আদালতের স্থগিতাদেশে আটকে থাকা ব‍্যাংক লোন ৩ বছরে বেড়ে ১ লাখ ৮২ হাজার ৪১৯ কোটি

আদালতের স্থগিতাদেশে ঋণগ্রহীতার কাছে আটকে আছে ১ লাখ ৮২ হাজার ৪১৯ কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ পর্যন্ত ৩ বছরে আটকে থাকা এই টাকার পরিমাণ বেড়েছে ৮ গুণেরও বেশি।

২০২৪ সালে এই পরিমাণ ছিল ১ লাখ ১ হাজার ৪২৯ কোটি টাকা। পরের বছরের শেষ নাগাদ ৮০ শতাংশ বেড়ে তা দাঁড়ায় ১ লাখ ৮২ হাজার ৪১৯ কোটি টাকা। এই সময়ে আদালতের আশ্রয় নেওয়া ঋণগ্রহীতার সংখ্যা হঠাৎ বেড়ে গেছে।

এর আগে ২০২২ সালের শেষে আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়ে আটকে রাখা ঋণের পরিমাণ ছিল ২১ হাজার ২২৬ কোটি টাকা। সেখান থেকেই এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা শুরু হয়। ২০২৩-২৪ সময় থেকে এই অবস্থা হঠাৎ তীব্র হয়ে ওঠে। মাত্র ১২ মাসে স্থগিতাদেশে আটকে থাকা লোনের পরিমাণ বেড়ে যায় দ্বিগুণেরও বেশি।

এদিকে আরও বেশি ঋণগ্রহীতা আদালতের দ্বারস্থ হওয়ায় স্থগিতাদেশ-সংক্রান্ত মামলার সংখ্যাও বেড়েছে প্রায় ৪ গুণ। ২০২২ সালে এমন মামলা ছিল ২২৬টি, যা ২০২৫ সালে বেড়ে হয় ৮৪৫টি।

দেশের ব্যাংকিং খাত যখন রেকর্ড পরিমাণ খেলাপি ঋণের চাপে হিমশিম খাচ্ছে, সে সময় আদালতের স্থগিতাদেশ সংশ্লিষ্ট লোনের পরিমাণ ঋণ দ্রুত বাড়ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘ফিন্যানসিয়াল স্ট্যাবিলিটি রিপোর্ট ২০২৫’ এ উল্লেখ করা হয়েছে, ‘স্থগিতাদেশে থাকা ঋণের ধারাবাহিক বৃদ্ধি ব্যাংকিং খাতের তারল্য ও আয়ের ওপর উল্লেখযোগ্য চাপের ইঙ্গিত।’

আর্থিক স্থিতিশীলতা জোরদারে ব্যাংকিং-সংক্রান্ত মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি ও আইনি প্রতিবন্ধকতা দূর করতে নীতিগত পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

গত বছরের শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা। অশ্রেণিকৃত পুনঃতফসিল করা ঋণ ছিল ২ লাখ ৬৮ হাজার ৭৩৩ কোটি টাকা এবং অবলোপন করা ঋণ ৮৩ হাজার ৪৭৯ কোটি টাকায় পৌঁছায়। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ওই বছরে তিন ধরনের ঋণের পরিমাণই বেড়েছে।

মার্কেন্টাইল ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মতি উল হাসান বলেন, খেলাপি ঋণ আদায়ে ব্যাংকগুলো সমন্বিতভাবে চেষ্টা করছে। কিছু ঋণগ্রহীতা এসব প্রচেষ্টা ঠেকাতে আদালতের স্থগিতাদেশ চাচ্ছেন।

তিনি বলেন, ‘স্থগিতাদেশ জারি হলে ঋণ আদায়ে আমাদের সব কার্যক্রম থেমে যায়। কোনো সম্পত্তি নিলামে তোলার উদ্যোগ নেওয়ার পর আদালত স্থগিতাদেশ দিলে সেটি প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত আমরা আর এগোতে পারি না।’

‘ঋণ আদায়ের ক্ষেত্রে এটি বড় চ্যালেঞ্জ। এর সামগ্রিক প্রভাবে আমাদের নগদ অর্থপ্রবাহ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং অর্থ আটকে থাকে, ফলে নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা কমে যায়,’ যোগ করেন তিনি।

জানতে চাইলে ব্যারিস্টার শামীম খালেদ আহমেদ বলেন, অনেক খেলাপি ঋণগ্রহীতা হাইকোর্ট থেকে স্থগিতাদেশ নেন—ব্যাংক যেন তাদের খেলাপি হিসেবে শ্রেণিভুক্ত করতে না পারে। তবে সব স্থগিতাদেশই খেলাপি ঋণগ্রহীতাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়।

তিনি আরও বলেন, ‘কিছু ক্ষেত্রে ব্যাংকের পরিচালকরাও স্থগিতাদেশ চেয়ে আদালতের দ্বারস্থ হন।’

‘ব্যাংকিং-সংক্রান্ত মামলা নিষ্পত্তিতে মাত্র দুটি আদালত থাকায় ঋণ-সংক্রান্ত স্থগিতাদেশের সংখ্যা বাড়ছে। এসব মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য আদালতের সংখ্যা বাড়ানো উচিত। যত বেশি দেরি হবে, ব্যাংকিং খাতের ক্ষতিও তত গুরুতর হবে,’ মনে করেন এই আইনজীবী।

স্থানীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, এই বৃদ্ধি ব্যাংকিং খাতের আরও একটি দুর্বলতা তুলে ধরছে। খাতটি ইতোমধ্যে বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণের ভারে জর্জরিত।

‘দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশকে একইসঙ্গে বেশ কয়েকটি সমস্যা মোকাবিলা করতে হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত খেলাপি ঋণ, প্রভিশনে বড় ঘাটতি, অবলোপন করা হলেও এখনো আদায় না হওয়া ঋণ ও আদালতের স্থগিতাদেশে থাকা ঋণের দ্রুত বৃদ্ধি,’ যোগ করেন তিনি।’

ফাহমিদা বলেন, সুশাসনের দৃষ্টিকোণ থেকে স্থগিতাদেশের বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

তার মতে, ‘সৎ ঋণগ্রহীতাদের অধিকার রক্ষায় আদালত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং স্থগিতাদেশ চাওয়া প্রত্যেক ঋণগ্রহীতাকে ইচ্ছাকৃত খেলাপি হিসেবে দেখা উচিত নয়।’

তবে এত বিপুল পরিমাণ ব্যাংকঋণ স্থগিতাদেশে আটকে থাকলে সামগ্রিক অর্থনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে, বলেন তিনি।

‘দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া ঋণ আদায় প্রচেষ্টা ধীরগতি, পাওনাদারদের অধিকার দুর্বল ও কৌশলী ঋণগ্রহীতাদের ঋণ পরিশোধ বিলম্বিত করার উপায় হিসেবে মামলাকে উৎসাহিত করতে পারে।’

সিপিডির নির্বাহী পরিচালক বলেন, মূলধন নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। ব্যাংকগুলো যদি অবনতি হওয়া সম্পদের বিপরীতে পর্যাপ্ত প্রভিশন সংরক্ষণ করতে না পারে, তাহলে তাদের দেখানো মূলধনে ঋণ পোর্টফোলিওর প্রকৃত আর্থিক ক্ষতির প্রতিফলন নাও ঘটতে পারে।

তিনি বলেন, এসব ক্ষতি স্বীকার করে পর্যাপ্ত সংরক্ষণ রাখলে কিছু ব্যাংকের মূলধন দুর্বলতা প্রকাশ পেতে পারে। তাই বিষয়টি শুধু ঋণ আদায়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি মূলত আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার বিষয়।

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ঋণ খেলাপির সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্থগিতাদেশ চেয়ে আদালতের দ্বারস্থ হওয়া ঋণগ্রহীতার সংখ্যাও বেড়েছে।

‘আমি বুঝি, আদালতের দ্বারস্থ হওয়া একটি মৌলিক অধিকার। তবে স্থগিতাদেশ পাওয়ার আগে ঋণগ্রহীতাকে ঋণের একটি নির্দিষ্ট অংশ ডাউন পেমেন্ট হিসেবে পরিশোধ করতে হবে—এমন বিধান থাকা উচিত। এতে অনেক ঋণগ্রহীতা আদালতে যেতে নিরুৎসাহিত হবেন,’ মনে করেন তিনি।

অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান মাশরুর আরেফিন বলেন, রিট আবেদনের ক্রমবর্ধমান ব্যবহার এখন সংক্ষুব্ধ পক্ষের সাংবিধানিক অধিকার রক্ষার মাধ্যম থেকে ধারাবাহিকভাবে খেলাপিদের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।

তিনি বলেন, এই প্রক্রিয়া সাধারণত তিনটি ধাপে চলে।

প্রথমে ঋণগ্রহীতারা তাদের ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরোর (সিআইবি) রেকর্ডের ওপর হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ নেন। ফলে তারা নিজেদের ঋণযোগ্য ভাবমূর্তি বজায় রাখতে, ব্যাংকিং কার্যক্রম চালিয়ে যেতে, এমনকি নতুন ঋণও নিতে পারেন।

দ্বিতীয়ত, পাওনা আদায়ে ব্যাংক বন্ধকি সম্পত্তি নিলামে তোলার উদ্যোগ নিলে ঋণগ্রহীতারা আরেকটি স্থগিতাদেশ চান। এতে ব্যাংকের জন্য জামানত নগদ অর্থে রূপান্তর করা অনেক কঠিন হয়ে পড়ে।

সর্বশেষ নিম্ন আদালত ও হাইকোর্টের দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ায় আটকে পড়ে ব্যাংকগুলো। এতে ঋণ আদায়ের উদ্যোগ ৩ থেকে ৪ বছর পর্যন্ত বিলম্বিত হয় এবং মামলার জট বাড়তে থাকে, যোগ করেন তিনি।

মাশরুর সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি আরও বলেন, ‘শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো আর্থিক ব্যবস্থা। এভাবে সময়ক্ষেপণের কারণে আদায়যোগ্য অর্থের মূল্য কমে, আইনি ব্যয় বাড়ে, তারল্য আটকে যায় ও ঋণশৃঙ্খলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।’

Related Articles

Latest Posts