সাবেক রাষ্ট্রপতির বিচার দাবি, কী বলছে সংবিধান?

রাষ্ট্রপতির পদ থেকে মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পর তাকে বিচারের আওতায় আনার দাবি তুলেছে কয়েকটি রাজনৈতিক দল ও সংগঠন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ এনে তার ও আরেক সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তদন্তের আবেদন করা হয়েছে।

জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল সাবেক রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনকে গ্রেপ্তার করে বিচারের মুখোমুখি করার দাবি জানিয়েছে। 

তাদের অভিযোগ, রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় তিনি বিভিন্ন ঘটনায় ভূমিকা রেখেছেন, যার জন্য তাকে জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন।

তবে প্রশ্ন উঠেছে, একজন সাবেক রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে এ ধরনের বিচারিক পদক্ষেপ নেওয়া আদৌ সম্ভব কি না? রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনের সময় করা কোনো কাজের জন্য কি তাকে বিচারের মুখোমুখি করা যায়? সংবিধান কি তাকে কোনো বিশেষ সুরক্ষা দিয়েছে? আর যদি কোনো রাষ্ট্রপতি অপরাধ করেন, তাহলে তার বিচার করার আইনি পথ আসলে কী?

বাংলাদেশের সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতির দায়মুক্তির বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। এই অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতিকে দুই ধরনের সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে।

৫১-এর (১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কোনো কাজ করলে বা না করলে তার জন্য তাকে কোনো আদালতে জবাবদিহি করতে হবে না। অর্থাৎ রাষ্ট্রপতি হিসেবে সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে নেওয়া কোনো সিদ্ধান্ত বা পদক্ষেপের জন্য তার বিরুদ্ধে সরাসরি আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ নেই।

দ্বিতীয়ত, ৫১-এর (২) অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রপতির কার্যকাল চলাকালে তার বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি কার্যধারা দায়ের করা বা চালু রাখা যায় না। তাকে গ্রেপ্তার বা কারাবাসের জন্য কোনো পরোয়ানাও জারি করা যায় না।

তবে এই সুরক্ষার ব্যাখ্যা নিয়ে আইনজ্ঞদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ শাহদীন মালিক দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, সংবিধানের এই সুরক্ষা মূলত রাষ্ট্রপতি যতদিন পদে বহাল থাকেন, ততদিনের জন্য প্রযোজ্য।

তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি পদে থাকা অবস্থায় কারও বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি মামলা করা যাবে না। থানায় মামলা করতে গেলেও তা নেওয়ার সুযোগ নেই—এটি রাষ্ট্রপতি পদে থাকার সময়ের জন্য।’

তবে তিনি বলেন, পদত্যাগের পর পরিস্থিতি ভিন্ন। উনি এখন আর রাষ্ট্রপতি নন। ফলে পদত্যাগের পরের সময়টাতে নতুন কোনো অপরাধ করলে তার বিরুদ্ধে স্বাভাবিক আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।

সাবেক রাষ্ট্রপতির ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন সময়ের দায়মুক্তি কতটা কার্যকর থাকবে, সেটাই মূল আইনি প্রশ্ন।

শাহদীন মালিকের মতে, রাষ্ট্রপতি থাকা অবস্থায় কোনো অপরাধের অভিযোগ থাকলেও পদ ছাড়ার পর সেই অভিযোগে মামলা করা যেতে পারে।

তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি থাকার সময় যদি তিনি কোনো অপরাধ করে থাকেন, ধরুন ২০২৫ সালে, তখন তো ২০২৫ সালে মামলা করা যেত না। কিন্তু এখন সেই অপরাধের জন্য মামলা দায়ের করা যাবে—যে ওই তারিখে তিনি অপরাধ করেছেন।’

অর্থাৎ সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদের সুরক্ষা রাষ্ট্রপতি থাকা অবস্থায় ফৌজদারি কার্যক্রম থেকে সুরক্ষা দিলেও, পদ ছাড়ার পর অতীতে সংঘটিত কোনো অপরাধের অভিযোগ একেবারে বিচারের বাইরে চলে যাবে কি না—এ বিষয়ে আইনি ব্যাখ্যার সুযোগ রয়েছে।

তবে শাহদীন মালিকের মতে, অভিযোগের গ্রহণযোগ্যতার জন্য নির্দিষ্ট অপরাধের তথ্য থাকতে হবে।

তিনি বলেন, ‘অভিযোগ তো যে কেউ করতে পারে। কিন্তু অভিযোগের মূল কথা হলো—কখন, কোথায়, কী এবং কীভাবে। নির্দিষ্ট ঘটনা ছাড়া শুধু অভিযোগের ভিত্তিতে বিচারিক প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া কঠিন।’

রাষ্ট্রপতির দায়মুক্তি কোনো সাধারণ ক্ষমা নয়। এটি কেবল রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের সঙ্গে সম্পর্কিত কাজের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

অর্থাৎ রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করার সময় কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়া, সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রয়োগ করা বা রাষ্ট্রপতির পদ সংশ্লিষ্ট কোনো কাজের জন্য তাকে আদালতে দাঁড় করানোর ক্ষেত্রে সংবিধানের সুরক্ষা প্রযোজ্য হতে পারে।

তবে ব্যক্তিগত অপরাধ, দুর্নীতি বা রাষ্ট্রপতির দায়িত্বের বাইরে কোনো অপরাধের অভিযোগ থাকলে বিষয়টি ভিন্ন।

শাহদীন মালিক বলেন, ‘উনি যদি আজ রাতে কোনো বাসায় চুরি করেন এবং বাসার মালিক সন্দেহ করেন যে সাবেক রাষ্ট্রপতি চুরি করেছেন, তাহলে সেই ব্যক্তি অবশ্যই থানায় গিয়ে অভিযোগ করতে পারবেন।’

তবে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে কোনো সিদ্ধান্ত বা কর্মকাণ্ড নিয়ে মামলা হলে সেখানে অভিযোগের প্রকৃতি গুরুত্বপূর্ণ।

সাবেক রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ভূমিকার অভিযোগ তুলে বিচার চাওয়ার বিষয়টিও আইনি প্রশ্ন তৈরি করেছে।

শাহদীন মালিক বলেন, শুধু রাজনৈতিক অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে বিচারের মুখোমুখি করা যায় না। অভিযোগের নির্দিষ্ট ভিত্তি থাকতে হবে।

তিনি বলেন, ‘যদি কেউ হয়রানি করার জন্য কোনো অ্যাঙ্গেল বের করতে চায়, তাহলে সেটিও আইনের প্রশ্ন তৈরি করবে। জেনেশুনে কাউকে হয়রানি করার উদ্দেশ্যে মামলা করাও আইনের চোখে অপরাধ।’

তার মতে, রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক ক্ষমতার সীমাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রপতির নির্বাহী ক্ষমতা নেই। সংবিধান অনুযায়ী প্রধান বিচারপতি ও প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ ছাড়া অধিকাংশ কাজই প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শক্রমে করতে হয়।’

সংবিধানের ৫২ অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতির অভিশংসনের বিধান রয়েছে। সংবিধান লঙ্ঘন বা গুরুতর অসদাচরণের অভিযোগ উঠলে সংসদ নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রপতিকে অপসারণ করতে পারে।

আইনজ্ঞদের একটি অংশের মতে, কোনো রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে যদি গুরুতর অভিযোগ থাকে, তাহলে দায়িত্বে থাকা অবস্থায় তাকে অভিশংসনের মাধ্যমে অপসারণ করা হলে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপের সুযোগ তৈরি হতে পারত।

তবে মো. সাহাবুদ্দিন অভিশংসনের মাধ্যমে অপসারিত হননি। তিনি স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেছেন। 

শাহদীন মালিকের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, পদত্যাগের পর রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক সুরক্ষার বিষয়টি আর আগের মতো থাকে না। তবে কোনো অভিযোগ বিচারের উপযুক্ত কি না, সেটি নির্ভর করবে অভিযোগের ধরন, প্রমাণ ও আইনি প্রক্রিয়ার ওপর।

সাবেক রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, সরকার এখন পর্যন্ত আমলে নেওয়ার মতো কোনো অভিযোগ পায়নি।

তিনি বলেন, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল বা বিরোধী পক্ষ অভিযোগ তুলতে পারে, এটি তাদের রাজনৈতিক অধিকার। তবে রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব পালনকালে সাংবিধানিক নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করেছেন এবং তিনি সাংবিধানিক সুরক্ষা পেয়েছেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় তার দায়মুক্তি ছিল এবং ফৌজদারি অপরাধের ক্ষেত্রেও আদালতে মামলা করার সুযোগ নেই। তবে রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগের কোনো বিষয় থাকলে তা আইন অনুযায়ী বিবেচনার বিষয় হতে পারে।

আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানও বলেছেন, সরকার অভিযোগগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখবে এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করবে।

রাষ্ট্রপতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ক্ষমতা হলো ক্ষমা প্রদর্শনের এখতিয়ার।

সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি কোনো আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষের দেওয়া সাজা মওকুফ, স্থগিত বা পরিবর্তন করতে পারেন।

তবে এই ক্ষমতা কাউকে বিচারের ঊর্ধ্বে তুলে দেয় না। অর্থাৎ রাষ্ট্রপতি কারও সাজা ক্ষমা করতে পারেন, কিন্তু নিজে কোনো অপরাধ করলে তার বিরুদ্ধে সংবিধান নির্ধারিত প্রক্রিয়াই অনুসরণ করতে হবে।

বাংলাদেশের ইতিহাসে সাবেক রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগে বিচারের নজির খুব বেশি নেই। তবে সামরিক শাসন বা রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সাবেক রাষ্ট্রক্ষমতাধর ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা ও বিচার হয়েছে।

সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে মামলা হয়েছিল। জনতা টাওয়ার দুর্নীতি মামলায় তাকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল এবং তিনি কারাভোগও করেন। ক্ষমতা ছাড়ার পর ১৯৯১ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত প্রথম দফায় প্রায় ৬ বছর এবং ২০০০ থেকে ২০০১ সালে দ্বিতীয় দফায় প্রায় চার মাস কারাবন্দী ছিলেন তিনি।

এছাড়া, বাংলাদেশের পঞ্চম রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমেদের বিরুদ্ধেও মামলা দায়ের করা হয়েছে।   

শাহদীন মালিক বলেন, ‘এরশাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল দায়িত্বের বাইরে ব্যক্তিগত দুর্নীতির অভিযোগে।’

তিনি আরও বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও ক্ষমতা ছাড়ার পর রাষ্ট্রপ্রধানদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি ফ্রান্সের সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলা সারকোজি এবং পেরুর সাবেক প্রেসিডেন্ট আলবার্তো ফুজিমোরির কথা উল্লেখ করেন।

সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ উঠেছে, সেগুলোর আইনি পরিণতি নির্ভর করবে অভিযোগের ধরন ও প্রমাণের ওপর।

যদি অভিযোগগুলো রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় নেওয়া কোনো সিদ্ধান্ত বা সাংবিধানিক ভূমিকার সঙ্গে সম্পর্কিত হয়, তাহলে সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদের দায়মুক্তি তার রক্ষাকবচ হবে।

কিন্তু যদি তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগের কোনো অপরাধ, ব্যক্তিগত দুর্নীতি বা রাষ্ট্রপতির দায়িত্বের বাইরে কোনো অপরাধের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া যায়, তাহলে সেটি তদন্ত ও বিচারের আওতায় আসতে পারে।

মো. সাহাবুদ্দিনের ক্ষেত্রে মূল প্রশ্ন হবে—তার বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের অংশ, নাকি দায়িত্বের বাইরে কোনো অপরাধের সঙ্গে সম্পর্কিত।

Related Articles

Latest Posts