দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন রাজনীতিক ও সামরিক কর্মকর্তারা ভেবেছেন, কিউবা বা ইরানের মতো মধ্যম শক্তির দেশগুলোকে কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রের দাবি মানতে বাধ্য করা যায়। যেমন, অস্ত্র কর্মসূচি বন্ধ করা বা হরমুজ প্রণালি আবার জাহাজ চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া।
কিন্তু সরাসরি সর্বাত্মক যুদ্ধের ঝুঁকি থাকায় তারা সাধারণত ধাপে ধাপে সামরিক চাপ বাড়ানোর পথই বেছে নিয়েছেন। ধারণা ছিল, চাপ বাড়তে থাকলে প্রতিপক্ষ একসময় নতি স্বীকার করবে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক থিংকট্যাংক কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসে প্রকাশিত এক নিবন্ধে মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশ্লেষক রে তাকেহ এই কৌশলের ইতিহাস ও সীমাবদ্ধতা তুলে ধরেছেন।
সমস্যা হলো, বাস্তবে এই কৌশল খুব কম ক্ষেত্রেই সফল হয়েছে। ভিয়েতনাম থেকে শুরু করে ইরান—বিভিন্ন সময়ে মার্কিন প্রশাসন একই ভুল করেছে। এর ফল হয়েছে দীর্ঘ যুদ্ধ এবং বড় ধরনের মানবিক বিপর্যয়।
এই কৌশলের সূচনা হয় ১৯৬০-এর দশকে। তখন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী রবার্ট ম্যাকনামারা ও তার উপদেষ্টারা মনে করতেন, ধীরে ধীরে সামরিক চাপ বাড়ালে উত্তর ভিয়েতনাম বুঝবে যে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার চেয়ে সমঝোতা করাই ভালো। তখন যুক্তরাষ্ট্র নিজের শর্তে আলোচনায় বসতে পারবে।
কিন্তু এই ধারণার বড় দুর্বলতা ছিল, এটি প্রতিপক্ষের সহ্যশক্তি ও মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতাকে গুরুত্ব দেয়নি। অনেক সময় বোমা হামলা সরকারকে দুর্বল করার বদলে আরও শক্তিশালী করে এবং জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করে। এরপর উভয় পক্ষই পাল্টাপাল্টি হামলা বাড়াতে থাকে, আর যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হয়।
ভিয়েতনাম যুদ্ধে এরই ফল দেখা গিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র দেশটিতে আগের সব যুদ্ধ মিলিয়ে যত বোমা ফেলেছিল, তার চেয়েও বেশি বোমা ফেলেছিল। এতে প্রায় ৩০ লাখ ভিয়েতনামি নিহত হন।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কেন ফেব্রুয়ারিতে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছিলেন, তা এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। যুদ্ধের কারণ ও লক্ষ্য নিয়ে তার প্রশাসন বারবার ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছে।
সম্ভবত দুটি ঘটনা তাকে দ্রুত জয়ের আশা দেখিয়েছিল। একটি ছিল ভেনেজুয়েলায় নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার সফল অভিযান। অন্যটি ছিল ইরানের গণ-অভ্যুত্থান, যা দেশটির শাসনব্যবস্থাকে নাড়িয়ে দিয়েছিল।
কিন্তু ইরানের বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। ইসলামি প্রজাতন্ত্র কঠোরভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। দেশটির রাজনৈতিক ও সামাজিক ভিত্তি অনেকের ধারণার চেয়ে শক্তিশালী ছিল।
যুদ্ধের শুরুতেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনিসহ অনেক শীর্ষ কর্মকর্তাকে হত্যা করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল।
তবে ইরানের রাষ্ট্রব্যবস্থা ভেঙে পড়েনি। নতুন নেতৃত্ব দ্রুত নিয়ন্ত্রণ নেয়। তারা যুদ্ধকে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই হিসেবে দেখে এবং সংঘাতকে পারস্য উপসাগর পর্যন্ত ছড়িয়ে দেয়। সেখানে তারা যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের ক্ষতি করে এবং আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল ব্যাহত করে।
এটাই ছিল ইরানের সবচেয়ে বড় চাপ সৃষ্টির উপায়। এতে বৈশ্বিক অর্থনীতি এবং যুক্তরাষ্ট্র—দুইয়ের ওপরই বাড়তি খরচের চাপ পড়ে।
এ ধরনের যুদ্ধে আসল প্রশ্ন কে বেশি ক্ষতি করতে পারে, তা নয়। বরং কে বেশি ক্ষতি সহ্য করতে পারে। যাদের কাছে যুদ্ধ অস্তিত্বের প্রশ্ন, তারা সাধারণত বাইরের শক্তির তুলনায় অনেক বেশি ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত থাকেন।
ট্রাম্পের কৌশলের আরেকটি বৈশিষ্ট্য ছিল অনিশ্চয়তা। কখনো সামরিক অভিযান বন্ধ হয়েছে, আবার হঠাৎ শুরু হয়েছে।
সম্প্রতি ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ইরান যদি হরমুজ প্রণালিতে কোনো জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন বা অন্য অস্ত্র দিয়ে হামলা চালায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র তেহরানের ভেতর বা আশপাশের একটি সেতু বা বিদ্যুৎকেন্দ্র ধ্বংস করবে।
কিন্তু ইরানের মানুষ আগেই বিদ্যুৎ সংকট, খাদ্যঘাটতি, মূল্যস্ফীতি ও বেকারত্বে ভুগছে।
এ অবস্থায় নতুন হামলা হলে ইরান পুরো অঞ্চলে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে পাল্টা আঘাত হানবে। এতে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মার্কিন সেনা হতাহত হতে পারেন।
এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্রও আরও হামলা চালাবে। ফলে হামলা ও পাল্টা হামলার একটি দীর্ঘ চক্র শুরু হতে পারে, যেখানে লক্ষ্যবস্তুর পরিধি ক্রমেই বাড়বে।
যুদ্ধ দীর্ঘ হলে বেসামরিক ও সামরিক লক্ষ্যবস্তুর পার্থক্যও ক্রমে অস্পষ্ট হয়ে যায়। তখন মানবিক সংকট আরও গভীর হয়।
পারস্য উপসাগর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই সেখানে জাহাজ চলাচল ব্যাহত করা উচিত নয়।
আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার একটি মৌলিক নীতি হলো, সমুদ্রপথে অবাধ চলাচল নিশ্চিত করা। সে কারণে উপসাগরে নিরাপদ নৌ চলাচল নিশ্চিত করতে জাতিসংঘের অনুমোদনে একটি বহুজাতিক বাহিনী গঠনের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগ নেওয়া উচিত।
তবে ট্রাম্প প্রশাসন জোট ও বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি খুব একটা আস্থা রাখে না। তাই এমন উদ্যোগ বাস্তবায়ন সহজ হবে না।
যে ব্যবস্থাই নেওয়া হোক, অদূর ভবিষ্যতে উপসাগরে নিরাপদ নৌ চলাচল নিশ্চিত করার বড় দায়িত্ব যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীকেই বহন করতে হবে।
ইতিহাস বলছে, পর্যাপ্ত পরিকল্পনা ছাড়া শুরু হওয়া যুদ্ধের পরিণতি অনেক বছর ধরে ভোগ করতে হয়। যুদ্ধ শুরু করা নেতারা ক্ষমতা ছেড়ে যাওয়ার পরও সেই সংকট থেকে যায়।
১৯৬৪ সালে ভিয়েতনাম যুদ্ধ আরও বিস্তৃত করার আগে কূটনীতিক জর্জ বল প্রেসিডেন্ট লিন্ডন জনসনকে সতর্ক করে বলেছিলেন, ‘একবার বাঘের পিঠে চড়ে বসলে, কখন এবং কীভাবে নামা যাবে, তা আর নিশ্চিত করে বলা যায় না।’
লেখকের মতে, আজ যুক্তরাষ্ট্র আবারও সেই একই ঝুঁকির মুখে দাঁড়িয়ে আছে।
