ইরানে আবারো হামলা চালানোর কথা জানিয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের বেশ কয়েকটি স্থানে এই হামলার খবর পাওয়া গেছে। আল জাজিরার খবরে এমনটি বলা হয়েছে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, গতকাল মঙ্গলবার শুরু হওয়া চার ঘণ্টার অভিযানে তারা ৮০টিরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। হরমুজ প্রণালি অতিক্রমকারী তিনটি বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানের হামলার জবাবেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
এদিকে, ইরানের সামরিক নেতারা এই হামলার ‘দাঁতভাঙা জবাব’ দেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন। তারা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, হরমুজ প্রণালি ব্যবস্থাপনায় কোনো বিদেশি হস্তক্ষেপ তারা সহ্য করবেন না।
মার্কিন হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর খাতাম আল-আম্বিয়া কেন্দ্রীয় সদরদপ্তর। ইরাকে দেশটির সাবেক সর্বোচ্চ নেতার জানাজা চলাকালীন এই হামলাকে তারা একটি ‘নির্লজ্জ আগ্রাসন’ হিসেবে অভিহিত করেছে।
এক বিবৃতিতে সামরিক বাহিনী সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, মার্কিন হামলার ‘দাঁতভাঙা জবাব’ দেওয়া হবে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, বাণিজ্যিক জাহাজ ও তেলবাহী ট্যাঙ্কারগুলোর জন্য হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের একমাত্র নিরাপদ পথ হলো ইরানের নির্ধারিত রুট।
ইরানি গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরনগরী সিরিকে বেশ কয়েকটি বিস্ফোরণ ঘটেছে। এ ছাড়া কেশম দ্বীপ এবং বন্দর আব্বাসের নিকটবর্তী এলাকাগুলোতেও হামলার খবর পাওয়া গেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, উপকূলীয় নজরদারি ব্যবস্থা, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎক্ষেপণকেন্দ্রগুলোকে হামলার লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
ইরানি রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, সিরিক জেটিতে স্প্লিন্টারের আঘাতে বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন।
তেহরান থেকে আল জাজিরার সাংবাদিক তৌহিদ আসাদি জানান, রাষ্ট্রীয় টিভির খবর অনুযায়ী, কেশম দ্বীপে ছয়টি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার ক্ষেত্রে এই দ্বীপটির ভূ-কৌশলগত গুরুত্ব অপরিসীম।
আসাদি আরও বলেন, সিরিক বন্দরের কাছাকাছি এলাকায় অন্তত সাতটি বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। এটিও একটি কৌশলগত পয়েন্ট যেখান থেকে ইরান হরমুজ প্রণালি পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করে থাকে।
ইরানের নিহত সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনির জানাজায় অংশ নিতে ইরাকে অবস্থানরত প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান হামলার খবর পেয়ে দ্রুত দেশে ফিরেছেন।
বিস্ফোরণের পর ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, গত জুন মাসে দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক লঙ্ঘনের পরিণতির জন্য মার্কিন সরকার দায়ী।
ওই সমঝোতা স্মারকের লক্ষ্য ছিল গত ফেব্রুয়ারির শেষদিকে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে শুরু হওয়া যুদ্ধের অবসান ঘটানো। এর শর্ত অনুযায়ী, ইরানের ওপর থেকে মার্কিন নৌ-অবরোধ তুলে নেওয়ার বিনিময়ে তেহরান গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালি’ পুনরায় খুলে দিতে সম্মত হয়েছিল।
এ ছাড়া, জুন মাসের শেষে যুক্তরাষ্ট্র ৬০ দিনের জন্য ইরানি তেলের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে রাজি হয়েছিল। কিন্তু সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের ২০ দিন পার হওয়ার আগেই গতকাল মঙ্গলবার মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ সেই সাময়িক স্থগিতাদেশ বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয়। এর ফলে ২১ আগস্ট পর্যন্ত ইরানের তেল উৎপাদন ও বিক্রির যে লাইসেন্স দেওয়া হয়েছিল, তা বাতিল হয়ে যায়।
ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ গালিবাফ তেলের ওপর পুনরায় নিষেধাজ্ঞা আরোপকে সমঝোতা স্মারকের ‘বড় ধরনের লঙ্ঘন’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। একইসঙ্গে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে মার্কিন হামলাকে তিনি স্মারকের চরম লঙ্ঘনও বলে উল্লেখ করেন।
মূলত হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনার পর মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ এই পদক্ষেপ নেয়। ব্রিটিশ মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনসের তথ্যমতে, গত সোমবার ওমান উপকূলে একটি কাতারি এলএনজি ট্যাঙ্কারে হামলার ঘটনা ঘটে।
ইরানি টেলিভিশনের খবরে বলা হয়, সতর্কবার্তা উপেক্ষা করায় ওই ট্যাঙ্কারে হামলা চালানো হয়। যদিও তেহরান সরাসরি এই হামলার দায় স্বীকার করেনি। এ ছাড়া রয়টার্স জানায়, আইআরজিসির ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রে একটি সৌদি তেলবাহী জাহাজও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
হোয়াইট হাউস থেকে আল জাজিরার প্রতিনিধি মাইক হানা জানান, যুক্তরাষ্ট্র দাবি করছে, ইরান যুদ্ধবিরতির শর্ত বা সমঝোতা স্মারক লঙ্ঘন করায় তারা এই পাল্টা হামলা চালাচ্ছে।
মূলত হরমুজের পথ নিয়ে দ্বন্দ্বই এখানে বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইরান চায়, জাহাজগুলো তাদের নিয়ন্ত্রিত উত্তর দিকের পথ দিয়ে চলুক, আর যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ দিকের একটি সুরক্ষিত পথ ব্যবহারের ওপর জোর দিচ্ছে।
ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক পোস্টে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারকের ১০ নম্বর অনুচ্ছেদের স্পষ্ট লঙ্ঘন। এ ছাড়া ইরানের ওপর সামরিক অভিযান ১ ও ২ নম্বর অনুচ্ছেদের গুরুতর লঙ্ঘন।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, ইসরায়েলি বাহিনীর মাধ্যমে লেবাননে হামলা চালিয়ে এবং ইরানের বিরুদ্ধে হুমকিমূলক বিবৃতি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বারবার এই সমঝোতা স্মারক লঙ্ঘন করেছে।
