‘মুস্তাফিজুর ভাই আফসোস করেছিলেন, কেউ আর তেমন খোঁজ করেন না’

বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) স্বর্ণযুগের অন্যতম নির্মাতা মুস্তাফিজুর রহমান। হুমায়ূন আহমেদের কালজয়ী ধারাবাহিক এইসব দিনরাত্রির প্রযোজক ছিলেন তিনি। একই লেখকের জনপ্রিয় উপন্যাস শঙ্খনীল কারাগার অবলম্বনে নির্মাণ করেছিলেন চলচ্চিত্র। একসময় বিটিভির মহাপরিচালকের দায়িত্বও পালন করেন এই গুণী নির্মাতা। গত ২৬ জুলাই না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছেন তিনি।

এইসব দিনরাত্রি নাটকের নীলু ভাবি ও শঙ্খনীল কারাগারের চলচ্চিত্রের রাবেয়া চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকের হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছেন গুণী অভিনেত্রী ডলি জহুর। প্রয়াত মুস্তাফিজুর রহমানকে স্মরণ করে দ্য ডেইলি স্টারের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি।

স্মৃতির ঝাঁপি খুলে ডলি জহুর বলেন, ‘বহু বছর আগে দখিনের জানালা নামে একটি নাটকে অভিনয় করেছিলাম। সেখানে আমার সহশিল্পী ছিলেন প্রয়াত নায়ক বুলবুল আহমেদ। নাটকটি দর্শকদের মধ্যে বেশ সাড়া ফেলেছিল। সেই নাটকের প্রযোজক ছিলেন মুস্তাফিজুর রহমান সাহেব। দখিনের জানালা করার পর থেকেই আমি তার প্রিয় শিল্পীদের একজন হয়ে উঠি।’

তিনি বলেন, ‘এরপর থেকেই বিটিভির সোনালি দিনের অনেক নাটকে তার সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পাই। তিনি খুব কম কথা বলতেন। অনেকেই তাকে গম্ভীর মানুষ ভাবতেন। আসলে তিনি ছিলেন কাজপাগল একজন মানুষ। ভালো কাজের প্রতি তার ছিল অসীম নিষ্ঠা।’

ডলি জহুরের ভাষায়, দখিনের জানালার পর তিনি আমাকে ডেকে এইসব দিনরাত্রি নাটকের নীলু ভাবি চরিত্রে চূড়ান্ত করেন। এরপর তো ইতিহাস। নাটকটি রেকর্ড গড়েছিল, দর্শকদের ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছিলাম। আজও মানুষ নীলু ভাবির কথা মনে রেখেছে। এর পুরো কৃতিত্ব মুস্তাফিজুর রহমান সাহেবের।

মুস্তাফিজুর রহমানের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল পারিবারিক আন্তরিকতার।

‘আমি তাকে কখনো বাবার মতো, কখনো বড় ভাইয়ের মতো, আবার কখনো গুরুর আসনে দেখেছি। সারাজীবন তাকে শ্রদ্ধা করেছি। তিনি আমাকে ভীষণ স্নেহ করতেন। তার কর্মই তাকে মানুষের মাঝে বাঁচিয়ে রাখবে।’

শেষবার তার সঙ্গে দেখা হওয়ার স্মৃতিও তুলে ধরেন ডলি জহুর। তিনি বলেন, ‘প্রায় ১৯ থেকে ২০ দিন আগে তাকে দেখতে গিয়েছিলাম। সেটিই ছিল শেষ দেখা। গিয়ে দেখি তিনি হুইলচেয়ারে বসে আছেন। খুব কষ্ট লেগেছিল। এমন একজন কর্মময় মানুষকে ওই অবস্থায় দেখে মন ভেঙে যায়। তার স্ত্রীও পাশে ছিলেন।’

তিনি বলেন, ‘অনেকক্ষণ গল্প করেছি। তিনি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে ছিলেন। সারাজীবন যেমন কম কথা বলতেন, সেদিনও তেমনই কম কথা বলেছেন। শুধু একসময় আক্ষেপ করে বললেন, কেউ আর তেমন করে খোঁজ করেন না, দেখতেও আসেন না। কথাটা শুনে খুব খারাপ লেগেছিল।’

‘মৃত্যুর খবরটা শোনার পর থেকে মনটা খুব খারাপ। চোখ ভিজে আসছে। এখন শুধু মনে হচ্ছে, আরও কয়েকবার যদি গিয়ে দেখা করতাম! অসুস্থ একজন মানুষকে একটু সময় দিলেও তিনি মানসিকভাবে ভালো থাকেন।’

হুমায়ূন আহমেদের অমর সৃষ্টি শঙ্খনীল কারাগার চলচ্চিত্রে রাবেয়া চরিত্রে অভিনয়ের প্রসঙ্গও উঠে আসে কথোপকথনে।

ডলি জহুর বলেন, ‘সত্যি বলতে, তখন অনেকেই চেয়েছিলেন রাবেয়া চরিত্রটি সুবর্ণা মুস্তাফা করুন। কিন্তু মুস্তাফিজুর রহমান ভাই সিদ্ধান্ত নিলেন, চরিত্রটি আমি করব। তিনি বিশ্বাস করতেন, এই চরিত্রটি আমি যথাযথভাবে ফুটিয়ে তুলতে পারব।’

তিনি আরও বলেন, ‘তখন আমার সন্তান হয়েছিল। কিছুদিন পরই শুটিংয়ে অংশ নিই। মুস্তাফিজুর রহমান ভাই আমার ওপর আস্থা রাখতেন। নীলু ভাবি হোক কিংবা রাবেয়া—দুটি চরিত্রই তিনি আমাকে দিয়েছেন তার সেই বিশ্বাস থেকেই।’

সবশেষে প্রয়াত এই নির্মাতার জন্য দোয়া চেয়ে ডলি জহুর বলেন, ‘সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন মুস্তাফিজুর রহমান ভাইকে জান্নাত নসিব করেন। তার আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি।’

Related Articles

Latest Posts