অতি বৃষ্টিতে বাড়েনি পাটগাছ, লোকসানে রংপুর অঞ্চলের কৃষক

গত মৌসুমে বাজার ভালো থাকায় রংপুর অঞ্চলের কৃষকরা এবার আরও বেশি পাট চাষে ঝুঁকেছিলেন। তবে মৌসুমের শুরু থেকে অতি বৃষ্টির কারণে স্বাভাবিক উচ্চতা পায়নি পাটগাছ। ফলে কমেছে আঁশের পরিমাণ।

রংপুর অঞ্চলের অধিকাংশ এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, পাটগাছের উচ্চতা এবার স্বাভাবিকের তুলনায় ২ থেকে ৫ ফুট কম। এতে প্রতি বিঘায় গড়ে ৪০ থেকে ৬০ কেজি পর্যন্ত কম পাট উৎপাদন হচ্ছে।

এর আগে তিনটি ফসলে ক্ষতির মুখে পড়েন এই এলাকার কৃষকরা।

গত বছর আট বিঘা জমিতে পাট চাষ করেছিলেন কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার যাদুরচর গ্রামের কৃষক নাদের আলী মণ্ডল। ভালো দামের আশায় এবার তিনি ১০ বিঘা জমিতে আবাদ করেছেন।

তিনি বলেন, গত বছর প্রতি বিঘায় প্রায় ৬ মণ পাট পেয়েছিলাম। এবার ৫ মণের কম ফলন হয়েছে।

একই গ্রামের কৃষক আবেদ আলী বলেন, জীবনে এই প্রথম এত খাটো পাটগাছ দেখলাম।

‘গাছ ছোট হওয়ায় আঁশ কম হয়েছে। দাম ভালো হলেও লাভ হবে না,’ বলেন তিনি।

গত বছর দাম ভালো পাওয়ায় এবার আরও ১ বিঘা জমি লিজ নিয়ে ৬ বিঘা জমিতে পাট চাষ করেন লালমনিরহাট সদর উপজেলার গোকুন্ডা গ্রামের কৃষক তাজুল ইসলাম। তিনি জানান, প্রতি বিঘায় এবার প্রায় ১৩ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। গত বছর খরচ প্রায় এক হাজার টাকা কম ছিল।

এদিকে গত বছর ৫ বিঘা জমি থেকে তিনি ২৮ মণ পাট পেয়েছিলেন। এবার পেয়েছেন ২৪ মণ।

‘১ বছরের বেশি সময় ধরে কৃষকরা প্রায় সব ফসলেই লোকসান গুনছে। আলুতে লোকসান হয়েছে, ধানে কোনোমতে খরচ উঠলেও ভুট্টার দাম কম। এবার পাটেও ফলন কমে গেল,’ বলেন রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার চর মহীপুর এলাকার কৃষক আমজাদ হোসেন।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে রংপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, গাইবান্ধা ও নীলফামারী—এই ৫ জেলায় প্রায় ৫০ হাজার হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয়েছে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টন।

গত মৌসুমে ৪৮ হাজার ৩৪৫ হেক্টর জমি থেকে উৎপাদিত হয়েছিল প্রায় ১ লাখ ৫৬০ টন পাট। এবারও সবচেয়ে বেশি আবাদ হয়েছে কুড়িগ্রাম জেলায়।

যোগাযোগ করা হলে রংপুর আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘সাধারণত একটি পাটগাছের উচ্চতা ৮ থেকে ১৩ ফুট হয় এবং প্রতি বিঘায় ৫ থেকে ৭ মণ পাট উৎপাদিত হয়। কিন্তু এ বছর বীজ বপন ও চারা বৃদ্ধির সময় অতি বৃষ্টিতে গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়েছে। গাছের উচ্চতা ২ থেকে ৫ ফুট পর্যন্ত কম হয়েছে। ফলে বিঘাপ্রতি ৪০ থেকে ৬০ কেজি পর্যন্ত ফলন কমেছে।’

মার্চের মাঝামাঝি থেকে এপ্রিলের মাঝামাঝি পর্যন্ত পাটের বীজ বপন করা হয়। জুনের শেষ ভাগে পাট কাটা শুরু হয়।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুসারে, জুনে দেশে স্বাভাবিকের তুলনায় ২৯ শতাংশ কম বৃষ্টি হলেও মার্চ, এপ্রিল ও মে মাসে ছিল অনেক বেশি।

মার্চে সারা দেশে গড়ে স্বাভাবিকের চেয়ে ৩১ শতাংশ বেশি বৃষ্টি হয়েছে। এপ্রিলে স্বাভাবিকের চেয়ে ৭৫ শতাংশের বেশি বৃষ্টি হয়।

রংপুরে এপ্রিল মাসে স্বাভাবিক বৃষ্টিপাত ১০৯ মিলিমিটার। তবে সেখানে হয়েছে ২০৫ মিলিমিটার, যা স্বাভাবিকের তুলনায় ৮৭ দশমিক ১ শতাংশ বেশি।

মে মাসে দেশের গড় স্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ২৬৯ মিলিমিটার। তবে সারা দেশে গড়ে ২৮৯ মিলিমিটার—অর্থাৎ ৭ দশমিক ৪ শতাংশ বেশি বৃষ্টি রেকর্ড করেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। আর রংপুর বিভাগে স্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ২৬৪ মিলিমিটার, সেখানে ৫১৩ মিলিমিটার—৯৮ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি বৃষ্টি হয়েছে।

রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, পাট চাষের জন্য এপ্রিল ও মে মাসে ১৫০ থেকে ২০০ মিলিমিটার বৃষ্টি যথেষ্ট।

সিরাজুল জানান, এ পর্যন্ত প্রায় ৩০ শতাংশ পাট কাটা হয়েছে। ৭০ শতাংশ পাট এখনো জমিতে আছে। আগামী ১ মাসের মধ্যে বাজারে নতুন পাট আসতে শুরু করবে।

এই মৌসুমে উৎপাদন খরচ উঠবে কি না তা নিয়ে সংশয়ে আছেন কৃষকরা। বাংলাদেশ পাট অধিদপ্তরের রংপুর অঞ্চলের মুখ্য পরিদর্শক তারানা আফরোজ সজনী বলেন, গত বছর কৃষক প্রতি মণ পাট সর্বোচ্চ সাড়ে ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি করেছিলেন। এবার এখনো বাজারে নতুন পাটের ব্যাপক সরবরাহ শুরু হয়নি। সরবরাহের ওপর দাম নির্ভর করবে। কোনো অসাধু ব্যবসায়ী যাতে মজুত করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করতে না পারে, সেদিকেও নজর রাখা হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, কৃষকদের পাট চাষে উৎসাহ দিতে পাট অধিদপ্তর প্রতি বছর উন্নতমানের বীজ ও সার প্রণোদনা হিসেবে দিয়ে থাকে।

Related Articles

Latest Posts