এবারের বিশ্বকাপে বিস্ময় জাগানো নরওয়ে আরও একবার চমক দেখিয়ে নিয়ে নিল লিড। তবে দমে না গিয়ে জুড বেলিংহ্যামের নৈপুণ্যে অসাধারণভাবে ঘুরে দাঁড়াল ইংল্যান্ড। ফের জ্বলে উঠে টানা দ্বিতীয় ম্যাচে এই মিডফিল্ডার করলেন জোড়া গোল। তার কাঁধে চেপে অতিরিক্ত সময়ে গড়ানো লড়াইয়ে জিতে আসরের সেমিফাইনালে উঠল টমাস টুখেলের শিষ্যরা।
মায়ামিতে বাংলাদেশ সময় রোববার সকালে অনুষ্ঠিত জমজমাট কোয়ার্টার ফাইনালে নরওয়েকে ২-১ গোলে হারিয়েছে ১৯৬৬ সালের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ইংল্যান্ড। এর আগে নির্ধারিত ৯০ মিনিটের খেলায় ছিল ১-১ ব্যবধানে সমতা।
প্রথমার্ধের ৩৬তম মিনিটে আন্দ্রেয়াস শেলদেরাপের গোলে নরওয়ে এগিয়ে যাওয়ার পর যোগ করা সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে ম্যাচে সমতা টানেন বেলিংহ্যাম। দ্বিতীয়ার্ধে কোনো দলই লক্ষ্যভেদ করতে পারেনি। ফলে খেলা গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। ৯৩তম মিনিটে ফের মঞ্চে আবির্ভূত হন সুযোগসন্ধানী বেলিংহ্যাম। তার আরেকটি গোল গড়ে দেয় দুই পক্ষের মধ্যে ব্যবধান।
বিশ্বকাপের মঞ্চে এই নিয়ে চতুর্থবার সেমিফাইনালে উঠল ইংলিশরা। শেষবার তারা শেষ চারে খেলেছিল ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপে। অন্যদিকে, আর্লিং হালান্ডদের স্বপ্নযাত্রা থামল কোয়ার্টার ফাইনালে। এর আগে তিনবার বিশ্বকাপে খেলে দুটি ম্যাচ জেতা নরওয়ে এবার জিতেছে চারটিতে।
অতিরিক্ত সময়ের খেলা শুরু হওয়ার মাত্র তিন মিনিটের মাথায় মর্গান রজার্সের দূরপাল্লার শট নরওয়ের গোলরক্ষক ওরিয়ান নিলান্ড লুফে নিতে ব্যর্থ হন। ফিরতি বল জালে জড়াতে একদম ভুল করেননি ডি-বক্সে সুযোগের অপেক্ষায় থাকা বেলিংহ্যাম। তার এই লক্ষ্যভেদে ৬৪ হাজার ৪৭৮ জন দর্শকের উপস্থিতিতে গ্যালারিতে থাকা সাদাজার্সিধারী সমর্থকরা উল্লাসে মেতে ওঠেন।
এই জয়ের ফলে আটলান্টায় অনুষ্ঠেয় সেমিফাইনালে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা অথবা সুইজারল্যান্ডের মুখোমুখি হবে ইংল্যান্ড। ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হবে বাংলাদেশ সময় অনুসারে আগামী বুধবার রাতে।
নরওয়ে হয়তো সুযোগগুলো লুফে নিতে না পারার আক্ষেপে পুড়বে। যদিও তাদের সেরা তারকা হালান্ড ছিলেন একেবারে নির্বিষ। জাতীয় দলের জার্সিতে গত ১৬টি ম্যাচের মধ্যে এই প্রথম গোলহীন থাকলেন এই স্ট্রাইকার। তারপরও দীর্ঘ ২৮ বছর পর বিশ্বকাপে ফেরা নরওয়ে মাথা উঁচু করেই বিদায় নিচ্ছে।
সম্ভবত প্রচণ্ড গরমের কারণে প্রথমার্ধের শুরুতে দুই দলই কিছুটা মন্থর ও সতর্ক ছিল। তবে ৩৫তম মিনিটে ম্যাচটি প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে যখন ইউলিয়ান রায়ারসনের ক্রসে হালান্ড জোরালো হেড করেন। কিন্তু ইংল্যান্ডের গোলরক্ষক জর্ডান পিকফোর্ড তা সহজে রুখে দেন।
ঠিক এক মিনিট পর মাঝমাঠের কাছাকাছি হ্যারি কেইনের কাছ থেকে বল কেড়ে নেন প্যাট্রিক বার্গ এবং বাম প্রান্তে থাকা শেলদেরাপের দিকে পাস বাড়িয়ে দেন। এই উইঙ্গার ইংল্যান্ডের ফুলব্যাক এজরি কনসাকে দারুণভাবে বোকা বানিয়ে কোণাকুণি শট নেন, যা চমক জাগিয়ে সরাসরি জালে জড়ায়। গোলের আগে কেইনকে ফাউল করা হয়েছে এমন অভিযোগ উঠলেও রেফারি কান দেননি।
এই গোলে ইংল্যান্ড বেশ ধাক্কা খায় এবং নরওয়ে এগিয়ে যাওয়ার পূর্ণ সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করে। কিছুক্ষণ পর আলেক্সান্ডার সরলথের জোরালো শট বারের ওপর দিয়ে চলে যায় এবং মার্টিন ওডেগার্ডের নিচু শট পিকফোর্ড প্রতিহত করেন।
৪৪তম মিনিটে নরওয়ের ব্যবধান দ্বিগুণ করার সুবর্ণ সুযোগ ছিল। ইংল্যান্ডের সীমানায় সুবিধাজনক জায়গায় পৌঁছে গিয়েছিলেন সরলথ ও ডি-বক্সে ফাঁকায় ছিলেন হালান্ড। কিন্তু সরলথ হালান্ডকে পাস না দিয়ে নিজেই শট নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে তা কাজে লাগেনি।
প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে এই সুযোগ নষ্ট করার খেসারত দিতে হয় নরওয়েকে। ডি-বক্সের মাথায় অ্যান্থনি গর্ডনের চতুর পাস থেকে দুই ডিফেন্ডারকে এড়িয়ে গোল করে ইংল্যান্ডকে সমতায় ফেরান বেলিংহ্যাম।
প্রথমার্ধের বাকি সময়টায় ছিল ইংল্যান্ডেরই আধিপত্য। কেইন বল জালে জড়ালেও ভিএআর প্রযুক্তির মাধ্যমে তা বাতিল করা হয় অফসাইডের কারণে।
দ্বিতীয়ার্ধের খেলা শুরু হওয়ার ১০ মিনিটের মাথায় আবার ভিএআরের হস্তক্ষেপ দেখা যায়। কর্নার থেকে টোরবিয়র্ন হেগে নরওয়েকে ফের এগিয়ে নিয়েছেন বলে মনে হলেও এই গোলটিও বাতিল করা হয়। কারণ ডি-বক্সে হালান্ড ইংল্যান্ডের এলিয়ট অ্যান্ডারসনকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছিলেন।
৬৭তম মিনিটে দুই গতিময় উইঙ্গার অস্কার বব ও অ্যান্টোনিও নুসাকে মাঠে নামালে নরওয়ে আবারও ম্যাচে আধিপত্য বিস্তার শুরু করে। এরপর ডেভিড মোলার উলফের হেড পিকফোর্ডের মাথার ওপর দিয়ে গিয়ে লাগে ক্রসবারে। ফলে সেই যাত্রায় ইংল্যান্ড ভাগ্যক্রমে বেঁচে যায়।
ইংল্যান্ডের হয়ে বদলি নামা বুকায়ো সাকা ৮৭তম মিনিটে একটি দুর্দান্ত সুযোগ তৈরি করেন। তিনি বাইলাইনের কাছাকাছি পৌঁছে ডি-বক্সের ভেতরে বিপজ্জনক জায়গায় নিচু ক্রস বাড়ান। কিন্তু তার সতীর্থদের কেউই বলে পা ছোঁয়াতে পারেননি।
অতিরিক্ত সময়ে বেলিংহ্যামের দ্বিতীয় গোলের পর আরও একবার ভিএআর কেড়ে নেয় সব আলো। এবার এবেরিচি এজেকে ফাউলের কারণে ইংল্যান্ডকে দেওয়া পেনাল্টির সিদ্ধান্ত বাতিল করেন রেফারি।
এই টুর্নামেন্টে সাত গোল করা হালান্ড অতিরিক্ত সময়ের প্রথমার্ধ শেষে মাঠ ছাড়েন। বাকি সময়ে সমতা ফেরাতে মরিয়া হয়ে আক্রমণ করলেও সফল হয়নি নরওয়ে। তাদেরকে আটকে রেখে ইংল্যান্ড মাঠ ছাড়ে কাঙ্ক্ষিত জয় নিয়ে।
