ভারতে শিক্ষা সংস্কার ও বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে রাজধানী নয়াদিল্লিতে ছড়িয়ে পড়েছে বিক্ষোভের দাবানল। এর সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে বিরোধী দলগুলো।
দ্য হিন্দু বলছে, মঙ্গলবার বিরোধী দল কংগ্রেস আন্দোলনের নেতৃত্বে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হয়। লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে কংগ্রেস নেতারা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারি বাসভবনের সামনে হঠাৎই অবস্থান শুরু করেন।
সাড়ে তিন ঘণ্টা পর পুলিশ তাদের জোর করে সরিয়ে দেয়। বাসবোঝাই করে নেতাদের নিয়ে যাওয়া হয়। এ সময় সঙ্গে ছিলেন কংগ্রেস নেতা প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভদ্র, সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদবসহ বিরোধী জোটের শীর্ষ নেতারা।
জবরদস্তি করে নিয়ে যাওয়ার সময় রাহুল গান্ধীর নাক দিয়ে রক্ত পড়তে দেখা যায়। এর দুই ঘণ্টা পর তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
পুলিশের দমন অভিযানের একদিন পরও হাজারো আন্দোলনকারী দিল্লির যন্তর মন্তরে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) আন্দোলনস্থলে জড়ো হয়েছেন। সোমবার সন্ধ্যায় নিরাপত্তা বাহিনী আন্দোলনকারীদের তাঁবু ও মূল মঞ্চের একটি অংশ গুঁড়িয়ে দিলেও রাতেই শত শত মানুষ সেখানে ফিরে আসেন। মঙ্গলবার বৃষ্টি উপেক্ষা করেও আন্দোলনস্থলে মানুষের উপস্থিতি আরও বাড়ে।
বিবিসি জানায়, সোমবার দিল্লির কেন্দ্রস্থলে পুলিশ আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করলে অন্তত ৬০ জন বিক্ষোভকারী আহত হন।
পুলিশের দাবি, সংঘর্ষে তাদের ১১৮ জন সদস্যও আহত হয়েছেন। এ ছাড়া ৭০ জন আন্দোলনকারীকে আটক করা হয়েছে।
গত ১৮ জুলাই পুলিশি হস্তক্ষেপে সফদারজং হাসপাতালে ভর্তি হওয়া অনশনরত শিক্ষাবিদ ও শিক্ষা সংস্কার আন্দোলনের মুখ সোনম ওয়াংচুককে দিল্লি হাইকোর্টের নির্দেশে মঙ্গলবার গুরগাঁওয়ের মেদান্ত হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে। তিনি হাসপাতালেও অনশন চালিয়ে যাচ্ছেন।
দ্য হিন্দুর প্রতিবেদনে জানানো হয়, পুলিশি অভিযানের প্রতিবাদে মঙ্গলবার যন্তর মন্তরে ছুটে যান একাধিক বিরোধীদলীয় নেতা।
ন্যাশনালিস্ট কংগ্রেস পার্টির (এনসিপি-এসপি) সভাপতি শারদ পাওয়ার, আম আদমি পার্টির (আপ) প্রধান অরবিন্দ কেজরিওয়াল, তৃণমূল কংগ্রেসের মহুয়া মৈত্র, শিবসেনা (ইউবিটি) নেতা সঞ্জয় রাউত ও অরবিন্দ সাওয়ান্ত, কংগ্রেস নেতা শশী থারুর, বামপন্থি দলগুলোর সংসদ সদস্য এবং আরও কয়েকটি দলের প্রতিনিধিরা আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেন।
শারদ পাওয়ার বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের ন্যায্য ও স্বচ্ছ পরীক্ষাব্যবস্থার দাবি বলপ্রয়োগ করে দমন করা যাবে না।’ তিনি জানান, তার দল সংসদের ভেতরে ও বাইরে এই আন্দোলনের পাশে থাকবে।
অন্যদিকে অরবিন্দ কেজরিওয়াল রাম মনোহর লোহিয়া হাসপাতালে গিয়ে আহত আন্দোলনকারীদের খোঁজ নেন। তিনি জানান, আহতদের মধ্যে এক তরুণীর অবস্থা এখনো আশঙ্কাজনক এবং তিনি নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন।
শিবসেনা (ইউবিটি) নেতা সঞ্জয় রাউত বলেন, ‘যন্তর মন্তরে যে আগুন জ্বলেছে, তা নিভবে না। প্রয়োজন হলে আমরাও অনশনে যোগ দেব।’
তৃণমূল কংগ্রেসের মহুয়া মৈত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেন, ‘ভয়হীন মানুষের আন্দোলন কীভাবে মোকাবিলা করতে হয়, তা কেন্দ্রীয় সরকার জানে না।’
এদিকে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান আন্দোলনকে ঘিরে কংগ্রেস ও রাহুল গান্ধীর কড়া সমালোচনা করেছেন। তিনি অভিযোগ করেন, কংগ্রেস শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে এবং বর্ষাকালীন অধিবেশনে অচলাবস্থা তৈরির চেষ্টা করছে। তার দাবি, সরকার আলোচনার সব পথ খুলে দিয়েছে, কিন্তু রাহুল গান্ধী আন্দোলনের লক্ষ্য পরিবর্তন করেছেন।
অন্যদিকে আন্দোলনের উদ্যোক্তা সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে জানান, আন্দোলনকারীদের শুধু যন্তর মন্তরেই জড়ো হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। দিল্লির অন্য কোথাও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা হলে তার সঙ্গে সিজেপির কোনো সম্পর্ক নেই বলেও তিনি স্পষ্ট করেন।
আটকের পর মুক্তি পেয়ে কংগ্রেস নেতা প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভদ্র বলেন, ‘প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধ এবং শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারে সরকারকে দ্রুত আইন প্রণয়ন করতে হবে।’
এই আন্দোলনের প্রভাব পড়েছে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যেও। হিমাচল প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী সুখবিন্দর সিং সুখু শিমলায় কংগ্রেস নেতাদের আটকের প্রতিবাদে বিক্ষোভে অংশ নেন। দিল্লির ছত্রসাল স্টেডিয়ামে আটক বিরোধী সংসদ সদস্যদের একজন হিবি ইডেন পুলিশের আচরণকে ‘নির্মম ও উসকানিমূলক’ বলে অভিযোগ করেন। তার দাবি, ধস্তাধস্তির সময় নারী সংসদ সদস্যরাও আহত হয়েছেন।
পুলিশের কাঁদানে গ্যাস ও লাঠিচার্জের অভিজ্ঞতার পর আন্দোলনে প্রথমবার অংশ নেওয়া বহু তরুণ-তরুণী এবার সুইমিং গগলস, এন-৯৫ মাস্ক, ভেজা তোয়ালে ও হেলমেট পরে যন্তর মন্তরে এসেছেন বলে জানিয়েছে দ্য হিন্দু। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও পরামর্শ অনুসরণ করেই তারা এসব নিরাপত্তা সামগ্রী ব্যবহার করেছেন বলে জানান।
এর মধ্যেই কংগ্রেসের প্রধানমন্ত্রী বাসভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচির সমালোচনা করেছে আম আদমি পার্টি। দলের অভিযোগ, রাহুল গান্ধীর কর্মসূচি মূল আন্দোলনের গুরুত্ব কমিয়ে দিয়েছে এবং এর মাধ্যমে আন্দোলন দুর্বল করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
গত ২০ জুন শুরু হওয়া সিজেপির আন্দোলনে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অনিয়মের বিচার, শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবি জানানো হচ্ছে। সোনম ওয়াংচুকের অনশন এবং বিরোধী দলগুলোর ক্রমবর্ধমান সমর্থনে আন্দোলনটি এখন ভারতের জাতীয় রাজনীতির অন্যতম আলোচিত ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।
