পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলার বলদিয়া ইউনিয়নের ডুবি গ্রামের অধিকাংশ মানুষ যখন ঘুমে আচ্ছন্ন—সূর্য ওঠার অনেক আগে কাজের প্রস্তুতি শুরু করেন ময়না বৈদ্য ও তার স্বামী অধীর বৈরাগী।
এখনো সনাতনী পদ্ধতিতে খাবার লবণ তৈরির কারখানায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন এই দম্পতি। স্থানীয়ভাবে এটি জ্বালানো লবণ নামে পরিচিত। লবণ কারখানার উচ্ছিষ্ট চুলায় জ্বালিয়ে তৈরি করা হয় বলে এই নাম।
অর্ধ শতাব্দীর বেশি সময় আগে শুরু হয় লবণ তৈরির এই কৌশল। তবে এটি কোনো স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে শুরু হয়নি।
স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দারা জানিয়েছেন, চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষের সময় ডুবি গ্রামে শুরু হয়েছিল জ্বালানো লবণ তৈরি।
দুর্ভিক্ষের সময় অন্যান্য জিনিসপত্রের সঙ্গে লবণের দামও অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গিয়েছিল। এত বেশি বেড়েছিল যে সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার বাইরে চলে যায়। সে সময় আবু বক্কর সিদ্দিকী নামে ডুবি গ্রামেরই এক বাসিন্দা লবণ কারখানার উচ্ছিষ্ট সংগ্রহ করে নিয়ে আসেন। সেই উচ্ছিষ্ট জ্বালিয়ে তৈরি হয় খাবার লবণ, জানান তারা।
কারখানায় লবণ তৈরির সময় উচ্ছিষ্ট পানি একটি জায়গায় জড়ো করে রাখা হয়। পরবর্তীতে এটি জমে কঠিন আকার নেয়। এতে যথেষ্ট পরিমাণে লবণ থাকে। বক্করকে অনুসরণ করে আরও অনেকে লবণ কারখানা থেকে এই উচ্ছিষ্ট সংগ্রহ করতে শুরু করেন। এক পর্যায়ে এটি বাণিজ্যিক রূপ নেয়।
ডুবি গ্রামের বাসিন্দারা জানান, আশে পাশের শতাধিক গ্রামের সহস্রাধিক মানুষ এই পেশায় যুক্ত হন। ঝালকাঠি, খুলনা ও চট্টগ্রাম থেকে সংগ্রহ করা হতো এই কাঁচামাল। পরবর্তীতে এটি বড় ট্যাংকে আবারও পানি দিয়ে গলিয়ে চুলায় জ্বাল দিয়ে তৈরি করা হতো লবণ।
ময়না-অধীর দম্পতি দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, সকালে উঠে প্রথমেই তারা চুলা প্রস্তুত করেন। জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয় কাঠের গুঁড়া। ৪০ বর্গফুটের এই চুলা প্রস্তুত করতেই তাদের অনেকটা সময় লেগে যায়। এরপর শুরু হয় লবণ তৈরির প্রক্রিয়া।
বিশালাকৃতির পাত্রে লবণাক্ত পানি জ্বাল দিয়ে খাবার উপযোগী লবণ তৈরি করতে অন্তত ৬ ঘণ্টা সময় লাগে। এই দম্পতি প্রতিদিন ৪টি চুলায় দুবারে সর্বোচ্চ ৩০ মণ লবণ তৈরি করতে পারেন।
অধীর বলেন, ‘লবণ উৎপাদনের ওপর ভিত্তি করে আমাদের মজুরি হয়।’
‘১ মণ লবণ উৎপাদন করলে একজন শ্রমিক পায় ৬০ টাকা। তবে উৎপাদন খরচ—১৩ থেকে ১৪ টাকা মজুরি থেকেই বাদ যায়,’ বলেন তিনি।
এ কাজটি খুব সহজ নয় উল্লেখ করে অধীর বলেন, ‘এক নাগাড়ে ৬ ঘণ্টা চুলার পাশেই থাকতে হয়। পানি গরম হলে অন্যান্য বর্জ্য ফেনা আকারে উঠে আসে। সেগুলো তুলে ফেলে দিতে হয়। কিছুক্ষণ পর পর নাড়তে হয়। ৬ ঘণ্টা পর পাত্রের ভেতরে ধবধবে সাদা লবণ দৃশ্যমান হতে থাকে।’
তিনি বলেন, ‘এতে কোনো ধরনের রাসায়নিক মেশানো হয় না। চুলা থেকে নামিয়ে লবণ থেকে পানি ঝরাতে রাখা হয় বাঁশের তৈরি ঝুড়িতে। এরপর বড় কাঠের বাকশে সংরক্ষণ করা হয়। বাজারজাত করার আগে শেষ ধাপে আয়োডিন মিশিয়ে প্যাকেটে তোলা হয়।’
অধীর জানান, ময়নার পরিশ্রম আরও বেশি। কারখানায় দীর্ঘ সময় কাজ করার পর বাড়ি ফিরে তার স্ত্রীকে গৃহস্থালি কাজও করতে হয়।
কেবল লবণ তৈরি নয়, প্রতিদিন কারখানা ও লবণ জ্বাল দেওয়ার পাত্র পরিষ্কার করা তাদেরই দায়িত্ব। সব কাজ শেষ করে রাতে তারা সর্বোচ্চ ৪ ঘণ্টা ঘুমাতে পারেন, জানান ময়না।
তাদের সঙ্গে একই কারখানায় কাজ করেন মোহাম্মদ এমদাদুল ও সালমা দম্পতি।
এমদাদুল জানান, বর্তমানে এ পেশায় টিকে থাকতে তাদের কঠোর সংগ্রাম করতে হচ্ছে। ‘আগে লবণ উৎপাদন করে ভালোই আয় হতো। গত কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে আয় কমছে।’
তিনি বলেন, ‘মূল সমস্যা হলো, উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে। অন্যদিকে সে অনুযায়ী লবণের দাম বাড়েনি।’
‘এক সময় লবণ কারখানার এই উচ্ছিষ্ট বিনামূল্যে পাওয়া যেত। এখন কিনে আনতে হয় এবং সেই দামও আগের চেয়ে বেড়েছে। জ্বালানি হিসেবে কাঠের গুঁড়া ব্যবহার করা হয়। সেটার দামও বেড়ে গেছে। পল্ট্রি খামারে কাঠের গুঁড়ার ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় চাহিদা বেড়েছে কয়েক গুণ। শ্রমিকের মজুরিও বেড়েছে, সে অনুযায়ী লবণের দাম বাড়েনি,’ যোগ করেন তিনি।
স্থানীয় বাসিন্দা আতিকুর রহমান জানান, এক সময় জমজমাট অধিকাংশ কারখানাই বন্ধ হয়ে গেছে। ডুবি গ্রামে ২২টি কারখানা ছিল। এখন কোনো রকমে টিকে আছে দুটি।
স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ২ দশক আগেও আশে পাশের শতাধিক গ্রামের সহস্রাধিক মানুষ লবণ কারখানায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন।
‘যে দুটি কারখানা চালু আছে, সেগুলো কত দিন টিকে থাকবে তারও ঠিক নাই,’ আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
একই শঙ্কা প্রকাশ করেন একটি লবণ কারখানার মালিক সেলিম মাঝি। তিনি মনে করেন, সরকারি সহায়তা পেলে এই কারখানাগুলোকে লাভজনক অবস্থায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব। তাতে অনেক মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।
নেছারাবাদে উৎপাদিত লবণের চাহিদা বেশি মাদারীপুর, বরিশালের গৌরনদী ও আগৈলঝড়ায়। এছাড়া, পিরোজপুরের বেশ কিছু এলাকায় এই লবণ বিক্রি হয়। তবে ডুবি গ্রামে উৎপাদিত লবণের চাহিদা নেছারাবাদে তুলনামূলক কম বলে জানান মুদি ব্যবসায়ী মোস্তাফিজুর রহমান মিলন। তিনি বলেন, ‘এ লবণ রান্নার কাজে বেশি ব্যবহার করা হয়। অনেকে গরুকে খাওয়ানোর জন্যও কিনে নিয়ে যান।’
স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত এই লবণ স্বাস্থ্যসম্মত কি না জানতে চাইলে পিরোজপুর সদর হাসপাতালের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. সুরঞ্জিৎ কুমার সাহা ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘লবণে অপদ্রব্যের মাত্রা নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে থাকতে হবে। এছাড়া সঠিক পরিমাণে আয়োডিন ও কালারিং এজেন্ট দেওয়া হলে সেটা ব্যবহার উপযোগী হবে।’
নিয়মিত লবণ পরীক্ষা করার পরামর্শও দেন তিনি।
নেছারাবাদের ডুবি গ্রামের একটি লবণ কারখানা বিএসটিআই (বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন) অনুমোদিত। বিএসটিআই বরিশাল বিভাগীয় কার্যালয়ের ফিল্ড অফিসার মো. ইয়াছির আরাফাত জানান, ওই কারখানার লবণের মান নিয়মিত যাচাই করা হয়।
ময়না-অধীর ও এমদাদুল-সালমা জানান, ডুবি গ্রামে টিকে থাকা দুটি কারখানা বন্ধ হয়ে গেলে তাদের নতুন করে অন্য পেশা খুঁজতে হবে। পাশাপাশি চিরতরে হারিয়ে যাবে লবণ কারখানার উচ্ছিষ্ট থেকে লবণ তৈরির ঐতিহ্যবাহী এই শিল্প।
