‘আমার মৃত্যু যেন দেশে হয়, এফডিসিতে যেন লাশ না যায়’

বাংলা চলচ্চিত্রের সোনালি সময়ের জনপ্রিয় নায়িকা রোজিনা। তিন শতাধিক সিনেমায় অভিনয় করে জয় করেছেন কোটি দর্শকের হৃদয়। সামাজিক, বাণিজ্যিক সব ধরনের চলচ্চিত্রেই পেয়েছেন সফলতা।

জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ও আজীবন সম্মাননাসহ অসংখ্য স্বীকৃতিতে সমৃদ্ধ তার দীর্ঘ অভিনয়জীবন। তবে জীবনের এই পর্যায়ে এসে পুরস্কার বা সাফল্যের চেয়ে তার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ একটিই ইচ্ছে, শেষ নিঃশ্বাস যেন নিজের দেশের মাটিতেই ত্যাগ করতে পারেন। আর মৃত্যুর পর তার মরদেহ যেন এফডিসিতে না নেওয়া হয়। কেন এমন ইচ্ছে?

সেই কথাই অকপটে জানালেন এই অভিনেত্রী দ্য ডেইলি স্টারের সঙ্গে আলাপকালে।

রোজিনা বলেন, ‘আমার সবচেয়ে বড় চাওয়া, মৃত্যু যেন দেশের মাটিতে হয়। আমার মা-বাবার কবরের পাশেই যেন আমাকে সমাহিত করা হয়। আমি বছরের প্রায় ছয় মাস দেশে থাকি, আর ছয় মাস দেশের বাইরে। তাই আল্লাহর কাছে একটাই প্রার্থনা, শেষ নিঃশ্বাসটা যেন নিজের দেশেই ফেলতে পারি।’

তবে মৃত্যুর পর মরদেহ এফডিসিতে নেওয়া হোক, সেটি চান না তিনি।

রোজিনার ভাষ্য, ‘এটা হঠাৎ নেওয়া সিদ্ধান্ত নয়। অনেক বছর আগেই আমি পরিবারের সবাইকে বলে রেখেছি, আমার মৃত্যুর পর যেন লাশ এফডিসিতে নেওয়া না হয়। এটা আমার ব্যক্তিগত ইচ্ছা।’

কেন এমন ইচ্ছা—এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে তাকে লন্ডনে থাকতে হয়। পরিবারের অনেক সদস্যও দেশের বাইরে থাকেন। সম্প্রতি কলকাতা সফরও করেছেন। তবু তার মন পড়ে থাকে বাংলাদেশেই।

‘বিদেশে নয়, নিজের দেশেই যেন মৃত্যু হয়, এটাই আমার চাওয়া। মৃত্যু তো একদিন হবেই। শুধু চাই, শেষ ঠিকানাটা যেন নিজের দেশের মাটিতে হয়,’ যোগ করেন তিনি।

কথা প্রসঙ্গে বর্তমান চলচ্চিত্র শিল্প নিয়েও আক্ষেপের কথা বলেন রোজিনা।

‘একসময় সিনেমার কী ব্যস্ততা ছিল! আমরা দিনে-রাতে শুটিং করেছি। অনেক শিল্পী একসঙ্গে দুই শিফটে কাজ করতেন। এখন সেই ব্যস্ততা নেই। সিনেমার সংখ্যা কমেছে, কাজও কমেছে। সেই সঙ্গে শিল্পীদের প্রতি সম্মানও আগের মতো নেই।’

তবে সম্মান নিয়ে তার কোনো আক্ষেপ নেই।

‘সম্মান মানুষ দেয় না, আল্লাহ দেন। আমি সারাজীবন কাজ করেছি, দর্শকের ভালোবাসা পেয়েছি। আজও মানুষ আমাকে মনে রেখেছে—এটাই আমার সবচেয়ে বড় সম্মান।’

এফডিসির প্রসঙ্গ উঠতেই স্মৃতির পাতা উল্টে দেখলেন এই অভিনেত্রী।

‘১৯৯৪ সালের দিকে দেশের বাইরে চলে যাই। প্রায় ২০ বছর পর রাক্ষুসী সিনেমার কাজ করতে এফডিসিতে ফিরেছিলাম। এরপর ২০১৬ সালে আবার গিয়েছিলাম। তখন সম্ভবত শাকিব খান শিল্পী সমিতির সভাপতি ছিলেন। একসময় এফডিসির পরিবেশ ছিল খুবই সুন্দর। সেই সময়টার কথা এখনো মনে পড়ে।’

বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির নির্বাচন নিয়েও কথা বলেন তিনি।

‘আমি কখনোই নির্বাচন করতে চাইনি। প্রথমে ডিপজল আমাকে অনুরোধ করেছিলেন। পরে মিশা সওদাগর ও জায়েদ খানও বারবার বলেছিলেন। তাদের অনুরোধেই নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলাম। আমি আগেই বলেছিলাম, নিয়মিত সময় দিতে পারব না। তারা বলেছিলেন, শুধু আমাদের সঙ্গে থাকুন।’

সবশেষে তিনি বলেন, এবারের নির্বাচনেও তার অংশ নেওয়ার কোনো ইচ্ছা ছিল না।

‘আমার বাসায় গিয়ে অনেক অনুরোধ করা হয়েছিল। সেই অনুরোধ রাখতেই নির্বাচন করেছি। ভোট ছিল ৩ তারিখ, আর আমি কলকাতা থেকে ঢাকায় ফিরেছি ২ তারিখ।’

আলাপের শেষদিকে কোনো অভিযোগ নয়, বরং ভালোবাসার কথাই শোনালেন রোজিনা।

‘কারও প্রতি আমার কোনো অভিযোগ নেই। সবাই ভালো থাকুক। আমি যদি চলচ্চিত্রের জন্য সামান্য কিছু করেও থাকি, দর্শক সেটুকুই মনে রাখবেন। সারাজীবন সিনেমাকেই ভালোবেসেছি। এই শিল্পের মঙ্গলই আমার সবচেয়ে বড় চাওয়া।’

Related Articles

Latest Posts