অভিনয় জীবনের ৫০ বছরে আজিজুল হাকিম

অভিনয়শিল্পী আজিজুল হাকিম। নব্বইয়ের দশকের সাড়া জাগানো তারকা অভিনেতাদের অন্যতম। সে সময় টেলিভিশনের অসংখ্য সাপ্তাহিক নাটকে নিয়মিত অভিনয় করে আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা অর্জন করেন তিনি। পাঁচ দশক আগে আরণ্যক নাট্যদলে যোগ দেন। ‘জয়যাত্রা’, ‘শঙ্খনীল কারাগার’সহ বেশ কয়েকটি প্রশংসিত চলচ্চিত্রে অভিনয় করে কুড়িয়েছেন দর্শক-সমালোচকের প্রশংসা।

এ বছর অভিনয় জীবনের ৫০ বছরে পদার্পণ করেছেন আজিজুল হাকিম।

দ্য ডেইলি স্টারের সঙ্গে আলাপচারিতায় তিনি শুনিয়েছেন অভিনয়জীবনের অনেক অজানা গল্প। জানা যাক সেই গল্প।

আজিজুল হাকিম বলেন, ‘ছোটবেলায় যখন হলে গিয়ে সিনেমা দেখতাম, তখন নিজে নিজে ভাবতাম—পর্দার মানুষগুলো কীভাবে জীবন্ত মানুষের মতো কথা বলেন? এটা কীভাবে সম্ভব? বিষয়টি আমাকে খুব অবাক করত। মনে হতো, পরিবারের মানুষের মতো করেই পর্দার ভেতরের মানুষগুলো কথা বলছেন! সিনেমা দেখতে দেখতেই এসব ভাবতাম। পরে বুঝতে পারলাম, এটি অভিনয়। অভিনয়শিল্পীরা ক্যামেরার সামনে অভিনয় করেন, তারপর সেটি সিনেমা হয়ে হলে মুক্তি পায়। কিন্তু বিষয়টি জানার পর আমার কৌতূহল আরও বেড়ে যায়।’

তিনি বলেন, ‘স্কুলে যেসব সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হতো, সেগুলোতে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার জন্য পরিবার থেকেই উৎসাহ পেতাম। অভিনয়ের কোনো আয়োজন থাকলে তাতেও অংশ নিতাম। সেখানে একক অভিনয় হতো, কবিতা আবৃত্তি হতো, ‘যেমন খুশি তেমন সাজো’ নামে একটি পর্বও থাকত।’

‘একক অভিনয় কীভাবে করব, কী ধরনের পোশাক পরব—এসব বিষয়ও পারিবারিকভাবেই শিখেছি। মা-বাবার কাছ থেকেই সবচেয়ে বেশি উৎসাহ পেয়েছি। তাই মাঝে মাঝে মনে হয়, অভিনয়ের স্বপ্নটা ছোটবেলা থেকেই আমার ভেতরে দানা বেঁধেছিল।’

তবে তখন অভিনেতা হওয়ার কথা ভাবেননি তিনি।

‘তখন তো স্কুলে পড়ি। তবে মঞ্চনাটক দেখতাম, অভিনয়ের প্রতি আগ্রহ জন্মাত। স্বপ্ন পূরণ হবে কি না, কীভাবে হবে—তা জানতাম না। তারপরও স্বপ্ন দেখা বন্ধ করিনি।’

আজিজুল হাকিমের বাবা সরকারি চাকরি করতেন। একসময় কর্মসূত্রে যশোরে ছিলেন। সে সময় আজিজুল হাকিম যশোর জেলা স্কুলের ছাত্র।

‘বাবার অফিসে প্রতি বছর বার্ষিক নাটক হতো। মহড়া শুরু হলে আমি প্রতিদিন সেখানে গিয়ে বসে বসে মহড়া দেখতাম। মহড়া দেখতে খুব ভালো লাগত। অভিনয় আমাকে ভীষণ টানত। বাসার কাছেই মহড়ার জায়গা ছিল। সেখানেই স্কুলজীবনে প্রথম নাটকে অভিনয়ের সুযোগ পাই। একদিন একজন আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, অভিনয় করবে? আমি সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে গেলাম। এভাবেই প্রথম মঞ্চে অভিনয় করি।’

পরে ঢাকায় চলে আসেন তিনি।

‘ঢাকায় এসে টেলিভিশনের নাটক দেখতাম, সিনেমা দেখতাম। সবার অভিনয়ই ভালো লাগত। অভিনয়ের প্রতি আগ্রহ আরও বাড়তে থাকে। এরপর বাংলাদেশ টেলিভিশনের তালিকাভুক্ত শিল্পী হওয়ার জন্য অডিশন দিই।’

‘অডিশন দিতে গিয়ে দেখি, সেখানে বসে আছেন হাসান ইমাম, সৈয়দ আহসান আলী সিডনি, মমতাজউদ্দিন আহমেদের মতো গুণী মানুষ। যাদের অভিনয় দেখে বড় হয়েছি, তারা আমার সামনে। তাদের দেওয়া স্ক্রিপ্ট পড়ে ক্যামেরার সামনে অভিনয় করতে গিয়ে খুব নার্ভাস হয়ে পড়ি। কোনো প্রস্তুতি ছিল না। সে কারণে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারিনি। স্বাভাবিকভাবেই খুব মন খারাপ হয়েছিল।’

তবে সেই ব্যর্থতা তাকে থামিয়ে দিতে পারেনি।

সেই সময় কাকরাইলের উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলের কাছে আরণ্যক নাট্যদলের মহড়া হতো। একদিন তিনি নাট্যব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদের সঙ্গে দেখা করতে সেখানে যান।

‘গিয়ে দেখি, মামুন ভাই সাদা পাঞ্জাবি-পাজামা পরে বসে আছেন। তখন ওরা কদম আলী নাটকের মহড়া চলছিল। আমার বন্ধু জুবায়েরের মাধ্যমে সৈয়দ আমীর আলী ভাইয়ের সঙ্গে পরিচয় ছিল। তিনিই আমাকে মামুন ভাইয়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। মামুন ভাই মুচকি হেসে আমার দিকে তাকালেন। এরপর তিনি বললেন, থিয়েটার খুব কঠিন জায়গা। এখানে টিকে থাকতে হলে পরিশ্রম করতে হবে, নিয়মিত চর্চা করতে হবে এবং নিয়ম মেনে চলতে হবে। তা পারলে একদিন হয়তো অভিনয় করতে পারবে।’

‘আমি সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে যাই। এভাবেই আরণ্যক নাট্যদলে আমার যাত্রা শুরু। নিয়মিত মহড়ায় যেতাম। একদিন মামুন ভাই বললেন, শুধু একটি বা দুটি চরিত্র নয়, পুরো নাটকের স্ক্রিপ্ট মুখস্থ করতে হবে। ওরা কদম আলী নাটকের পুরো স্ক্রিপ্টই মুখস্থ করি। শুধু আমি নই, আমার সঙ্গে নতুন যারা ছিলেন, সবাই একই কাজ করেছিলেন।’

‘বেশ কিছুদিন পর ওরা কদম আলী নাটকে অভিনয়ের সুযোগ পেলাম। তবে প্রথম চরিত্রটিতে আমার কোনো সংলাপ ছিল না। সংলাপহীন একটি চরিত্র। তবু ভীষণ উত্তেজিত ছিলাম। কারণ, আরণ্যক নাট্যদলের হয়ে প্রথমবার মঞ্চে উঠব।’

‘পরে একই নাটকে আরেকটি ছোট চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পাই। এবার সংলাপ ছিল। চরিত্রটি ছিল বইয়ের দোকানে বই কিনতে আসা একজন মানুষের। তার আগে আমি সদরঘাটের একজন যাত্রীর চরিত্রে অভিনয় করেছিলাম।’
এরপরই আসে জীবনের বড় একটি সুযোগ।

‘ওরা কদম আলী নাটকে সারেং নামে একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ছিল। বয়স প্রায় ৫০ বছর। চরিত্রটি নোয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলত। আমাদের দলের মুকুল দা চরিত্রটিতে অভিনয় করতেন। কিন্তু চাকরির কারণে একসময় তিনি জানালেন, ঢাকার বাইরে গিয়ে আর নাটক করতে পারবেন না।’

‘সারেং চরিত্রটি আমার মুখস্থ ছিল। শুধু আমার নয়, আরও অনেকেরই মুখস্থ ছিল। তখন টিএসসিতে মহড়া চলছিল। একদিন সাহস করে মামুন ভাইকে বললাম, আমি কি সারেং চরিত্রে অভিনয় করতে পারি?’

‘তিনি একটু ভেবে বললেন, সারেং তো নোয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলে। বয়সও অনেক বেশি। তুমি পারবে?’

‘আমি বললাম, মামুন ভাই, নোয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষাটা আমি পারি।’

‘তিনি আমাকে সময় দিলেন। একদিন অভিনয় করে দেখালাম। তিনি খুব খুশি হলেন। এভাবেই ছোট চরিত্র থেকে বড় চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পেলাম। এরপর যতদিন ওরা কদম আলী নাটকের মঞ্চায়ন হয়েছে, আমিই সারেং চরিত্রে অভিনয় করেছি।’
অভিনয়জীবনে মামুনুর রশীদের অবদানের কথা বলতে গিয়ে আজিজুল হাকিম আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।

‘সত্যি কথা বলতে, মামুনুর রশীদ ভাই-ই আমাদের কারিগর। তিনি শুধু অভিনয় শেখাননি; নাটক লেখা শিখিয়েছেন, নির্দেশনা দেওয়াও শিখিয়েছেন। আমরা যা শিখেছি, তার অনেকটাই তার কাছ থেকে।’

শুধু অভিনয় নয়, নির্দেশক হিসেবেও তার ওপর আস্থা রেখেছিলেন মামুনুর রশীদ।

‘একদিন তিনি পাথর নামে একটি নাটকের পাণ্ডুলিপি আমার হাতে দিয়ে বললেন, এই নাটকটি তুমি নির্দেশনা দেবে।’

‘কথাটি শুনে আমার মন আনন্দে ভরে গিয়েছিল। পরে পাথর নাটকটি মঞ্চস্থ হয়। আমি নির্দেশনা দিই। নাটকটি দর্শক-সমালোচকদের কাছ থেকে খুব ভালো প্রশংসা পায়।’

‘তখন মঞ্চে অভিনয় করছি, নির্দেশনাও দিচ্ছি। কিন্তু আমার ভেতরে আরেকটি স্বপ্ন তখনও অপূর্ণ ছিল। আমি টেলিভিশন নাটকে অভিনয় করতে চেয়েছিলাম।’

‘একদিন আমি, সালাহউদ্দিন লাভলু এবং আরও কয়েকজন মামুন ভাইকে সেই ইচ্ছার কথা বললাম। তিনি বললেন, তোমরা আগে নিজেদের প্রস্তুত করো। প্রস্তুতি শেষ হলে আমি নিজেই বলব।’

সেই অপেক্ষার অবসান হয় কিছুদিন পর।

‘১৯৭৭ সালে আরণ্যক নাট্যদলে যুক্ত হই। এরপর ১৯৮১ সালে প্রথম টেলিভিশন নাটকে অভিনয় করি। নাটকের নাম এখানে নোঙর। নাট্যকার ছিলেন মামুন ভাই। তার আগে অবশ্য আবারও অডিশন দিতে হয়েছিল। আমি এবং সালাহউদ্দিন লাভলু—দুজনেই সেই অডিশনে উত্তীর্ণ হই।’

‘ছোট একটি চরিত্র দিয়ে টেলিভিশন নাটকে অভিনয় শুরু করি। এরপর আরও চার বছর বিভিন্ন ধরনের চরিত্রে অভিনয় করেছি। চার বছর পর প্রথম নায়ক হওয়ার সুযোগ পাই। নাটকের নাম তবুও তো সে। ১৯৮৪ সালে নাটকটি প্রচারিত হয়।’
টেলিভিশনের পাশাপাশি চলচ্চিত্রেও অভিনয় করার স্বপ্ন ছিল তার।

‘চলচ্চিত্রে অভিনয়ের ইচ্ছা আমার অনেক দিনের। বিখ্যাত নির্মাতা মোস্তাফিজুর রহমান শঙ্খনীল কারাগার চলচ্চিত্র নির্মাণ করছিলেন। তার নির্দেশনায় এর আগেও আমি নাটকে অভিনয় করেছি। একদিন তিনি আমাকে শঙ্খনীল কারাগারে অভিনয়ের প্রস্তাব দেন। আমি এক মুহূর্তও দেরি না করে রাজি হয়ে যাই।’

অভিনয়জীবনের দীর্ঘ পথচলার দিকে ফিরে তাকিয়ে আজিজুল হাকিম বলেন,

‘১৯৭৭ সালে মঞ্চে অভিনয় শুরু করি। সেই হিসাবে এ বছর অভিনয়জীবনের ৫০ বছরে পদার্পণ করলাম। দেখতে দেখতে অর্ধশতাব্দী কেটে গেল। এখনও অভিনয় করছি। দর্শকের ভালোবাসাই আমাকে এত দীর্ঘ পথ চলার শক্তি দিয়েছে।’

Related Articles

Latest Posts