বাংলাদেশের ফুটবলের উত্থানে সাফে নতুন হাওয়া

শেরাটন হোটেলের হলঘরে তখন আলো পড়েছিল একটি কাপড়ের নকশার স্লাইডে। জামদানির সূক্ষ্ম বুনন ও নকশী কাঁথার সুতোর আলপনায় দক্ষিণ এশিয়ার সাত দেশের রঙে গাঁথা একটি লোগো উন্মোচিত হলো, যা আসন্ন সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের প্রতীক হয়ে থাকবে। কিন্তু সেই কাপড়ের নকশার আড়ালে যে বার্তাটি লুকিয়ে ছিল, বাংলাদেশের ফুটবলের জন্য তা ঢের বেশি তাৎপর্যপূর্ণ।

বাংলাদেশের ফুটবল এখন আর শুধু সম্ভাবনার গল্প নয়, বাস্তবতারও। হামজা চৌধুরী ও শমিত সোমের মতো প্রবাসী ফুটবলারদের আগমন এবং নারী ও বয়সভিত্তিক দলের ধারাবাহিক সাফল্যে মিলিয়ে দেশের ফুটবলকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন এক উন্মাদনা। সেই জোয়ারকেই এবার কাজে লাগাতে চাইছে দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলের সর্বোচ্চ সংস্থা সাফ।

সেই কারণেই আগামী ৪ থেকে ১৭ নভেম্বর বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ শুধু আরেকটি টুর্নামেন্ট নয়; এটি সাফের জন্যও নতুন যুগের সূচনা। কারণ, এর আগে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত তিনটি সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে বাণিজ্যিক স্বত্ব ছিল স্বাগতিক বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) হাতে। এবার সেই কাঠামো বদলেছে। আন্তর্জাতিক ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা কিংবা ইউরোপিয়ান ফুটবলের সংস্থা উয়েফার মতো কেন্দ্রীয়ভাবে বাণিজ্যিক স্বত্ব নিজেদের তত্ত্বাবধানে রাখছে সাফ।

লোগো উন্মোচন অনুষ্ঠানের ফাঁকে ডেইলি স্টারের সঙ্গে আলাপে সাফের সাধারণ সম্পাদক পুরুষোত্তম ক্যাটেল পরোক্ষভাবে খোলাসা করলেন এই সিদ্ধান্তের নেপথ্য কারণ, ‘বাংলাদেশের ফুটবল যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে এবং খেলাটি যেভাবে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে, সেটিই এর মূল কারণ।’

শুধু জনপ্রিয়তা নয়, ফলাফলের হিসাবও কষলেন। নারী দল, বালিকা দল, বালক দল থেকে সিনিয়র জাতীয় দল, সবখানেই তিনি দেখছেন উত্থানের ছাপ। যোগ করলেন আবহাওয়ার প্রসঙ্গও, নভেম্বরের ঢাকাকে তিনি বললেন এই টুর্নামেন্টের জন্য ‘সবচেয়ে ভালো সময়।’

তবে এই আসরে একটি অনুপস্থিতি সবচেয়ে বেশি আলোচিত হবে। ফুটবল থেকে নিষিদ্ধ নেপাল অংশ নিতে পারছে না, আর সেই শূন্যতা পূরণের কোনো তাৎক্ষণিক পথও নেই সাফের হাতে। ‘তারা যেহেতু নিষিদ্ধ, তাই সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া আমাদের হাতে নয়, এটি সাফের হাতেও নেই,’ স্পষ্ট করলেন ক্যাটেল।

আগামী ১ আগস্ট ভুটানে অনুষ্ঠেয় নির্বাহী কমিটির সভায় ঠিক হবে, নেপালের জন্য কতদিন অপেক্ষা করা হবে। ততদিন পর্যন্ত ড্র হবে ছয়টি দল নিয়েই, নেপালকে সপ্তম দল হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ নেই। নিষেধাজ্ঞা যদি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে না ওঠে, সাফেরও তখন আর কিছু করার থাকবে না, কারণ তারা কাজ করে ফিফার নিয়মের অধীনে।

গত আসরে বেঙ্গালুরুতে দুটি অতিথি দল খেলার সুযোগ পেলেও এবার সেই দরজা বন্ধ। মধ্যপ্রাচ্য বা আফ্রিকা থেকে কাউকে ডাকার পরিকল্পনা নেই, কারণ ক্যাটেলের ভাষায় এই সিদ্ধান্তের দুটি দিক আছে; প্রতিযোগিতার মান বাড়ানোর যুক্তি একদিকে, আর সাফ চ্যাম্পিয়নশিপকে ‘শুধুই দক্ষিণ এশিয়ার একান্ত’ রাখার ইচ্ছা অন্যদিকে। অতিরিক্ত অর্থ আর লজিস্টিকসের বাস্তবতাও এখানে বড় প্রভাবক। তাই এবারের আসর থাকছে খাঁটি দক্ষিণ এশীয় চরিত্রেই।

ভারতকে নিয়ে যে জল্পনা ছিল, নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সূচি জটিলতার কারণে তারা হয়তো সরে দাঁড়াতে পারে, সেই শঙ্কার কথা উড়িয়ে দিলেন সাফের সাধারণ সম্পাদক, ‘আমরা ভারতকে একটি চিঠি পাঠিয়েছিলাম এবং তারা নিশ্চিত করেছে যে তারা অংশ নেবে।’ আর নিউজিল্যান্ড সফরে সম্ভবত ভারতের ‘বি’ দল যাবে বলে ইঙ্গিত দিলেন।

আসল প্রশ্নটা অবশ্য অর্থের, কার হাতে থাকছে বাণিজ্যিক স্বত্ব, আর কতটা। এখানে ক্যাটেলের ব্যাখ্যা সতর্ক, প্রায় কূটনৈতিক। তিনি একে ‘ত্রিপক্ষীয় সমঝোতা’ বললেন, যেখানে বাফুফে, সাফ এবং বাণিজ্যিক অংশীদার তিন পক্ষই যুক্ত। টিয়ার-১ প্রতিযোগিতা হিসেবে ফিফার কাছে নিবন্ধনের দায়িত্ব যেহেতু বাফুফেরই, তাই আয়োজনের কেন্দ্রেও থাকছে তারাই।

‘আমি নির্দিষ্ট অঙ্ক বলতে পারব না। তবে বিষয়টি ঠিক সেভাবে নয়,’ রাইটস পুরোপুরি সাফের হাতে চলে যাওয়ার ধারণা খণ্ডন করে বললেন তিনি। রয়্যালটির প্রশ্ন আছে ঠিকই, তবে এই মুহূর্তে যা নিশ্চিত তা হলো, সব স্বত্ব বাফুফে বা সাফের কাছে থাকছে না, ভাগ হবে। চূড়ান্ত হিসাব-নিকাশের জন্য পরদিনই বাফুফের টেকনিক্যাল ও প্রতিযোগিতা কমিটির সঙ্গে বৈঠকে বসার কথা জানালেন তিনি। বাফুফের সাধারণ সম্পাদক ইমরান হোসেন তুষার ও সহ-সভাপতি ফাহাদ করিমও বলেছেন, রয়্যালটি নিয়ে সম্পূর্ণ আলোচনা হবে আজ-কালের মধ্যেই।

গত এক বছরে ৯ থেকে ১০টি প্রতিযোগিতা আয়োজনের পরিসংখ্যান তুলে ধরে ক্যাটেল বললেন, সাফ নিজেকে পুনর্গঠন করছে ব্র্যান্ড, লোগো আর দীর্ঘমেয়াদি বিপণন অংশীদারত্বের মধ্য দিয়ে। ‘আমার বিশ্বাস, আমরা সঠিক পথেই এগোচ্ছি,’ বললেন তিনি, সদস্য দেশগুলোর মধ্যে মাঝেমধ্যে দেখা দেওয়া রাজনৈতিক জটিলতাকে নিয়ন্ত্রণের বাইরের বাস্তবতা হিসেবে মেনে নিয়েও।

বাংলাদেশ প্রসঙ্গে তার মূল্যায়ন ছিল স্পষ্ট, নারী চ্যাম্পিয়নশিপ জয়, এশিয়ান কাপে অংশগ্রহণ, অনূর্ধ্ব-২০ নারী ও বালক সাফ শিরোপা, ঢাকায় ভারতের বিপক্ষে জাতীয় দলের পারফরম্যান্স, সব মিলিয়ে তিনি বললেন, ‘বাংলাদেশের ফুটবল ঠিক সঠিক পথেই এগোচ্ছে।’

আর হামজা চৌধুরীর নাম উঠতেই সাফের সাধারণ সম্পাদকের কণ্ঠে যেন অন্য এক উচ্ছ্বাস, ‘তিনি শুধু বাংলাদেশের সম্পদ নন; আমার মতে, তিনি পুরো দক্ষিণ এশিয়ার সম্পদ।’

ভবিষ্যতে হামজা যদি কোনো দক্ষিণ এশীয় প্রতিযোগিতায় খেলেন, সেটি যে বিপুল আগ্রহ তৈরি করবে, সে কথাও অকপটে জানালেন। আর এই কারণেই শ্রীলঙ্কা, ভারত, পাকিস্তানের শীর্ষ লিগে খেলা খেলোয়াড়দের জন্যও সদস্য দেশগুলোকে বাড়তি নিবন্ধনের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে বলে ইঙ্গিত দিলেন তিনি।

 

Related Articles

Latest Posts