মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, ইরান যখনই হরমুজ প্রণালিতে কোনো জাহাজে হামলা চালালে জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সেতু কিংবা বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলা চালাবে।
বিপরীতে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি ‘চোখের বদলে চোখ’ সামরিক নীতি বাস্তবায়নের পাল্টা হুমকি দিয়েছেন।
বুধবার দুই পক্ষের দেওয়া এই পাল্টাপাল্টি সতর্কবার্তা বাস্তবায়িত হলে, তা চলমান সংঘাতকে আরও বড় মাত্রায় নিয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বার্তাসংস্থা এএফপি এই সংবাদ প্রকাশ করেছে।
এদিন নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লেখেন, ‘এখন থেকে ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান যখনই হরমুজ প্রণালিতে কোনো জাহাজের ওপর ক্ষেপণাস্ত্র, রকেট, ড্রোন বা অন্য কোনো অস্ত্র দিয়ে হামলা চালাবে, যুক্তরাষ্ট্র রাজধানী তেহরানের ভেতরে বা আশপাশে অবস্থিত একটি সেতু অথবা একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে বোমা হামলা চালিয়ে তা ধ্বংস করবে।’
এর আগেও ট্রাম্প ইরানের সেতু ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে বোমা হামলার হুমকি দিয়েছিলেন, এমনকি দেশটির সভ্যতা ধ্বংস করে দেওয়ার কথাও বলেছিলেন। তবে বুধবারের এই বক্তব্য আগের হুমকির তুলনায় আরও সুনির্দিষ্ট।
জবাবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানান, ওয়াশিংটন যদি প্রতিটি জাহাজে হামলার জবাবে একটি করে সেতু বা বিদ্যুৎকেন্দ্রে বোমা হামলার হুমকি বাস্তবায়ন করে, তাহলে ইরানও একইভাবে জবাব দেবে।
এক্সে দেওয়া পোস্টে আরাগচি বলেন, ‘আমাদের প্রতিরক্ষা নীতি স্পষ্ট—চোখের বদলে চোখ। আমাদের অবকাঠামোসহ ইরানের বিরুদ্ধে যেকোনো আগ্রাসনের জবাবে আমরা শক্তিশালী ও সিদ্ধান্তমূলক প্রতিক্রিয়া জানাব। এই আগ্রাসনে যেকোনো ধরনের সাহায্য যারা করবে, তাদেরও বৈধ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে ধরে নেওয়া হবে।’
ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম দেশটির সামরিক বাহিনীর বরাত দিয়ে জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের এমন হুমকির ফলে এই যুদ্ধের আরও বিস্তার ঘটবে।
দেশটির বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর (আইআরজিসি) অ্যারোস্পেস ফোর্সের প্রধান মাজিদ মৌসাভি সতর্ক করে বলেন, ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা হলে তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের সেনা মোতায়েন থাকা দেশগুলোর বিরুদ্ধেও প্রতিশোধ নেবে।
এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘আমাদের সেতু ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা হলে শিশু হত্যাকারীদের মিত্র ও আশ্রয়দাতা দেশগুলোর বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হওয়া নিশ্চিত।’
গত ১২ দিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একে অপরের ওপর হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। দুই পক্ষের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধে যে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়েছিল, হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ নিয়ে মতবিরোধের কারণে তা ভেস্তে যায়।
কৌশলগত এই জলপথের ওপর ইরান নিজের সার্বভৌমত্ব দাবি করে বলছে, ওই সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী প্রণালিটি পরিচালনার অধিকার তাদের রয়েছে। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, সংঘাত শুরুর আগের মতো হরমুজ প্রণালিকে আবারও আন্তর্জাতিক ও উন্মুক্ত নৌপথে পরিণত করতে হবে।
ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার ও প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এদিন জোর দিয়ে বলেন, ‘প্রণালির পরিস্থিতি আর কখনো যুদ্ধ-পূর্ব অবস্থায় ফিরে যাবে না।’
এক্সে দেওয়া পোস্টে তিনি লেখেন, ‘যে অঞ্চলে আমরা তেল বিক্রি করতে পারছি না, সেখানে আর কেউ তেল বিক্রি করতে পারবে না। আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে কোনো অবকাঠামোই নিরাপদ থাকবে না। আর মার্কিন বাহিনী না থাকলেই কেবল প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।’
ওমানের দিক দিয়ে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করা কয়েকটি জাহাজ ইরানের সঙ্গে সমন্বয় না করেই চলাচল করায় সেগুলোর ওপর হামলার পর আবারও সংঘর্ষ শুরু হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ইরানে সামরিক লক্ষ্যবস্তুর পাশাপাশি বেসামরিক বন্দর ও সেতুতেও হামলা চালিয়েছে, যাতে কয়েক ডজন মানুষ নিহত হয়েছে। এর জবাবে তেহরান অঞ্চলজুড়ে মার্কিন সেনা অবস্থান করা ঘাঁটিগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র ও রকেট হামলা চালিয়েছে।
চলতি মাসে জর্ডান ও ইরাকে ইরানের হামলায় অন্তত চার মার্কিন সেনাসদস্য নিহত এবং আরও কয়েকজন আহত হয়েছেন। মঙ্গলবার গভীর রাতে পেন্টাগন জানায়, জর্ডানে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহত তৃতীয় সেনাসদস্য হলেন ২৮ বছর বয়সী অ্যাঞ্জেল র্যাম্পারসাড। হামলার পরপরই তিনি নিখোঁজ হিন।
বুধবার ডেলাওয়ারের ডোভার বিমানঘাঁটিতে নিহত সেনাসদস্যদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার আনুষ্ঠানিক আয়োজন ‘ডিগনিফায়েড ট্রান্সফার’-এ উপস্থিত ছিলেন ট্রাম্প। সেখানে তিনি বলেন, ‘মার্কিন সেনা হত্যার জন্য ইরানকে বড় মূল্য চুকাতে হবে।’
আবার যুদ্ধ শুরু হওয়ায় জ্বালানি তেলের দামও বেড়ে গেছে। যুদ্ধবিরতির সময় যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন (৩.৪ লিটার) পেট্রোলের গড় দাম সাড়ে ৪ ডলার থেকে কমে প্রায় ৩ দশমিক ৮০ ডলারে নেমে আসে। তবে নতুন করে সংঘাত শুরুর পর তা আবার বেড়ে ৪ ডলার ছাড়িয়ে গেছে।
