খেলাধুলার ইতিহাসে কত বিচিত্র ঘটনাই না ঘটে! তবে এবার বিশ্বকাপ ফুটবলের কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনা বনাম সুইজারল্যান্ডের ম্যাচে যা ঘটল, তা ফুটবলপ্রেমীরা বহুদিন মনে রাখবেন। ভুল খেলোয়াড়কে কার্ড দেখানোর এক অদ্ভুত নাটকীয় ঘটনার সাক্ষী হলো কানসাস সিটি স্টেডিয়াম। আর এই ‘ভুল পরিচয়’ বা ‘মিস্টেকেন আইডেন্টিটি’-র গ্যাঁড়াকলে পড়ে লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়তে হলো সুইস ফরোয়ার্ড ব্রিল এমবোলোকে।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে এটিই ‘মিস্টেকেন আইডেন্টিটি’র কারণে লাল কার্ড দেখার প্রথম ঘটনা। তবে এই নিয়ম বিশ্বকাপের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও প্যারাগুয়ের ম্যাচেও একবার ব্যবহৃত হয়েছে। সেই ম্যাচে প্রথমে মিগুয়েল আলমিরনকে ফাউল করার দায়ে যুক্তরাষ্ট্রের ডিফেন্ডার টিম রিমকে হলুদ কার্ড দেখান ডাচ রেফারি ড্যানি ম্যাকেলি। প্যারাগুয়ে ফ্রি-কিক নেওয়ার পর ভিএআরের পরামর্শে তিনি মনিটরে গিয়ে ঘটনাটি আবার পর্যালোচনা করেন।
রিপ্লে দেখে নিজের সিদ্ধান্ত বদলে ফেলেন ম্যাকেলি। রিমের হলুদ কার্ড প্রত্যাহার করে তিনি বরং আলমিরনকেই ‘সিমুলেশনের’ দায়ে হলুদ কার্ড দেখান। এর আগে আন্তর্জাতিক ফুটবলে এমন পরিস্থিতিতে রেফারিদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের সুযোগ ছিল না। নতুন নিয়মের ফলে এখন রেফারিদের সেই ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।
ঠিক কী ঘটেছিল মাঠে?
ম্যাচের তখন ৭২ মিনিটের খেলা চলছে। সমতা ভাঙার তীব্র লড়াইয়ে মুখোমুখি দুই দল। এমন সময় আর্জেন্টিনার লিয়ান্দ্রো পারেদেসের সঙ্গে সুইজারল্যান্ডের ব্রিল এমবোলোর একটি সংঘর্ষ হয়। মাঠের রেফারির মনে হয়েছিল পারেদেস ফাউল করেছেন, তাই তিনি ঝটপট পারেদেসকে হলুদ কার্ড দেখান।
কিন্তু নাটকের আসল পর্ব শুরু হলো এর পরেই। ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণের জন্য ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি বা ‘ভিএআর’ দল মাঠের রেফারি জোয়াও পেদ্রো সিলভা পিনহেইরোকে সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানায়।
পারেদেসের শাস্তি কীভাবে এমবোলোর লাল কার্ডে রূপ নিল?
রিপ্লেতে দেখা যায়, পারেদেস আসলে কোনো ফাউলই করেননি; বরং এমবোলো নিজেই ফাউলের অভিনয় (ডাইভিং) করেছিলেন। মাঠের রেফারি প্রথমে বিষয়টি ধরতে না পারলেও ভিএআর-এর দূরবর্তী দল নিখুঁতভাবে ঘটনাটি ধরে ফেলে।
ভিডিও স্ক্রিনে পুরো ঘটনাটি পুনরায় দেখে রেফারি পিনহেইরো মাঠে ফিরে তার আগের সিদ্ধান্ত বদলে ফেলেন।
• প্রথমে পারেদেসের হলুদ কার্ডটি বাতিল করা হয়।
• এরপর ফাউলের অভিনয় করার অপরাধে এমবোলোর নামে হলুদ কার্ড জারি করা হয়।
• এমবোলোর অ্যাকাউন্টে আগে থেকেই একটি হলুদ কার্ড থাকায়, রেফারি পকেট থেকে লাল কার্ড বের করে তাঁকে মাঠ ছাড়ার নির্দেশ দেন।
সুইজারল্যান্ড শিবিরের প্রতিক্রিয়া
হঠাৎ এই সিদ্ধান্ত বদলে সুইস খেলোয়াড় ও তাদের সাইডবেঞ্চ তীব্র প্রতিবাদ জানায়। রেফারির সঙ্গে তাদের বেশ কিছুক্ষণ তর্কাতর্কিও চলে, কিন্তু লাভ কিছুই হয়নি। সিদ্ধান্ত অটল থাকে। এমবোলোর জন্য এই ধাক্কা সহ্য করা কঠিন ছিল। মাঠ ছাড়ার সময় তার চোখে জল দেখা যায় এবং সতীর্থরা তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেন। ম্যাচ শেষে সুইজারল্যান্ডের কোচ মুরাত ইয়াকিন ক্ষুব্ধ হয়ে বলেন, ‘প্রথমত এই ওটা হলুদ কার্ড দেখানোর যৌক্তিকতা নেই। এই সিদ্ধান্ত সত্যিই বোধগম্য নয়। আমি জানি তারা (ফিফা) রেফারিদের প্রতিবারই সুরক্ষা দেবে, কিন্তু এই নিয়মের কারণেই আজকের ম্যাচটা শেষ হয়ে গিয়েছে।’ তবে নিরপেক্ষ ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, ভিএআর-এর সাহায্যে রেফারি শেষ পর্যন্ত সঠিক সিদ্ধান্তটিই নিয়েছেন। যেহেতু পারেদেসকে তিনি হলুদ কার্ড দেখিয়েছিলেন এবং সেটা ভুল ছিলো। কাজেই তার হলুদ কার্ড প্রত্যাহার করে সেটা এমবোলাকে দেখানো ছাড়া উপায় ছিলো না। এমবোলা আগেই আরেকটু হলুদ কার্ড পাওয়ায় সেটা লাল কার্ড হয়ে যায়।
এই ‘মিস্টেকেন আইডেন্টিটি’ আসলে কী?
ফুটবলের নিয়মকানুন নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা আইএফএবি-র মতে, ভুল পরিচয় বা ‘মিস্টেকেন আইডেন্টিটি’ হলো ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া এক মারাত্মক ভুল। এটি তখনই ঘটে, যখন রেফারি কোনো অপরাধের জন্য সম্পূর্ণ ভুল একজন খেলোয়াড়কে হলুদ বা লাল কার্ড দেখিয়ে বসেন। আধুনিক ফুটবলে ভিএআর-এর নতুন নিয়ম অনুযায়ী, এই ধরনের ভুল শুধরে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
ম্যাচের ভাগ্যে এর কী প্রভাব পড়ল?
এমবোলো যখন লাল কার্ড দেখেন, তখন ম্যাচের ফল ছিল ১-১। খেলা শেষ হতে বাকি ছিল মাত্র ২০ মিনিটের মতো। ১০ জনের দল নিয়ে সুইজারল্যান্ড নির্ধারিত সময় পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যায়, এমনকি অতিরিক্ত সময়ের প্রথমার্ধেও আর্জেন্টিনাকে আটকে রাখে। তবে শেষ দিকে আর পেরে ওঠেনি। একজন খেলোয়াড় কম থাকার খেসারত দিতে হলো আরও দুটি গোল খেয়ে। শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনার কাছে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিতে হলো সুইজারল্যান্ডকে।
