যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলায় নিহত ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির শেষকৃত্যানুষ্ঠানের আয়োজন ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে।
তিন দশকের বেশি সময় ইরানের শাসনব্যবস্থার শীর্ষ এই নেতার শেষকৃত্য অনুষ্ঠানকে ঘিরে দেশটির রাজধানী তেহরানজুড়ে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে আছে ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী।
তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লা প্রার্থনা কমপ্লেক্সে শনিবার জনসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য খামেনির মরদেহ রাখা হবে। সোমবার প্রধান সড়কগুলোতে অনুষ্ঠিত হবে বিশাল শোকযাত্রা।
ইরানের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেড় থেকে দুই কোটি মানুষ খামেনির শেষযাত্রায় অংশ নিতে পারেন। এ কারণে দেশজুড়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
তেহরানের বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে আজ শুক্রবার বার্তাসংস্থা এএফপি জানায়, রাস্তায় অন্যান্য সময়ের চেয়ে মানুষ কম দেখা যাচ্ছে, দোকানপাট বন্ধ এবং শহর থেকে বের হওয়ার পথগুলোতে তীব্র যানজট।
এসব দৃশ্য এমন ইঙ্গিত দেয় যে, অনেকেই প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতার শেষকৃত্য অনুষ্ঠান এড়াতে চান।
বেশ কয়েকজন ইরানি জানিয়েছেন, তারা প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির শেষকৃত্যে অংশ নিচ্ছেন না।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি বিমান হামলায় মারা যাওয়ার একদিন পর খামেনির নিহত হওয়ার খবর প্রকাশ্যে আসে। এরপর দেশটিতে ৪০ দিন শোক ও ৭ দিনের সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়।
৪ মার্চ থেকে তিন দিনব্যাপী খামেনির বিদায় অনুষ্ঠানের ঘোষণা দিয়েছিল ইরানি কর্তৃপক্ষ। কিন্তু, তখন যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলা অব্যাহত থাকায় আয়োজনের প্রস্তুতিতে জটিলতা দেখা দেয় এবং অনুষ্ঠান স্থগিত করা হয়।
এবার শেষকৃত্য অনুষ্ঠানটি এমন সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি চলছে, যদিও মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা পুরোপুরি কমেনি।
তবে সব ইরানিই যে এই রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠানে সমানভাবে আবেগাপ্লুত, তা নয়। ছয় মাস আগেও খামেনি প্রশাসনের বিরুদ্ধে দেশটিতে বিশাল আন্দোলন হয়েছিল।
এএফপি জানায়, খামেনির অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অনুষ্ঠানকে ঘিরে অনেক ইরানিই নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত। আবার অনেকে দেশের ভঙ্গুর অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে এ ধরনের জাঁকজমকপূর্ণ ও ব্যয়বহুল রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে অংশ নিতে অনীহার কথা জানিয়েছেন।
অরাজনৈতিক ও ধর্মীয় আচরণে অভ্যস্ত নন এমন ইরানিরা মনে করছেন, এই আয়োজন শুধু সরকারের সমর্থকদের জন্য এবং এটি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সংকটের সঙ্গে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন।
সাধারণ ইরানিদের অভিযোগ—ভূমিকম্প বা বন্যার মতো প্রকৃত জাতীয় দুর্যোগের সময়ে সরকার যে ধরনের জরুরি চিকিৎসা বা অস্থায়ী আশ্রয়ের ব্যবস্থা করতে ব্যর্থ হয়, তা এখন একজন ‘স্বৈরাচারী’ নেতার শেষকৃত্যে বিলাসবহুলভাবে ওড়ানো হচ্ছে।
পূর্বের অভিজ্ঞতার আলোকে অনেকেই অব্যবস্থাপনা এবং ভিড়ের চাপে পিষ্ট হয়ে প্রাণহানির আশঙ্কা করছেন। আবার বড় ধরনের কোনো সন্ত্রাসী হামলা বা সহিংসতার ভয়ও তাদের তাড়া করছে।
তাছাড়া, এ অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে পুরো তেহরান জুড়ে তল্লাশি চৌকি, রাস্তাঘাট বন্ধ রাখা এবং কট্টর রক্ষণশীলদের উপস্থিতিতে একটি থমথমে ও অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি হয়েছে বলে অনেকের মত।
তেহরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর মাশহাদের ৬৭ বছর বয়সী গৃহিণী এফাত বলেন, ‘অনুষ্ঠান ঘিরে অব্যবস্থাপনার কারণে মানুষের জীবন ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এটা আমার প্রধান উদ্বেগ। এছাড়া আন্তর্জাতিক কোনো সহিংসতা বা সন্ত্রাসী হামলার আশঙ্কার কথাও ভাবছি। এমন কিছু ঘটলে সরকার সত্য উদঘাটনের আগেই ইসরায়েল বা বিরোধীদের মতো বিদেশি শক্তির ওপর দোষ চাপিয়ে দেয়। আমি শুধু চাই যে যারা খামেনির শেষ বিদায় অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছেন, তারা যেন নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারেন।’
তেহরানের বাসিন্দা পেশায় অনুবাদক আজাদেহ বলেন, ‘তেহরানের অনেক বাসিন্দা ভিড় এড়াতে শহর ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। শহরটি অস্বাভাবিক রকমের শান্ত। তারা যে দেড় কোটি মানুষের সমাগমের কথা বলছে, তারা কারা আমি জানি না।’
‘লোকে বলাবলি করছে শনিবারের অনুষ্ঠানের জন্য সরকারি কর্মচারী ও স্কুলের শিশুদের পর্যন্ত অন্য শহর থেকে বাসে করে তেহরানে আনা হচ্ছে। আমি ওই শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত। আশা করি তারা এই ভিড়ের মধ্যে বিপদে পড়বে না,’ বলেন তিনি।
তেহরানজুড়ে থমথমে পরিস্থিতির কথাও বলছেন অনেকে। তথ্যপ্রযুক্তি নিয়ে কাজ করা সাঈদও শহর ছেড়ে অন্যত্র যাচ্ছেন। তিনি জানান, শহরের অনেক রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তল্লাশি চৌকিগুলো আবার চালু হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘তীব্র গরমের মধ্যেও তেহরান থেকে বের হওয়ার রাস্তাগুলোতে মানুষের উপচে পড়া ভিড়। তেহরানের অনেক বাসিন্দা ইতোমধ্যে উত্তরাঞ্চলের দিকে চলে গেছেন। এখানে থাকা সত্যিই কঠিন হয়ে পড়েছে। চারপাশের পরিবেশ বেশ থমথমে। পুরো শহর নিরাপত্তা কর্মী ও রক্ষণশীল ধর্মীয় পোশাক পরা মানুষের ভিড়ে ঠাসা। এটি বেশ অস্বস্তিকর।’
‘আমার ধারণা তারা হয়তো সর্বোচ্চ ৪০-৫০ লাখ লোক জড়ো করতে পারবে। আর রাষ্ট্রীয় মিডিয়া দাবি করবে ২ কোটি মানুষ উপস্থিত হয়েছিল,’ বলেন সাঈদ।
অনেকে এই জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের আর্থিক ব্যয় নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন।
টোনেকাবন শহরের বাসিন্দা ৪৯ বছর বয়সী আলী বলেন, ‘সরকার বলছে তারা দেড় কোটি মানুষের জন্য খাবার, পানীয়, থাকার ব্যবস্থা ও অন্যান্য ব্যবস্থা করেছে। আমার প্রশ্ন হলো—এই টাকা কোথা থেকে আসছে? গত কয়েকদিনেই রুটি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রীর দাম প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে। সাধারণ মানুষ তো ইতোমধ্যেই এই আয়োজনের খেসারত দিতে শুরু করেছে।’
তেহরানের ৩৮ বছর বয়সী ভিজ্যুয়াল আর্টিস্ট কাভেহ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘এই অনুষ্ঠান সাধারণ মানুষের জন্য হতাশা ছাড়া আর কিছুই আনছে না। ভূমিকম্প বা বন্যার মতো প্রাকৃতিক সংকটে কখনোই এ ধরনের সুযোগ-সুবিধা, অস্থায়ী তাঁবু, ভ্রাম্যমাণ টয়লেট, জরুরি ইন্টারনেট, দ্রুত লজিস্টিক বা খাবার সরবরাহ করা হয়নি।’
‘অথচ এখন যুদ্ধ-বিধ্বস্ত অর্থনীতির মধ্যেও স্বৈরাচারী নেতার শেষকৃত্যানুষ্ঠানের জন্য বিলাসবহুল ও ব্যয়বহুল অনুষ্ঠানে জনগণের দেওয়া অর্থই ওড়ানো হচ্ছে। এটি জনগণের পকেট কাটার আরেকটি উপায়। এটি প্রশাসনের প্রোপাগান্ডা বা অপপ্রচার ছাড়া আর কিছুই নয়,’ বলেন তিনি।
তেহরানের বাসিন্দা ৩২ বছর বয়সী চিত্রশিল্পী এলনাজ বলেন, ‘আমাদের মতো সাধারণ মানুষ, যারা সাধারণ জীবনযাপন করি, ধর্মীয় আচরণে অভ্যস্ত নই, প্রশাসনের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই, তাদের দৈনন্দিন জীবনে খামেনি বেঁচে থাকা বা না থাকায় কোনো পার্থক্য নেই। তাই এই অনুষ্ঠান আমাদের কাছে কেন গুরুত্বপূর্ণ হবে তা বুঝি না।’
‘বহু বছর ধরে এটাই মনে হয় যে একই দেশে বাস করেও আমাদের মতো সাধারণ মানুষ এবং সরকারের সমর্থকরা দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন জগতে বাস করছে। এই অনুষ্ঠানটিও অন্যান্য রাষ্ট্রীয় বা ধর্মীয় অনুষ্ঠানের মতোই, যা ইরানের সমাজের একটি অংশের জন্য আয়োজন করা হয়েছে,’ বলেন এই শিল্পী।
মোজতবা খামেনির অংশগ্রহণ ঘিরে জল্পনা
৩০টির বেশি দেশের নেতা ও প্রতিনিধিদল এবং ৯০টি দেশের ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব তেহরানের এই অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন। পাকিস্তান, রাশিয়া ও চীনের প্রতিনিধিদের উপস্থিতির কথা নিশ্চিত করেছে ইরান।
তবে, পশ্চিমা কোনো রাষ্ট্রকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। প্রায় ১৪ হাজার সাংবাদিক এ আয়োজন কভার করবেন।
এই অনুষ্ঠানকে ঘিরে সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলোর একটি হলো—নতুন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনির অংশগ্রহণ।
ফেব্রুয়ারিতে একই হামলায় বাবার সঙ্গে তার মা ও স্ত্রী নিহত হন। তিনি নিজেও সেদিন আহত হন বলে জানা যায়। এরপর থেকে তিনি প্রকাশ্যে আসেননি এবং লিখিত বার্তার মাধ্যমে প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন।
বিশ্লেষণে বলা হয়, তার উপস্থিতি একদিকে যেমন নতুন নেতার বৈধতা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। অন্যদিকে অনুপস্থিতি তার শারীরিক অবস্থা এবং প্রকৃত ক্ষমতা নিয়ে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিতে পারে।
শেষকৃত্যানুষ্ঠান শেষে আগামী ৯ জুলাই উত্তর-পূর্ব ইরানে প্রয়াত আয়াতুল্লাহর জন্মস্থান মাশহাদেই তাকে দাফন করা হবে।
দেশটির স্পিকার বাঘের গালিবাফ খামেনি হত্যার প্রতিশোধের অংশ হিসেবে এই শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে বিশাল জনসমাগমের আহ্বান জানিয়েছেন। এক বক্তৃতায় তিনি বলেন, ‘আমি ইরানের সব জনগণকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছি…আপনাদের উপস্থিতির মাধ্যমে ইসলামিক ইরানের ইতিহাসে একটি গৌরবময় অধ্যায় রচনা করুন।’
‘জাতির প্রতিশোধের এই ডাক যেন সারা বিশ্বের কানে গিয়ে বাজে,’ বলেন তিনি।
