নাফ নদে সশস্ত্র দলগুলোকে প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে চলাচল করতে দেখা যাচ্ছে। এটা আমাদের আরও বেশি আতঙ্কিত করে।’

লম্বাবিলের আরেক মৎস্য চাষি হাশেম আলী জানান, তাদের এলাকায় নাফ নদ কিছুটা সরু। এতে সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যরা সহজে এপার-ওপার যাতায়াত করতে পারে।

তিনি বলেন, ‘তারা আমাদের দেখলে ধাওয়া দেয়। ধরে নিয়ে যেতে পারলে আটকে রাখে। নদীতে মাছ ধরা বা সংলগ্ন ঘেরে কাজ করা এখন জীবনের ঝুঁকি নেওয়ার কাছাকাছি।’

এই এলাকার অসংখ্য মানুষ কাঁকড়া ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন। তাদের একজন শামসুল আলম ডেইলি স্টারকে বলেন, বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর উপস্থিতির কারণে তাদের কাজের পরিবেশ অনিরাপদ হয়ে পড়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বেশ কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা জানান, নাফ নদের ঘন ঝোপঝাড়ে ভরা বেশ কয়েকটি চর রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো আস্তানা হিসেবে ব্যবহার করছে। ভুল করে কেউ সেখানে চলে গেলে তাকে অপহরণ করে মিয়ানমার নিয়ে আটকে রাখা হয়।

তাদের ভাষ্য, আস্তানা বা অবস্থানের তথ্য ফাঁস হয়ে যেতে পারে, এমন ভাবনা থেকে আগে বেশ কয়েকজন বাংলাদেশিকে জিম্মি করা হয়েছিল। পরে মুক্তিপণ দিয়ে তারা ছাড়া পান।

এই গোষ্ঠীগুলো মূলত মাদক চোরাকারবারের সঙ্গে জড়িত বলে জানান স্থানীয়রা।

গত ১৮ মে হ্নীলার লেদা এলাকার সীমান্ত দিয়ে মিয়ানমারের ভেতর থেকে থেমে থেমে গোলাগুলির শব্দ শোনা যায়। এতে নদে মাছ ধরতে যাওয়া জেলেরা আতঙ্কতি হয়ে পড়েন।

৩০ মে সুলিশপাড়া সীমান্তের কাছে মিয়ানমার থেকে আসা একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকায় থাকা ৩ সশস্ত্র ব্যক্তি বাংলাদেশের জলসীমায় প্রবেশ করে একটি মাছ ধরার নৌকা তাড়া করে গুলি ছোঁড়ে। প্রাণ বাঁচাতে নৌকায় থাকা দুজন নদে ঝাঁপ দেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, হামলাকারীরা নৌকা থেকে ইয়াবার চালান, মাছ ধরার জাল ও অন্যান্য মালামাল লুট করে নৌকাটি ডুবিয়ে দেয়।

খবর পেয়ে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে নদ থেকে ২ রোহিঙ্গাকে উদ্ধার ও আটক করে। তবে হামলাকারীরা মিয়ানমারে পালিয়ে যায়।

বিজিবি জানায়, আটক দুজন উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা এবং প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে যে তারা সেখানে ইয়াবার চালান আনতে গিয়েছিল।

বিজিবি কর্মকর্তাদের ধারণা, চালানটি ছিনতাই করতে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী সশস্ত্র পক্ষ ওই হামলা চালাতে পারে।

এর আগে, গত ১১ জানুয়ারি একই সীমান্ত এলাকায় রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠী ও আরাকান আর্মির মধ্যকার সংঘর্ষের সময় হুজাইফা নামে ৯ বছরের এক শিশু গুলিবিদ্ধ হয়। হাসপাতালে ২৭ দিন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে অবশেষে সে মারা যায়।

হুজাইফা গুলিবিদ্ধ হওয়ার পরদিন লম্বাবিলের মোহাম্মদ হানিফ নাফ নদের কাছাকাছি বেড়িবাঁধের ভেতরে নিজের মাছের ঘেরে কাজ করার সময় স্থলমাইন বিস্ফোরণে এক পা হারান।

স্থলমাইনটি আরাকান আর্মি পুঁতেছিল বলে ধারণা স্থানীয়দের। ৩০ বছর বয়সী এই যুবকের সঙ্গে তার বাড়িতে দেখা হলে জানা যায়, বাম পা হারানোর পর থেকে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন এবং সারাদিন বাড়িতেই থাকেন।

ডেইলি স্টারকে তিনি বলেন, ‘এখন আর কাজ করতে পারি না। ছোট ভাইয়ের আয়ে সংসার চলে। কখনো ভাবিনি দেশের ভেতরে নিজের জমিতে কাজ করার সময় পা হারাতে হবে।’

হুজাইফার বাবা মো. জসিম উদ্দিন তার মেয়ের রেখে যাওয়া খেলনা ও কাপড়ের টুকরোগুলো যত্ন করে রেখে দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘মেয়ে বাড়ির পাশে খেলার সময় মিয়ানমার থেকে আসা গুলিতে মারা গেছে।’ সীমান্তে এ ধরনের সহিংসতায় যেন আর কোনো বাবা-মায়ের কোল খালি না হয়, সেজন্য তিনি সরকারের কাছে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন জানান।

উখিয়া ও টেকনাফের কিছু অংশ জুড়ে থাকা নাফ নদের এই অঞ্চলটি বিজিবির ৬৪ ব্যাটালিয়নের আওতাধীন। এ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. জহিরুল ইসলাম ডেইলি স্টারকে জানান, সীমান্তে বিজিবি সর্বদা সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘আমরা সার্বক্ষণিক টহল দিচ্ছি। মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমরা জনবল বাড়িয়েছি এবং বেশ কয়েকটি নতুন চৌকি বসিয়েছি।’

স্থানীয়দের আশ্বস্ত করে তিনি বলেন, ‘সীমান্তে বর্তমানে কোনো নিরাপত্তা ঘাটতি নেই। বাংলাদেশের অভ্যন্তরেও কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠী নেই। এমনকি নতুন জেগে ওঠা “বিলাসী চরে”ও বিজিবি চৌকি বসিয়েছে এবং রাতে নজরদারি চালাচ্ছে।’

তিনি জানান, সম্প্রতি বিজিবি এই সীমান্ত দিয়ে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে অস্ত্র ও গোলাবারুদ পাচারের চেষ্টাকালে বেশ কয়েকজনকে আটক করেছে।

তবে লে. কর্নেল জহিরুল ইসলাম স্বীকার করে বলেন, মিয়ানমার যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চল হওয়ায় সেখানে ‘পরিপূর্ণ শান্তি’ বলে কিছু নেই। মিয়ানমারে গোলাগুলির প্রভাব বাংলাদেশে পড়তে পারে। সীমান্ত এলাকায় চলাচলের সময় বাংলাদেশিদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, ‘কিছু জেলে মাছ ধরার সময় ভুলবশত মিয়ানমারের জলসীমায় ঢুকে নিজেদের ঝুঁকিতে ফেলছেন।’

Related Articles

Latest Posts