সন্তানকে জীবদ্দশায় সম্পত্তি লিখে দেওয়ার পর অনেক বাবা-মাকে পরে নিজেরই বাড়িতে অসহায় অবস্থায় দিন কাটাতে হয়েছে—এমন অভিযোগ নতুন নয়। ছেলে-মেয়ে দেখাশোনা করছে না, নিজের চিকিৎসার খরচ জোগাতে পারছেন না, এমনকি যে বাড়ি একসময় নিজের ছিল, সেটা বিক্রি বা ব্যবহার নিয়েও সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার হারিয়ে ফেলেছেন, এমন বহু বিরোধ শেষ পর্যন্ত আদালতে গড়িয়েছে।
এই বাস্তবতা থেকেই সরকার এবার সম্পত্তি হস্তান্তর আইন-১৮৮২-এ বড় সংশোধনের কথা বলছে। প্রস্তাব হচ্ছে, সন্তানকে সম্পত্তি গিফট বা হস্তান্তর করলেও বাবা-মা জীবিত থাকা পর্যন্ত সেই সম্পত্তি ভোগ-দখলের অধিকার (জীবনস্বত্ব) নিজের কাছে রাখতে পারবেন। আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানের ভাষ্য, এতে পারিবারিক বিরোধ ও দেওয়ানি মামলা কমবে।
বাংলাদেশে ধর্মীয় আইন এবং সাধারণ সম্পত্তি আইন—দুই ধরনের ব্যবস্থার মাধ্যমে সম্পত্তি হস্তান্তর করা যায়।
মুসলিম আইনে ‘হেবা’: মুসলিম আইনে জীবদ্দশায় স্বেচ্ছায় ও বিনা মূল্যে কাউকে সম্পত্তি দিয়ে দেওয়াকে হেবা বলা হয়। হেবা বৈধ হওয়ার জন্য সাধারণভাবে তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—দাতা স্পষ্টভাবে হেবা ঘোষণা করবেন, গ্রহীতা তা গ্রহণ করবেন এবং সম্পত্তির দখল হস্তান্তর হবে।
বাধ্যতামূলক না হলেও বাংলাদেশে পরে রেজিস্ট্রেশন আইন, ১৯০৮-এর মাধ্যমে হেবা ঘোষণা নিবন্ধনযোগ্য করা হয়েছে।
সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের অধীনে ‘গিফট’: সম্পত্তি হস্তান্তর আইন, ১৮৮২-এর ১২২ ও ১২৩ ধারায় দান বা গিফটের বিধান রয়েছে। এর অধীনে ধর্মের ভেদাভেদ ছাড়া যেকোনো জীবিত ব্যক্তি অন্য কোনো জীবিত ব্যক্তির নামে স্বেচ্ছায় জমি বা স্থাবর সম্পত্তি দান করতে পারেন।
উইল ও ওয়াসিয়তনামা: মুসলিম আইন ও হিন্দু আইনের অধীনে ইচ্ছাপত্র বা উইল করা যায়। উইল কার্যকর হয় মালিকের মৃত্যুর পরে।
তবে ইসলামি ফিকহ বা মুসলিম আইনে আছে ওয়াসিয়ত বা ওয়াসিয়তনামা। বাস্তব আইনি প্রয়োগে উইল আর ওয়াসিয়তনামা মূলত একই বিষয়কে নির্দেশ করে।
এই আইনে জীবিত অবস্থায় নিজের সব সম্পত্তি কাউকে দিয়ে দেওয়া যায় না। সর্বোচ্চ এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত (ঋণ ও দাফন-কাফনের খরচ বাদ দিয়ে) দেওয়া যায় এবং ওয়ারিশদের সম্মতির প্রয়োজন হয়।
উত্তরাধিকার: ব্যক্তি জীবিত অবস্থায় সম্পত্তি লিখে না দিলে তার মৃত্যুর পর ধর্মীয় পারিবারিক আইন অনুযায়ী ফারায়েজ বা বণ্টননামার মাধ্যমে সন্তানরা স্বাভাবিক নিয়মেই সম্পত্তির মালিকানা পায়।
সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আইনজীবী আরিফ খান দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, বিদ্যমান আইনের বড় দুর্বলতা হলো—একবার সম্পত্তি দান করে দিলে তা আর ফেরত আনার সুযোগ থাকে না। অনেক বাবা-মা চান সন্তানই সম্পত্তি পাক, তবে জীবদ্দশায় নিজেদের মাথার ছাদটুকুও নিরাপদ থাকুক। কিন্তু বর্তমান আইনে এই স্পষ্ট সুরক্ষার সুনির্দিষ্ট বিধান নেই। এর সুযোগ নিয়ে সম্পত্তি পাওয়ার পর সন্তান অবহেলা করলে বাবা-মা অসহায় হয়ে পড়েন।
মূলত ‘সম্পত্তি হস্তান্তর আইন’-এর ৮ নম্বর ধারা অনুযায়ী দান করার সঙ্গে সঙ্গেই পূর্ণ অধিকার সন্তানের কাছে চলে যায় এবং ১২৬ ধারা মতে কেবল দাতার ইচ্ছায় তা বাতিলও করা যায় না। ফলে বৃদ্ধ বয়সে বাবা-মা মানবিক ও আর্থিক ঝুঁকিতে পড়েন।
পাশাপাশি ভাইবোনদের বিরোধ, দখল ও দান বাতিল কেন্দ্রিক বহু জটিলতায় দেওয়ানি আদালতে মামলার পাহাড় জমছে। এটা বিচার ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ।
সরকার ১৯৬৩ সালের পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্টের একটি ঐতিহাসিক রায়ের আলোকে সম্পত্তি হস্তান্তর আইনে ‘ইউসুফ্রাক্ট রাইট’ (জীবনস্বত্ব) বা জীবদ্দশায় ভোগদখল ও ব্যবহার করার অধিকার যুক্ত করার পরিকল্পনা করছে।
এটি মূলত এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে বাবা-মা সন্তানের নামে সম্পত্তি ‘দান’ বা ‘গিফট’ করলেও যতদিন তারা বেঁচে থাকবেন, ততদিন সেই সম্পত্তি ভোগ-দখল এবং ব্যবহার করার পূর্ণ অধিকার তাদের হাতেই থাকবে। সন্তানরা স্বত্ব পেলেও জীবদ্দশায় বাবা-মাকে উচ্ছেদ করতে পারবে না।
‘জীবনস্বত্ব’ একটি পুরোনো আইনি ধারণা। এর অর্থ মালিকানা এক ব্যক্তির, কিন্তু ব্যবহার ও ভোগের অধিকার অন্য ব্যক্তির।
প্রস্তাব অনুযায়ী, বাবা-মায়ের জীবদ্দশায় সন্তান বা বাবা-মা, কোনো পক্ষই একক সিদ্ধান্তে ওই সম্পত্তি বিক্রি করতে পারবে না।
তবে আইনমন্ত্রী জানিয়েছেন, যদি এমন কোনো জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হয় (যেমন বাবা-মায়ের চিকিৎসার জন্য জরুরি টাকা প্রয়োজন) এবং সম্পত্তি বিক্রি করা জরুরি হয়ে পড়ে, কিন্তু সন্তান তাতে সায় দিচ্ছে না, সেক্ষেত্রে জেলা জজকে বিশেষ ক্ষমতা দেওয়া হবে। বাবা-মা জেলা জজের কাছে আবেদন করলে আদালত বিষয়টি বিবেচনা করে সম্পত্তি বিক্রির অনুমতি দিতে পারবে।
সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে বিশেষ ধর্মীয় পারিবারিক আইন, যেমন মুসলিম ব্যক্তিগত (শরিয়াহ) প্রয়োগ আইন, ১৯৩৭, হিন্দু আইন এবং সম্পত্তি হস্তান্তর আইন, ১৮৮২ পাশাপাশি কাজ করে।
প্রশ্ন উঠতে পারে, নতুন পরিবর্তনগুলো কি মুসলিম শরিয়াহ বা বিশেষ ধর্মীয় আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে?
আইনজীবী আরিফ খান বলেন, এটি কোনোভাবেই ধর্মীয় বা প্রচলিত আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে না। মুসলিম আইনে হেবা বা দান পুরোপুরি অনুমোদিত। শরিয়াহ আইনের কোনো বিধান এখানে বদল করা হচ্ছে না। শরিয়াহ আইনে হেবা করলে যেখানে দখল তাৎক্ষণিক হস্তান্তরিত হতো, প্রস্তাবিত দেওয়ানি আইনি পরিবর্তনের ফলে সেই হস্তান্তরটি কার্যকর হবে দাতার মৃত্যুর পর।
আইনজীবী আরিফ খান মনে করেন, ১৯৬১ সালের আইয়ুব খানের আমলের ‘মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ’-এর পর এটি হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের পারিবারিক আইন কাঠামোর অন্যতম বড় ও আধুনিক আইনি সংস্কার।
তিনি একটি উদাহরণ দিয়ে বলেন, যেমন ধরুন, কোনো দম্পতির কেবল মেয়ে সন্তান বা একজন সন্তান আছে। তারা অনেক সময় আতঙ্কে থাকেন যে জীবদ্দশায় মেয়েকে জমি লিখে দিলে নিজেরা কীভাবে চলবেন, আবার না লিখে দিলে মৃত্যুর পর অন্যান্য আত্মীয়রা দাবি তুলবে কিনা। এই আইনি পরিবর্তন তাদের দুশ্চিন্তা পুরোপুরি দূর করবে।
বাবা-মা বেঁচে থাকা অবস্থায় কাউকে সম্পত্তি লিখে না দিলে, তাদের অবর্তমানে সন্তানরা স্বাভাবিক নিয়মেই সম্পত্তির মালিক হবে। সন্তানকে আইনিভাবে বঞ্চিত করার সাধারণ কোনো সুযোগ নেই (কেবল সন্তান বাবা-মায়ের হত্যাকারী হলে বা সুনির্দিষ্ট বিরল কিছু ক্ষেত্র ছাড়া)।
জমিজমার বাটোয়ারা বা স্বত্ব সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি হয় সাধারণ দেওয়ানি আদালতে। আর বাবা-মায়ের খোরপোশ বা ভরণপোষণের জন্য ‘পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন, ২০১৩’-এর অধীনে ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে যাওয়া যায়।
নতুন প্রস্তাবে জরুরি প্রয়োজনে জমি বিক্রির বিশেষ এখতিয়ার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে জেলা জজ আদালতকে।
