একটা জাহাজের খোলের ভেতর অন্ধকার। কাঠ কাঁপছে ঢেউয়ের ধাক্কায়। ম্যাট ডেমনের মুখে নোনা পানির দাগ শুকিয়ে সাদা হয়ে আছে, চোখদুটো তবু স্থির। ক্রিস্টোফার নোলানের দ্য ওডিসি এখনো পুরোপুরি পর্দায় আসেনি, কিন্তু তার আগে থেকেই একটা প্রশ্ন বাতাসে ভাসছে। তিন হাজার বছরের পুরনো একটা মহাকাব্যকে হলিউডের সবচেয়ে নিয়ন্ত্রিত, সবচেয়ে জ্যামিতিক মস্তিষ্কের একজন পরিচালক কীভাবে ধরবেন?
উত্তরটা লুকিয়ে আছে নোলানের নিজের একটা স্বীকারোক্তিতে। সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, গল্প বলার যেসব কৌশলকে তিনি নিজের আবিষ্কার ভাবতেন, তার শিকড় আসলে হোমারের কাছে। মানে এই সিনেমাটা তার জন্য নতুন কোনো জগৎ না। এটা তার ফেলে আসা ঘরে ফেরা।
সিনেমাটার কেন্দ্রে আছে একটা যাত্রা, ট্রয় থেকে ইথাকা, আর সেই যাত্রার প্রতিটা স্টপে বিপদ, প্রলোভন, দেবতাদের রোষ। নোলান এই উপাদানগুলোকে যেভাবে সাজিয়েছেন, তাতেই স্পষ্ট, তিনি স্পেক্টাকল বানাতে চাননি শুধু। তিনি চেয়েছেন এমন একটা যাত্রা, যেটা দেখতে দেখতে দর্শক ভুলে যাবে এটা মহাকাব্য না বাস্তব। ওডিসিউস চরিত্রটা নিয়ে তার নিজের ব্যাখ্যাটাই এখানে সবচেয়ে জরুরি সূত্র।
তিনি বলেছেন, এই চরিত্র প্রচলিত অর্থে নায়ক না। বুদ্ধিমান, কৌশলী, আর নৈতিকভাবে অনেকটা ধূসর। রসিকতা করে বলেছেন, স্টার ওয়ার্সের ভাষায় ধরলে ওডিসিউস লুক স্কাইওয়াকার না, হান সোলোর কাছাকাছি। এই একটা বাক্যেই বোঝা যায়, কেন ম্যাট ডেমন। কারণ যে মানুষটা মিথ্যা বলে, ফাঁকি দেয়, নিজের বেঁচে থাকার জন্য দেবতাদের সঙ্গেও চাল চালে, তাকে দর্শকের ভালোবাসতে হলে তার মুখে এমন কিছু থাকতে হয় যেটা বিশ্বাস করা যায়। ডেমনের চোখে সেই বিশ্বাসযোগ্যতা আছে, ক্লান্তির নিচেও এক ধরনের সততা।
সিনেমার দৃশ্যগুলোর কথা ভাবলে বোঝা যায়, নোলান এখানে সময়কে ভাঙেননি, প্যাঁচাননি। তিনি নিজেই বলেছেন, লিখতে বসলে তিনি এক পাতা থেকে শুরু করে টানা শেষ পাতা পর্যন্ত এগিয়ে যান, কোনো লাফ না দিয়ে। এই তথ্যটা ছোট শোনালেও দ্য ওডিসির জন্য এটা প্রায় একটা ঘোষণার মতো। যে মানুষ মেমেন্টোতে সময় উল্টে দিয়েছিলেন, ইনসেপশনে স্বপ্নের স্তরে স্তরে ঘুরিয়েছিলেন, তিনিই এবার সবচেয়ে পুরনো রৈখিক গল্পটার সামনে দাঁড়িয়ে জটিলতার আশ্রয় নেননি। পর্দায় তাই সময়টা সোজা বইবে, সমুদ্রের মতো, ঢেউয়ে ঢেউয়ে এগোবে কিন্তু দিক বদলাবে না। এই সিদ্ধান্তটাই সিনেমাটাকে একটা অদ্ভুত সরলতা দিয়েছে, নোলানের কাজে যা বিরল।
লেখার প্রক্রিয়াটা নিয়ে তার নিজের বর্ণনায় একটা ছবি স্পষ্ট হয়। প্রথমে শুধু নোট, ছড়ানো ছিটানো লাইন, কোনো সংলাপ নেই। তারপর অনেকদিন ধরে শুধু ভাবা, গল্পটাকে মাথার ভেতর ঘুরতে দেওয়া, কোনো তাড়া নেই। তারপর হঠাৎ একদিন লেখা শুরু, আর থামা নেই এক টানে শেষ পর্যন্ত। এই ধৈর্যটাই বোধহয় ওপেনহাইমারের সঙ্গেও তার একটা সেতু বানায়, দুটো কাজেই তিনি এমন এক চরিত্রের ভেতর ঢুকেছেন যাকে পুরোপুরি বোঝা যায় না এক বসায়। ধীরে ধীরে, স্তরে স্তরে বুঝতে হয়।
কিন্তু আসল টান তৈরি হয় অন্য জায়গায়। সমুদ্রদৃশ্যের ফাঁকে, যুদ্ধের গর্জনের মাঝে, সিনেমাটা বারবার থেমে যায় একটা মুখের কাছে। পেনেলোপির চোখ, টেলিমেকাসের অপেক্ষা, একটা ঘর যেখানে বছরের পর বছর কেউ ফিরছে না। নোলান নিজের সাক্ষাৎকারে এই জায়গাটাতেই সবচেয়ে বেশি থমকে গেছেন। সিনেমা বানাতে গিয়ে তাকে বারবার লম্বা সময় পরিবার থেকে দূরে কাটাতে হয়েছে, একজন বাবা হিসেবে সেই শূন্যতা তিনি গভীরভাবে টের পান। এই কথাটা বলার সময় সাক্ষাৎকারে তার গলার সুরটাও বদলে গিয়েছিল বলে জানা যায়। আর সেই ব্যক্তিগত শূন্যতাই পর্দায় ফিরে আসে অন্যভাবে। ওডিসিউসের ঘরে ফেরার আকাঙ্ক্ষা যখন স্ক্রিনে ফুটে ওঠে, ওই দৃশ্যগুলোয় একটা বাড়তি ওজন টের পাওয়া যায়, যেটা শুধু অভিনয় দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। পরিচালক নিজেই যেন ক্যামেরার পেছনে দাঁড়িয়ে নিজের অনুপস্থিতির হিসাব মেলাচ্ছেন।
এখানেই সিনেমাটার আসল জোরটা। এটা শুধু একটা যুদ্ধফেরত সৈনিকের বাড়ি ফেরার গল্প না। এটা একজন পরিচালকের গল্প, যিনি বাড়ি থেকে দূরে দাঁড়িয়ে বাড়ি ফেরার গল্প বানাচ্ছেন, আর সেই দূরত্বটাই তার কাজে সততা যোগ করছে। শুটিং ফ্লোরে যখন সমুদ্রের ঢেউ বানানো হচ্ছে, তখন হয়তো নোলানের নিজের মেয়ে বা ছেলে বাড়িতে অপেক্ষা করছে তার ফেরার জন্য, ঠিক যেমন টেলিমেকাস অপেক্ষা করে ওডিসিউসের জন্য। এই সমান্তরালটা সিনেমার ভেতরে কোথাও লেখা নেই, কিন্তু দর্শক যদি জানে, তাহলে প্রতিটা ফেরার দৃশ্য অন্যভাবে বাজবে বুকে।
সিনেমাটা দেখতে দেখতে একটা প্রশ্ন এড়ানো যায় না। যে মানুষ নিজের জীবনে বারবার বাড়ি থেকে সরে গেছেন কাজের জন্য, তিনি কি সত্যিই বুঝবেন ফেরার টানটা? নাকি এই দূরত্বই তাকে যোগ্য করে তুলেছে এই গল্পটা বলার জন্য? নোলান নিজে এর কোনো পরিষ্কার উত্তর দেননি। শুধু বলেছেন, ওপেনহাইমারের মতোই এই কাজটাও তার মনে অনেক অনুত্তরিত প্রশ্ন রেখে গেছে। কাজ শেষ, প্রশ্ন শেষ হয়নি।
হোমারের গল্পে ওডিসিউস শেষ পর্যন্ত ইথাকায় ফেরেন ঠিকই। কিন্তু সেই ফেরাটাও সহজ কোনো সমাপ্তি না। এত বছরের যুদ্ধ আর সমুদ্র পেরিয়ে যে মানুষটা ঘরে ঢোকে, ঘরটা তখন আর আগের মতো নেই, মানুষটাও না। নোলানের সিনেমা যদি এই জায়গাটা ধরতে পারে, সমুদ্র পেরোনোর রোমাঞ্চ না, ফেরার পরের নীরবতাটা, তাহলে এটা শুধু আরেকটা এপিক থাকবে না। প্রেক্ষাগৃহের বাতি জ্বলার পর দর্শক হয়তো নিজের ঘরে ফেরার পথে একবার ভাববে, শেষবার কবে তারা নিজেরাও সত্যিই ফিরেছিল কারও কাছে। জাহাজ ততক্ষণে বন্দরে, ঢেউ থেমে গেছে। কিন্তু ওডিসিউসের চোখে তখনো সমুদ্রটা লেগে আছে।
