সিরাজগঞ্জের চৌহালী উপজেলার চরাঞ্চলে যমুনা নদীর তীব্র ভাঙনে গত দুই সপ্তাহে বিলীন হয়ে গেছে একটি মসজিদ ও ৭৮টি বসতবাড়ি। ভাঙনের শিকার হয়ে খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবনযাপন করছে অনেক পরিবার।
উপজেলার বাঘুতিয়া ইউনিয়নের চর সলিমাবাদ গ্রামের ভূতের মোড় এলাকায় গিয়ে দেখা যায় ভাঙনের ভয়াল চিত্র।
স্থানীয়রা জানান, মাত্র দুই সপ্তাহ আগেও গ্রামের জোতপাড়া মোড় থেকে ভূতের মোড় পর্যন্ত দেড় কিলোমিটার এলাকা ছিল ঘরবাড়ি আর মসজিদে সাজানো। যমুনার করাল গ্রাসে সেই চিরচেনা জনপদ এখন নদীগর্ভে হারিয়ে গেছে।
চৌহালী উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. হেকমত আলী জানান, ১০টি পরিবার ভাঙনের তীব্রতায় ঘরবাড়ির কোনো আসবাবপত্র বা মালামাল সরানোরও সুযোগ পায়নি। বাকি ৬৮টি পরিবার কোনোমতে তাদের ঘর ভেঙে সরিয়ে নিতে পেরেছে।
তিনি বলেন, গত ১০-১২ দিনে মোট ৭৮টি বাড়ি ও একটি মসজিদ যমুনার পেটে গেছে। আজ শুক্রবার থেকে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে ত্রাণ সহায়তা দেওয়া শুরু হয়েছে।
ত্রাণ সহায়তা দেওয়া হলেও স্থানীয় বাসিন্দারা একটি স্থায়ী বাঁধের দাবি জানিয়েছেন।
চর সলিমাবাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও স্থানীয় বাসিন্দা মো. আব্দুল জলিল বলেন, গত ২০ জুন থেকে এই পয়েন্টে নদী ফুঁসে উঠতে শুরু করে। এরপর হঠাৎ করেই কিছু বাড়ি ধসে পড়ে।
তিনি বলেন, চোখের পলকে নদীটি চর সলিমাবাদ মসজিদের কাছাকাছি চলে আসে। ভেঙে যায় গ্রামের পাকা মসজিদটি। কয়েক দিনের মধ্যেই দেড় কিলোমিটার এলাকার ঘরবাড়ি বিলীন হওয়ার পর এখন স্থানীয় বাজার, স্কুল ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানও চরম ভাঙন ঝুঁকিতে রয়েছে।
আব্দুল জলিল আক্ষেপ করে বলেন, নদী প্রতিবছরই আমাদের জমিজমা নেয়, কিন্তু এবার যেভাবে ভাঙছে তাতে মনে হচ্ছে পুরো গ্রামটাই মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে। আমাদের এখানে একটা স্থায়ী বেড়িবাঁধ খুব দরকার।
এক সপ্তাহ আগে নিজের একমাত্র বসতভিটা হারানো সেলিনা খাতুন গত কয়েক দিন ধরে খোলা আকাশের নিচে বাস করছেন। অশ্রুসিক্ত চোখে তিনি বলেন, নদী এমন আচমকা আর জোরে ভাঙা শুরু করল যে ঘর থেকে কোনো জিনিসপত্র বের করার সময়টুকুও পাইনি।
আরেক ভুক্তভোগী মো. আব্দুল মজিদ বলেন, নদীভাঙন আমাদের জন্য নতুন কিছু নয়, কিন্তু যমুনার এমন দ্রুত ভাঙন আমরা আগে কখনো দেখিনি। গত সপ্তাহে আমার বাড়ির কাছে ফাটল দেখা দেওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পুরো ঘর পানিতে তলিয়ে গেল।
ভাঙনের কারণ সম্পর্কে সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মউদুদ আহমেদ সবুজ জানান, নদীর অপর প্রান্তে নতুন ডুবোচর জেগে ওঠায় পানির মূল স্রোতটি বাধা পেয়ে সরাসরি চর সলিমাবাদ পয়েন্টে আঘাত করছে। এর ফলেই ভাঙনের তীব্রতা এত বেশি।
তিনি আরও জানান, ভাঙন ঠেকাতে জরুরি ভিত্তিতে জিও-ব্যাগ (বালুভর্তি বিশেষ ব্যাগ) ফেলার কাজ চলছে এবং পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে।
চর সলিমাবাদ ছাড়াও চৌহালী উপজেলার খাসপুকুরিয়া এলাকা এবং সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার বাহুকা ও চর কাউকোলা এলাকায় যমুনার ভাঙন দেখা দিয়েছে।
সিরাজগঞ্জ পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মোখলেছুর রহমান বলেন, আমরা জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন রোধে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।
