জলাবদ্ধতা ও ভাঙা সড়কে বিপর্যস্ত পাবনার জনজীবন

টানা বর্ষণে যেন থমকে গেছে পাবনা শহরের স্বাভাবিক জীবন। সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতায় তলিয়ে যাচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক, ভাঙাচোরা রাস্তায় ব্যাহত হচ্ছে যানবাহন চলাচল, আর স্থবির হয়ে পড়ছে ব্যবসা-বাণিজ্য। বছরের পর বছর সড়ক সংস্কার ও কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থার অভাবে নগরবাসীর দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। এর সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী, রোগী, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ।

পাবনা শহরের কালাচাঁদপাড়া এলাকার তেলের মিল ব্যবসায়ী আমিরুল ইসলাম শহরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ব্যবসা পরিচালনা করলেও বর্ষা এলেই তার মিলের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়। সামান্য বৃষ্টিতেই মিলে কাঁচামাল আনা এবং উৎপাদিত পণ্য বাজারে পাঠানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

আমিরুল ইসলাম বলেন, ‘কালাচাঁদপাড়া থেকে বড় বাজার এবং কালাচাঁদপাড়া থেকে বাস টার্মিনাল পর্যন্ত পুরো সড়কজুড়ে অসংখ্য খানাখন্দ। রাস্তার পাশের ড্রেনগুলো বহুদিন ধরেই অকার্যকর। সামান্য বৃষ্টি হলেই পুরো এলাকা জলাবদ্ধ হয়ে যায়। ড্রেনের দূষিত পানি আবাসিক এলাকায় ঢুকে পড়ে। তখন যানবাহন চলাচল তো দূরের কথা, হেঁটেও চলাচল করা যায় না।’

তিনি জানান, বর্ষাকালে মিলে কাঁচামালবাহী যানবাহন প্রবেশ করতে পারে না। একইভাবে উৎপাদিত পণ্যও বাজারে পাঠানো সম্ভব হয় না। ফলে ব্যবসা কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে।

সরেজমিনে পাবনা পৌরসভার ব্যস্ততম বড় বাজার ও কালাচাঁদপাড়া এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বর্ষার শুরু থেকেই শহরের প্রাণকেন্দ্রের ব্যবসা-বাণিজ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

বড় বাজারের ব্যবসায়ী ময়েজ উদ্দিন বলেন, ‘চলাচলের দুর্ভোগের কারণে বর্ষাকালে বাজারে ক্রেতা ও ব্যবসায়ীদের উপস্থিতি অনেক কমে যায়। বৃষ্টি শুরু হলেই দূরের ব্যবসায়ীরা বাজারে আসতে চান না। ফলে এবার ব্যবসা প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে।’

শুধু বড় বাজার নয়, শহরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সড়ক পাবনা জেনারেল হাসপাতাল সড়কের অবস্থাও অত্যন্ত নাজুক। জলাবদ্ধতা তুলনামূলক কম হলেও পুরো সড়কজুড়ে খানাখন্দ থাকায় স্বাভাবিকভাবে চলাচল করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

হাসপাতাল সড়কের বাসিন্দা আলমগীর হোসেন বলেন, ‘প্রতিদিন এই সড়ক দিয়ে রোগী ও তাদের স্বজনদের যাতায়াত করতে হয়। কিন্তু বছরের পর বছর সড়কটি সংস্কার না করায় দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।’

শহরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ এলাকায় জলাবদ্ধতার কারণে যানবাহন চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ভাঙাচোরা সড়ক এবং দুর্বল ড্রেনেজ ব্যবস্থার কারণে বর্ষায় নগরবাসীর দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়।

স্থানীয়রা জানান, ঢাকা-পাবনা মহাসড়কের শহর অংশ থেকে বাস টার্মিনাল পর্যন্ত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ভারী বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে অনন্ত মোড় থেকে মাসুমবাজার মোড় পর্যন্ত প্রায় এক কিলোমিটার এলাকায় পানি জমে থাকায় বড় যানবাহন চলাচলেও বিঘ্ন ঘটে।

রিকশাচালক কামাল হোসেন বলেন, ‘পাবনা শহরের প্রায় সব এলাকার রাস্তা বর্ষায় চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ে। সামান্য বৃষ্টিতেই ভাঙাচোরা সড়কে পানি জমে যায়। তখন রিকশা চালানোও খুবই কষ্টকর হয়ে পড়ে।’

শহরের সবচেয়ে দুর্ভোগপূর্ণ এলাকাগুলোর একটি আতাইকুলা রোড। সেখানে রাস্তার বড় অংশ পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় বিকল্প পথও ব্যবহার করা সম্ভব হয় না।

এলাকার বাসিন্দা আখিনুর ইসলাম বলেন, ‘আমাদের রাস্তাটি কয়েক বছর আগেই চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছিল। এখন সংস্কারকাজ চললেও গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি অংশে কাজ আটকে আছে। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই রাস্তাটি পানির নিচে চলে যায়। তখন যানবাহন তো দূরের কথা, হেঁটেও চলাচল করা যায় না। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়ে স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীরা।’

নগরবাসীর অভিযোগ, প্রতিবছর বর্ষা এলেই একই দুর্ভোগের পুনরাবৃত্তি ঘটে। সড়ক সংস্কার ও আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি দীর্ঘদিনের হলেও কার্যকর উদ্যোগের অভাবে সমস্যার স্থায়ী সমাধান মিলছে না। তাই দ্রুত টেকসই সড়ক নির্মাণ ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নের দাবি জানিয়েছেন তারা।

কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) পাবনা ইউনিটের সভাপতি এবিএম ফজলুর রহমান বলেন, ‘পাবনা শহরে স্বাভাবিকভাবে চলাচল করাটাই এখন কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে, কারণ অধিকাংশ রাস্তারই বেহাল দশা। বৃষ্টি হলে তো ঘর থেকে বের হওয়াই দায়, আর বাইরে বের হলে রিকশা ভাড়া দ্বিগুণ বা তিনগুণ দিতে হয়।’

তিনি বলেন, পাবনা একটি ‘প্রথম শ্রেণির’ (ক্লাস-১) পৌরসভা হওয়া সত্ত্বেও এর সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা ন্যূনতম মানেরও নয়। এতে নাগরিকদের সময় ও অর্থ দুটোরই অপচয় হচ্ছে।

পাবনা পৌরসভার তথ্য অনুযায়ী, মোট ২২০ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশেরই বেহাল দশা।

জানতে চাইলে পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী মো. ওবায়দুল হক জানান, পৌরসভা কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। অধিকাংশ রাস্তাই মেরামতের প্রয়োজন। আমরা ইতোমধ্যে আতাইকুলা রোডের মেরামত কাজ শুরু করেছি এবং আরও দুটি রাস্তার কাজের উদ্বোধন করা হয়েছে। বাকি ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তাগুলোর মেরামত কাজ ফান্ডের বরাদ্দ অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে নেওয়া হবে।

তিনি আরও জানান, পুরো পৌরসভার রাস্তাঘাট সংস্কার করতে অন্তত ৩০০ কোটি টাকার বরাদ্দ প্রয়োজন, যা এই মুহূর্তে পাওয়া সম্ভব নয়। তাই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ রাস্তাগুলোর কাজ করা হচ্ছে।

Related Articles

Latest Posts