ইতালিয়ান ফুটবলে এখন চলছে নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা। একের পর এক পরিবর্তন, কোচ নিয়ে টানাপোড়েন এবং মাঠের ব্যর্থতার পর চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের সামনে এখন সবচেয়ে বড় লক্ষ্য, আবারও বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে ফেরা। আর এমন গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ইতালির কোচ বাছাইয়ের দায়িত্ব পেলে কাকে বেছে নিতেন, সেটাই জানালেন কিংবদন্তি গোলরক্ষক জিয়ানলুইজি বুফন। তার পছন্দের তালিকায় বর্তমান কোচ রবার্তো মানচিনি প্রথমে নন; বরং বিশ্বকাপের পথে দলকে এগিয়ে নিতে বুফনের প্রথম পছন্দ আন্তোনিও কন্তে।
ইতালির সাবেক গোলরক্ষক ও জাতীয় দলের সাবেক প্রতিনিধি প্রধান বুফন দেশটির ফুটবল নিয়ে বিস্তৃত এক সাক্ষাৎকার দিয়েছেন ইতালিয়ান সংবাদমাধ্যম লা গাজেত্তা দেল্লো স্পোর্তকে। সেখানেই জাতীয় দলের সাম্প্রতিক অস্থিরতা, কোচ নির্বাচন, পাওলো মালদিনির স্বল্পস্থায়ী দায়িত্ব এবং নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন তিনি।
সাম্প্রতিক সময়ে ইতালির ফুটবলে বেশ কয়েকটি বড় পরিবর্তন এসেছে। পাওলো মালদিনিকে নতুন কারিগরি পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার পর মাত্র দুই সপ্তাহের কিছু বেশি সময়ের মধ্যেই তিনি পদত্যাগ করেন। পরে সেই দায়িত্ব পান ক্লদিও রানিয়েরি। একই সময়ে প্রধান কোচ হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন রবার্তো মানচিনি।
মানচিনির কোচিং দক্ষতা নিয়ে বুফনের কোনো সংশয় নেই। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে ইতালির জন্য তিনি সঠিক ব্যক্তি কি না, সেটি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে তার মনে। বুফন বলেন, ‘শেষ পর্যন্ত মানচিনি একজন ভালো কোচ এবং টেকনিক্যাল দিক থেকে এটি ভালো একটি পছন্দ। কারণ এই ধরনের প্রকল্পের জন্য কার্যকর একটি খেলার ধরন তার আছে। আমি যদি পিএসজি, বায়ার্ন, রিয়াল মাদ্রিদ, জুভেন্তাসের মতো বড় কোনো ক্লাবের দায়িত্বে থাকতাম, তাহলে তাকে বিবেচনা করতাম।’
তবে ইতালির কোচ হিসেবে মানচিনির অতীত নিয়েও যে প্রশ্ন রয়েছে, সেটি অস্বীকার করেননি বুফন। ২০২৩ সালের আগস্টে ইতালির কোচের দায়িত্ব ছেড়ে সৌদি আরবের জাতীয় দলের দায়িত্ব নেওয়ার বিষয়টি এখনো অনেক সমর্থকের মনে ক্ষোভের কারণ হয়ে আছে।
বুফনও বলেন, ‘সেই বিষয়টি এখনো আছে। আপনি এমন একজন মানুষের সঙ্গে কথা বলছেন, যিনি জুভেন্তাসের সঙ্গে সিরি বি-তে নেমেছিলেন এবং শুধু নিজের দলের প্রতি টান ও দায়বদ্ধতার কারণে ৫ লাখ ইউরো বেতন কমিয়েছিলেন।’
গত বছর লুসিয়ানো স্পালেত্তি ইতালির কোচের পদ ছাড়ার পর মানচিনিকে আবারও জাতীয় দলের দায়িত্বে ফেরানোর বিষয়ে বুফন আপত্তি জানিয়েছিলেন কি না, এমন গুঞ্জন নিয়েও প্রশ্ন করা হয় তাকে। বুফন জানান, জাতীয় দলের কাঠামোয় তার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থাকলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা তার হাতে ছিল না। বরং সেই সময়ে তিনি জেনারো গাত্তুসোকে সবচেয়ে যোগ্য প্রার্থী মনে করেছিলেন।
‘সেই সময়ে বাজারে পাওয়া প্রার্থীদের মধ্যে গাত্তুসোই আমার কাছে সবচেয়ে ভালো ছিলেন। সময় খুব কম ছিল এবং প্লে-অফ প্রায় নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল। আমাদের এমন একজন দরকার ছিল, যিনি কিছুটা হতাশ হয়ে পড়া দলকে আবার অনুপ্রাণিত করতে পারবেন এবং তাদের উদ্দীপনা ও গর্ব ফিরিয়ে দিতে পারবেন,’ বলেন বুফন।
বর্তমানে কারিগরি পরিচালকের দায়িত্বে থাকা ক্লদিও রানিয়েরি নিয়েও ইতিবাচক বুফন। বাইরে থেকে এই পদটির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে স্বীকার করলেও তার মতে, ইতালির বর্তমান কঠিন সময়ে রানিয়েরির মতো অভিজ্ঞ একজনকে পাশে পাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বুফনের ভাষায়, ‘বাইরে থেকে দেখলে এই পদ নিয়ে কিছুটা সন্দেহ থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু এই মুহূর্তে এমন একটি কঠিন দায়িত্বে রানিয়েরির মতো একজনকে থাকা গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তিগত ও টেকনিক্যাল, দুই দিক থেকেই তিনি হাজারো নিশ্চয়তা নিয়ে আসেন।’
রানিয়েরির আগে এই দায়িত্বে ছিলেন মালদিনি। দায়িত্বে থাকাকালে তিনি আন্দ্রেয়া পিরলোকে ইতালির প্রধান কোচ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সেই পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি। বুফন অবশ্য বন্ধুর পিরলোকে এমন অস্থির পরিস্থিতি থেকে দূরে থাকায় খুশি।
‘আমি খুশি যে আন্দ্রেয়া এমন অস্থির একটি পথ থেকে নিজেকে দূরে রাখতে পেরেছে। রাশিয়ান ওয়েবসাইট নিয়ে যে আলোচনা হয়েছিল, সেটি ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তাকে “নিয়োগের অযোগ্য” হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা ছিল খুবই অদক্ষ এবং শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ,’ বলেন তিনি।
মালদিনি ও লিওনার্দো দায়িত্বে থাকার সময় বুফনকেও ইতালির জাতীয় দলের কাঠামোয় ফিরিয়ে আনার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। জাতীয় দলের পরিচালক এবং জাতীয় দলের মূল দল ও বয়সভিত্তিক দলগুলোর মধ্যে সমন্বয়কারীর দায়িত্ব দেওয়ার কথা হয়েছিল তাকে।
‘মালদিনি ও লিওনার্দোর সঙ্গে কথা বলা সবসময়ই ভালো লাগে। তারা আমাকে জাতীয় দলের পরিচালক এবং মূল দল ও বয়সভিত্তিক দলগুলোর মধ্যে সমন্বয়কারীর একটি দায়িত্বের প্রস্তাব দিয়েছিল। তাদের আগ্রহ আমাকে ভাবিয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমি নিজের পরিকল্পনাতেই থেকেছি,’ বলেন বুফন।
দীর্ঘ ক্যারিয়ারের পর পরিবারের জন্য সময় দেওয়াটাই তখন তার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল।
‘১৯৯১ সাল থেকে আজ পর্যন্ত আমি কখনো ২০ দিনের বেশি বিরতি নিইনি। এবার আমার প্রয়োজন ছিল তাদের সময় দেওয়া, যারা এতদিন আমার জন্য নিজেদের সময় দিয়েছেন—আমার স্ত্রী, সন্তান ও বাবা-মাকে। আমার নিজেকে নতুন করে শক্তি সঞ্চয় করার প্রয়োজন ছিল,’ বলেন তিনি।
পিরলোকে বিবেচনায় নেওয়ার আগে মালদিনি ও লিওনার্দো পেপ গার্দিওলার সঙ্গেও ইতালির কোচের দায়িত্ব নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। বুফনের মতে, গার্দিওলার মতো নাম নিজেই জাতীয় দলের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা তৈরি করতে পারত। তবে ফলাফলের নিশ্চয়তা দিতে পারত না।
‘তার নামই আমাদের বড় একটা উত্থান এনে দিতে পারত, আর তখন আমাদের সেটাই দরকার ছিল। কিন্তু তাকে দায়িত্ব দিলেই ফলাফল নিশ্চিত হয়ে যেত—এমন নয়। গত ৩০ বছর ধরে তিনি অন্যতম সেরা কোচ। কিন্তু তিনি শুধু ক্লাব পর্যায়েই কোচিং করিয়েছেন। জাতীয় দলের সঙ্গে কাজ করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়,’ বলেন বুফন।
তাহলে কারিগরি পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পেলে নিজে কী করতেন বুফন? সেখানেই নিজের পছন্দের কোচের নামগুলো প্রকাশ করেন ইতালির কিংবদন্তি, ‘আমি প্রস্তাব করতাম, চার বছর পর বিশ্বকাপে খেলা নিশ্চিত করাই হবে প্রধান লক্ষ্য। সেই ভিত্তিতে আমি প্রথমে আন্তোনিও কন্তেকে বেছে নিতাম, এরপর সিলভিও বালদিনিকে, তারপর হয়তো অন্য কয়েকজনকে।’
তবে শুধু নামের ওপর ভিত্তি করে কোচ নির্বাচন করা উচিত নয় বলেও সতর্ক করেছেন তিনি। তার মতে, আগে প্রকল্প ঠিক করতে হবে, তারপর সেই প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য উপযুক্ত ব্যক্তিকে বেছে নিতে হবে।
‘নিজের সিদ্ধান্তে সাহস থাকতে হবে এবং সেই সিদ্ধান্তের কারণ সবাইকে, এমনকি সংবাদমাধ্যমকেও বোঝানোর দক্ষতা থাকতে হবে। অনেক সময় আমি শুনি, “এই মানুষটিই সঠিক ব্যক্তি।” কিন্তু তার পেছনে কোনো বাস্তব যোগ্যতা থাকে না। ঠিক আছে, কিন্তু এগুলো আসলে বিশ্লেষণ করে নেওয়া সিদ্ধান্ত নয়, বরং সহজাত পছন্দ। আগে প্রকল্পকে গুরুত্ব দিতে হবে, তারপর সেই প্রকল্পের জন্য কার্যকর ব্যক্তিকে বেছে নিতে হবে,’ বলেন বুফন।
