এবারের বিশ্বকাপ শুরুর আগে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, ৯৬ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে জমকালো ও বড় আসর হতে যাচ্ছে এই বিশ্বকাপ।
বাস্তবেও তাই হয়েছে।
এবার বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছে রেকর্ডসংখ্যক ৪৮টি দল। ম্যাচও হয়েছে অন্য যেকোনো আসরের চেয়ে বেশি। স্বাভাবিকভাবেই গোল আর আয়োজক শহরের সংখ্যাতেও তৈরি হয়েছে নতুন রেকর্ড।
আর মাঠের লড়াইয়ে লিওনেল মেসি, কিলিয়ান এমবাপে, জুড বেলিংহ্যাম ও আর্লিং হালান্ডের মতো তারকারা দর্শকদের উপহার দিয়েছেন নজরকাড়া এক ফুটবল মহোৎসব।
বিশ্বকাপের পরিধি যত বেড়েছে, ততই বেড়েছে আয়ও। আর সেইসঙ্গে ইতিহাসের সর্বোচ্চ অঙ্কের প্রাইজমানি পেতে যাচ্ছেন অংশগ্রহণকারী দলগুলো।
ফাইনালের আগে বিশ্বকাপের এই প্রাইজমানি নিয়ে চলছে আলোচনা-সমালোচনা।
বিশ্বকাপের এই প্রাইজমানি কীভাবে ভাগ করা হচ্ছে, চ্যাম্পিয়ন দল কত অর্থ পাচ্ছে—এসব তথ্য নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের খেলাধুলা বিষয়ক বিভাগ দ্য অ্যাথলেটিক।
প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ডিসেম্বরে ফিফা ২০২৬ বিশ্বকাপের জন্য রেকর্ড ৬৫ কোটি ৫০ লাখ ডলার প্রাইজ ফান্ড ঘোষণা করে। চার বছর আগে কাতারে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ বেশি এবারের প্রাইজমানি।
নিয়ম অনুযায়ী, টুর্নামেন্টে অংশ নেওয়া ৪৮টি দলের প্রত্যেকে ন্যূনতম ১ কোটি ৫ লাখ ডলার পাচ্ছে।
এর মধ্যে গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নেওয়া দলগুলো পেয়েছে ৯০ লাখ ডলার, সঙ্গে তাদের প্রস্তুতি খরচ বাবদ দেওয়া হয়েছে আরও ১৫ লাখ ডলার।
চ্যাম্পিয়ন দল: ফাইনালে স্পেন ও আর্জেন্টিনার মধ্যকার বিজয়ী দল পাবে ৫ কোটি ডলার।
রানার্স-আপ: রানার্স-আপ দল পাবে ৩ কোটি ৩০ লাখ ডলার।
তৃতীয় স্থান: তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে এবার ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের মধ্যকার জয়ী দল পাবে ২ কোটি ৯০ লাখ ডলার।
চতুর্থ স্থান: চতুর্থ স্থানে থাকা দলটির পকেটে যাবে ২ কোটি ৭০ লাখ ডলার।
এছাড়া, কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায় নেওয়া মরক্কো, বেলজিয়াম, নরওয়ে ও সুইজারল্যান্ড—প্রতিটি দল পাবে ১ কোটি ৯০ লাখ ডলার করে।
শেষ ষোলো থেকে বিদায় নেওয়া ৮টি দলকে দেওয়া হবে ১ কোটি ৫০ লাখ ডলার করে।
আর শেষ ৩২-এর লড়াই থেকে ছিটকে যাওয়া ১৬টি দল পেয়েছে ১ কোটি ১০ লাখ ডলার করে।
দ্য অ্যাথলেটিক জানায়, এই পুরস্কারের অর্থ সরাসরি প্রতিটি দেশের ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন বা ফেডারেশনকে দেওয়া হয়। ফেডারেশনগুলো পরে সিদ্ধান্ত নেয় এর কতটুকু খেলোয়াড় ও কোচদের দেওয়া হবে এবং কতটা দেশের ফুটবলের সামগ্রিক উন্নয়নে ব্যবহার করা হবে।
যেমন, শেষ ষোলোতে বেলজিয়ামের কাছে হেরে বিদায় নেওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র পাচ্ছে ১ কোটি ৫০ লাখ ডলার।
চুক্তি অনুযায়ী, এই অর্থের ৮০ শতাংশ সমানভাবে ভাগ করে দেওয়া হবে পুরুষ ও নারী জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে। তবে শর্ত রয়েছে, আগামী বছর ব্রাজিলে অনুষ্ঠেয় নারী বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করতে হবে দলকে।
অন্যদিকে, ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়রা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন থেকে ম্যাচ প্রতি দুই হাজার ৬৯০ ডলার ফি পান, যা তারা দাতব্য সংস্থায় দান করে দেন।
বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার চার বছরের (২০২৩–২০২৬) আর্থিক চক্রে মোট আয়ের পূর্বাভাস দেওয়া হয় ১ হাজার ৩০০ কোটি ডলার।
সেই হিসাবে মোট আয়ের প্রায় ৬ দশমিক ৫ শতাংশ অর্থ প্রাইজমানি হিসেবে দলগুলোর পেছনে খরচ করছে ফিফা।
এর আগের চার বছরের আর্থিক চক্রে সংস্থাটির আয়ের পরিমাণ ছিল ৭৬০ কোটি ডলার।
কাতার বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হয়ে আর্জেন্টিনা পেয়েছিল ৪ কোটি ২০ লাখ ডলার। আর এবারের চ্যাম্পিয়নরা পাচ্ছে ৫ কোটি ডলার। যা গত বিশ্বকাপের তুলনায় ৮০ লাখ ডলার বেশি।
এ ছাড়া, রানার্সআপ দল ২০২২ সালের তুলনায় ৩০ লাখ ডলার বেশি পাচ্ছে। তৃতীয় ও চতুর্থ হওয়া দলগুলোর প্রাইজমানিও বেড়েছে ২০ লাখ ডলার করে।
ফিফা প্রথম বিশ্বকাপের প্রাইজমানির তথ্য প্রকাশ করে ১৯৮২ সালে। সে বছর ইতালি চ্যাম্পিয়ন হয়ে পেয়েছিল মাত্র ২২ লাখ ডলার। তখন পুরো টুর্নামেন্টের মোট প্রাইজমানি ছিল ২ কোটি ডলার।
এরপর প্রতিটি বিশ্বকাপেই প্রাইজমানির অঙ্ক বেড়েছে। ৪৪ বছর আগে ইতালি যে অর্থ পেয়েছিল, ২০২৬ সালে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দল পাচ্ছে তার চেয়ে ২০ গুণ বেশি।
বিশ্বকাপজয়ী দলের ২৬ জন খেলোয়াড় ও কোচিং স্টাফের প্রত্যেকে একটি করে স্বর্ণপদক পান।
রানার্সআপ দলের সদস্যরা পান রৌপ্যপদক, আর তৃতীয় স্থান অর্জনকারী দল পায় ব্রোঞ্জপদক।
১৯৭৮ সালের আগে শুধু ফাইনালে খেলা ১১ জন খেলোয়াড়কেই পদক দেওয়া হতো। পরবর্তীতে ২০০৭ সালে ফিফা ঘোষণা করে যে, ১৯৭৪ সাল বা তার আগের বিশ্বকাপগুলোতে যারা স্কোয়াডে থেকেও ফাইনালে খেলার সুযোগ পাননি, এমন খেলোয়াড়দেরও সম্মান জানাতে পদক দেওয়া হবে।
ফাইনালের ম্যাচ কর্মকর্তারাও তাদের পারফরম্যান্সের স্বীকৃতি হিসেবে বিশেষ পদক পান।
প্রতি বিশ্বকাপ আসরেই ব্যক্তিগত নৈপুন্য দেখিয়ে সেরা পুরস্কার জিতে নেন কিছু ফুটবলার। এর মধ্যে টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় পান গোল্ডেন বল, সেরা গোলরক্ষক জেতেন গোল্ডেন গ্লাভস আর আসরজুড়ে সর্বোচ্চ গোলদাতা জিতে নেন গোল্ডেন বুট পুরস্কার।
তবে এসব ব্যক্তিগত পুরস্কারের সঙ্গে কোনো অর্থ পুরস্কার নেই। পুরস্কারজয়ীরা পাবেন শুধু ফুটবল ইতিহাসে নিজেদের নাম লেখানোর গৌরব।
এবার গোল্ডেন বুটের লড়াই চলছে আর্জেন্টিনার লিওনেল মেসি ও ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপের মধ্যে। দুজনেই ৮টি গোল করে দুর্দান্ত ফর্মে রয়েছেন। শেষ পর্যন্ত কে পাবেন এই শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট, তা দেখতে উন্মুখ হয়ে আছে গোটা বিশ্ব।
