অভিনয়শিল্পী ফারুক আহমেদ টেলিভিশন নাটক ও চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে দর্শকের কাছে পেয়েছেন বিশেষ জনপ্রিয়তা। নন্দিত কথাসাহিত্যিক ও নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদের লেখা ও পরিচালনায় তিনি অভিনয় করেছেন সবচেয়ে বেশি নাটকে। কাজের সম্পর্কের বাইরেও দুজনের মধ্যে গড়ে উঠেছিল সখ্যতা। হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে ফারুক আহমেদ একটি বইও লিখেছেন।
হুমায়ূন আহমেদকে ঘিরে ফারুক আহমেদের বিশাল স্মৃতির ভাণ্ডার। তবে দ্য ডেইলি স্টারের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বিশেষভাবে তুলে ধরেছেন প্রিয় মানুষটির সঙ্গে শেষ দেখার স্মৃতি।
ফারুক আহমেদ বলেন, ‘হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে আমার স্মৃতির শেষ নেই। কত শত স্মৃতি যে আছে, বলে শেষ করতে পারব না। তার লেখা ও পরিচালনায় সবচেয়ে বেশি নাটকে অভিনয় করেছি। তিনি আমাকে খুব স্নেহ করতেন, পছন্দ করতেন, ভালোবাসতেন। আমিও তাকে সারাজীবন অসম্ভব শ্রদ্ধা করেছি। এখনও করি।’
ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার পর চিকিৎসার জন্য হুমায়ূন আহমেদ যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। পরে অল্প কিছু দিনের জন্য তিনি দেশে ফিরেছিলেন—মাকে দেখতে এবং কিছুদিন বাংলাদেশে থাকার জন্য। ঢাকায় ফিরে তিনি নুহাশপল্লীতে ওঠেন। খবর পেয়ে তাকে দেখতে যান ফারুক আহমেদ।
সেই দিনের কথা মনে করে তিনি বলেন, ‘যেতে যেতে শুধু ভাবছিলাম, হুমায়ূন আহমেদ কি আগের মতো আছেন? কেমোথেরাপির পর তাকে কেমন দেখাবে? তাকে ওই অবস্থায় দেখে নিজেকে সামলাতে পারব তো?’
নুহাশপল্লীতে পৌঁছে তার সব দুশ্চিন্তা যেন মুহূর্তেই দূর হয়ে যায়।
‘‘গিয়ে দেখি, তিনি কয়েকজনকে নিয়ে গল্প করছেন। আমাকে দেখেই বললেন, ‘আরে ফারুক, এসো। আমার পাশে বসো।’ আমি গিয়ে তার পাশে বসলাম। তিনি গল্প বলতে শুরু করলেন। আর আমি মুগ্ধ হয়ে শুনতে লাগলাম। যত শুনি, ততই বিস্মিত হই। কারণ, তিনি তো কথার জাদুকর। লেখালেখির জগতের এক প্রবাদপুরুষ।’”
সেদিন গল্প করতে করতেই আম খেয়েছিলেন হুমায়ূন আহমেদ। হাসি-আড্ডার একপর্যায়ে তিনি উপস্থিত সবার উদ্দেশে ফারুক আহমেদকে নিয়ে একটি ঘটনা শোনান।
ফারুক আহমেদ বলেন, তিনি বললেন, ‘তোমরা শোনো, ফারুককে নিয়ে একটা গল্প বলি। একবার আমার ছেলে নুহাশের জন্মদিনের অনুষ্ঠান ছিল গুলশানে। কিন্তু ফারুককে দাওয়াত দিতে আমার মনে ছিল না। তবু সে উপহার নিয়ে অনুষ্ঠানে হাজির হয়েছিল। এসে আমাকে বলেছিল, আপনি তো আমাকে দাওয়াত দেননি, তবু আমি এসেছি। সেদিন আমি বুঝেছিলাম, সত্যিকারের ভালোবাসা কাকে বলে। ফারুক আমাকে সত্যিই ভালোবাসে।’
এই কথাগুলো বলতে বলতেই হুমায়ূন আহমেদ চশমা খুলে চোখের পানি মুছে নেন।
‘তার চোখে পানি দেখে আমি নিজেও খুব আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলাম,’ বলেন ফারুক আহমেদ।
সেদিনের আরেকটি ছোট্ট স্মৃতিও আজও স্পষ্ট তার মনে।
“একসময় তিনি আমাকে একটি চশমা দেখিয়ে বললেন, ‘দেখো তো, এটা ভাঙে না। এমন চশমা কখনও দেখেছ?’ তারপর চশমাটা দুই হাতে মোচড় দিয়ে ভাঙার চেষ্টা করলেন। কিন্তু ভাঙল না। হেসে বললেন, ‘দেখলে তো, এটা ভাঙে না।’”
কিছুদিন পর নতুন একটি নাটকের কথাও বলেছিলেন হুমায়ূন আহমেদ।
“বিদায় নেওয়ার আগে তিনি বললেন, ‘আমি একটা নাটক বানাব। তুমি অভিনয় করবে। আমার সহকারী ফোন করলে চলে এসো।’ পরে সত্যিই সেই নাটকের শুটিং শুরু হয়। আমি দুদিন শুটিংও করি। নাটকটি তিনি লিখেছিলেন। কিন্তু অসুস্থতার কারণে পরিচালনা করতে পারেননি। অন্য একজন পরিচালনা করেন। তবে শারীরিক অবস্থা একটু ভালো থাকলে তিনি শুটিং স্পটে এসে চেয়ারে বসে শুটিং দেখতেন।”
সেই নাটকের শুটিং শেষ হওয়ার দিনই হয়েছিল তাদের শেষ দেখা।
ফারুক আহমেদ স্মৃতিচারণ করে বলেন, “শুটিং শেষে তার কাছে গিয়ে বললাম, আমার কাজ শেষ। অনুমতি দিলে ঢাকায় ফিরে যাই। যদি থাকতে বলেন, তাহলে থেকে যাব। তিনি জানতে চাইলেন, ‘তোমার সঙ্গে গাড়ি আছে?’ আমি বললাম, ‘হ্যাঁ।’ এরপর আরও কিছু কথা হলো। তারপর তিনি হেসে বললেন, ‘গুডবাই ফারুক, ভালো থেকো।’”
সম্ভবত পরদিনই হুমায়ূন আহমেদ আবার যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে যান। এরপর আর দেশে ফেরা হয়নি তার। সেই বিদায়ই হয়ে থাকে দুজনের শেষ দেখা।
ফারুক আহমেদ বলেন, ‘তারপর তো তিনি চিরবিদায় নিলেন। আমাদের আর দেখা হয়নি। শেষ দেখার সেই মুহূর্তটা মনে পড়লে আজও মন খারাপ হয়ে যায়। খুব কষ্ট হয়। তার প্রতি আমার শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা আজও একই রকম অটুট।’
