সাপের বিষের খামার, স্বপ্ন বড় কিন্তু ক্রেতা নেই

প্রতিবছর বাংলাদেশে বিষধর সাপের কামড়ে বহু মানুষের মৃত্যু হয়। অথচ সাপের কামড়ের চিকিৎসায় দেশের হাসপাতালগুলো নির্ভরশীল বিদেশ থেকে আমদানি করা অ্যান্টিভেনমের ওপর। 

এর পেছনে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়। সেই নির্ভরতা কমানোর আশায় পটুয়াখালীতে গড়ে উঠেছে একটি বেসরকারি সাপের বিষের খামার।

২০০০ সালে পটুয়াখালী সদর উপজেলার মাদারবুনিয়া ইউনিয়নের নন্দীপাড়া গ্রামে বাংলাদেশ স্নেক ভেনম নামে এ খামার প্রতিষ্ঠা করেন প্রবাসফেরত আবদুর রাজ্জাক বিশ্বাস।

এমন ব্যতিক্রমী উদ্যোগের অনুপ্রেরণা সম্পর্কে জানতে চাইলে রাজ্জাক জানান, সৌদি আরবে ক্যামেরাম্যান হিসেবে কাজ করার সময় তিনি প্রবাসী শ্রমিকদের দুর্ভোগ কাছ থেকে দেখেছেন। দেশে ফিরে তিনি সিদ্ধান্ত নেন, নিজের সঞ্চিত অর্থ এমন একটি উদ্যোগে বিনিয়োগ করবেন, যা স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে।

তার বিশ্বাস ছিল, নিজ জেলায় মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হলে বিদেশে পাড়ি জমানোর প্রয়োজন অনেকটাই কমে যাবে।

এরপর তিনি দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে বিষধর সাপ সংগ্রহ ও লালন-পালন শুরু করেন। গত ২৬ বছরে তার সংগ্রহে ২৫০টিরও বেশি সাপ যুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কিং কোবরা, গোখরা, শঙ্খিনী, কালাচ, রাসেলস ভাইপার, পিট ভাইপার, অজগর ও দাড়াশসহ বিভিন্ন প্রজাতির সাপ।

২০০৮ সালে প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে খামারটির নিবন্ধন ও ২০১৮ সালে পরিবেশ ছাড়পত্রের জন্য আবেদন করেন রাজ্জাক। দীর্ঘদিনের আইনি জটিলতা কাটিয়ে প্রায় তিন মাস আগে খামারটি প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর থেকে আনুষ্ঠানিক নিবন্ধন পায়। এর ফলে খামারটিতে এখন আইনিভাবে বিষধর সাপ থেকে বিষ সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে।

তবে এখন বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ক্রেতার অভাব। কোনো ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান এখনো এই বিষ কিনতে রাজি হয়নি।

রাজ্জাক বলেন, ‘সাপের কাঁচা বিষ সরাসরি বিক্রি করা যায় না। অনুমোদিত মান বজায় রেখে তা প্রক্রিয়াজাত করে অ্যান্টিভেনম ও অন্যান্য জীবনরক্ষাকারী ওষুধ তৈরি করতে হয়।’

তিনি বলেন, ‘এখন পর্যন্ত কোনো ওষুধ কোম্পানি এই বিষ সংগ্রহ বা প্রক্রিয়াজাত করার আগ্রহ দেখায়নি।’

রাজ্জাক জানান, ইনসেপ্টাসহ কয়েকটি ওষুধ কোম্পানির সঙ্গে তিনি যোগাযোগ করেছিলেন। কিন্তু তারা জানিয়েছে, তারা শুধু পরিশোধিত (রিফাইন্ড) বিষ কিনে থাকে।

তিনি বলেন, ‘তারা আমাকে প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের কাছে বিষ পরিশোধনের অনুমতি নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে।’

‘সেই অনুমতি পেলে আমি সরাসরি ওষুধ কোম্পানিগুলোর কাছে বিষ বিক্রি করতে পারব।’

রাজ্জাকের দাবি, তার খামারে প্রতি মাসে প্রায় এক পাউন্ড সাপের বিষ উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে, যার আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য প্রায় ৮ কোটি টাকা।

তার মতে, এই বিষ বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করা গেলে অ্যান্টিভেনম আমদানি কমিয়ে বাংলাদেশ প্রতি বছর প্রায় ১০০ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করতে পারবে।

তিনি বলেন, ‘সরকার ও বেসরকারি খাতের সহযোগিতা পেলে এই উদ্যোগ বাংলাদেশে একটি বড় শিল্পে পরিণত হতে পারে।’

বর্তমানে খামারটিতে চারজন কর্মী কাজ করছেন। শুরুতে কর্মীর সংখ্যা ছিল দুইজন।

রাজ্জাক বলেন, আর্থিক সংকটের কারণে কর্মীদের বেতন দিতেও তাকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। খামার পরিচালনায় প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার টাকা ব্যয় হয়। ফলে মাসিক রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ১ লাখ টাকা।

খামারটি টিকিয়ে রাখতে তাকে ব্যক্তিগতভাবেও বড় মূল্য দিতে হয়েছে বলে জানান তিনি। সৌদি আরবে চাকরি করে জমানো প্রায় সব অর্থ ব্যয় করার পাশাপাশি পৈতৃক জমির গাছ বিক্রি এবং উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সম্পত্তি বন্ধক রাখতে হয়েছে।

রাজ্জাক বলেন, ‘আমি খামারটি আরও ভালো জায়গায় স্থানান্তর করে আধুনিক সুবিধা যুক্ত করতে চাই। এজন্য ব্যাংক ঋণের প্রয়োজন হবে।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ (এনসিডিসি) ইউনিটের এক গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর আনুমানিক ৪ লাখ ৩ হাজার মানুষ সাপের কামড়ের শিকার হন। এর মধ্যে ৭ হাজার ৫১১ জনের মৃত্যু হয়। রাষ্ট্রায়ত্ত বার্তা সংস্থা বাসস চলতি মাসের শুরুতে এ তথ্য প্রকাশ করে।

গবেষণায় বলা হয়েছে, সাপের কামড়ের প্রতি চারটি ঘটনার মধ্যে একটি বিষধর সাপের কামড়। আক্রান্তদের মধ্যে ১০ দশমিক ৬ শতাংশ স্থায়ী শারীরিক প্রতিবন্ধিতার শিকার হন এবং ১ দশমিক ৯ শতাংশ মানসিক প্রতিবন্ধিতায় ভোগেন। এছাড়া প্রায় ৯৫ শতাংশ সাপের কামড়ের ঘটনা ঘটে গ্রামীণ এলাকায়। নারীদের তুলনায় পুরুষদের সাপের কামড়ে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা ১ দশমিক ৪ গুণ বেশি।

পটুয়াখালীর জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. হাবিবুর রহমান বলেন, ‘খামারটি সাপের বিষ সংগ্রহের নিবন্ধন পেলেও সেই বিষ সরাসরি বাজারজাত করা যাবে না। ওষুধ শিল্পে ব্যবহারের আগে অনুমোদিত মান ও নিয়ন্ত্রক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তা প্রক্রিয়াজাত করতে হবে।’

যোগাযোগ করা হলে পটুয়াখালীর বায়োজেন ফার্মাসিউটিক্যালের স্বত্বাধিকারী আল-আমিন হাওলাদার জানান, তার প্রতিষ্ঠান অ্যান্টিভেনম উৎপাদন করে না। তবে তিনি এই উদ্যোগকে স্বাগত জানান।

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার অ্যান্টিভেনম আমদানি করে। বড় বড় ওষুধ কোম্পানিগুলোর এই খাতে বিনিয়োগ করা উচিত। এতে নতুন একটি শিল্প গড়ে উঠতে পারে, উদ্যোক্তা তৈরি হবে এবং আমদানির ওপর নির্ভরতা কমবে।’

পটুয়াখালীর সিভিল সার্জন ডা. খালেদুর রহমান মিয়া বলেন, ‘বিশেষ করে উপকূলীয় এলাকায়, যেখানে সাপের কামড়ের ঘটনা বেশি ঘটে, সেখানে আক্রান্তদের চিকিৎসায় অ্যান্টিভেনম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’

Related Articles

Latest Posts